"মঙ্গল" শব্দটাই কি তাহলে যত নষ্টের গোড়া, সমস্ত আপত্তির মূলে আছে এটিই? কেউ কেউ অবশ্য মঙ্গল শব্দের চাইতে শোভাযাত্রায় ব্যবহৃত প্রতিমূর্তি, মুখোশ প্রভৃতি, নারী-পুরুষের "অবাধ" মেলামেশা, "বেপর্দা" নারীর কাপড় চোপড় ও সাজসজ্জা, গানবাজনা - আলপনা, সূর্যোদয়ের সাথে সাথে পয়লা বৈশাখের উৎসব শুরুর মাঝে "সূর্যপুজা"- এসব কিছুর মাঝে "শিরক" বা "হিন্দুয়ানী" খুঁজে পাচ্ছেন, তবে অনেককেই দেখলাম - অন্য কিছু না, কেবল "মঙ্গল" শব্দটা নিয়েই তীব্র আপত্তি করছন। "আনন্দ শোভাযাত্রা" বা "বৈশাখী শোভাযাত্রা"র বদলে "মঙ্গল শোভাযাত্রা" কেন করা হলো, এই পুরামাত্রায় হিন্দুয়ানী "মঙ্গল" শব্দের মাঝেই আছে শিরকি ব্যাপার-স্যাপার, এটাই তাদের মূল আপত্তির জায়গা!
- "ইসলামে মঙ্গল আর অমঙ্গল বলতে কিছু নেই!"
- "কেউ যদি মনে করে বৈশাখের শোভাযাত্রা জীবনে মঙ্গল বয়ে আনবে তাহলে সে শিরক করলো"
- "মঙ্গল শোভাযাত্রায় কার কাছে মঙ্গল চাচ্ছেন?"
- "এই শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণ করে সকল অমঙ্গল দূর করবে। মঙ্গল অমঙ্গলের মালিক কে? এখানে প্রার্থনাটা কার কাছে?"
- "যে যাত্রায় দেবতা তুষ্ট হয়, যে কর্মে দেবতার তুষ্টি হয় তাহাই মঙ্গল শোভাযাত্রা!"
এছাড়া, মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের "মঙ্গলকাব্য" ছিল হিন্দুদের দেবদেবীর আরাধনা, মাহাত্ম্য-কীর্তন ভিত্তিক, দেবী চণ্ডী (বা দূর্গা)-র মহীমা গীত হচ্ছে "চণ্ডীমঙ্গল", মনসা দেবীকে নিয়ে "মনসামঙ্গল" আর লৌকিক অনার্য দেবতা ধর্মঠাকুরের মাহাত্ম্য প্রচারে লিখিত হয়েছিলো "ধর্মমঙ্গল"। হিন্দুরা পুজার সময়ে "মঙ্গলপ্রদীপ" প্রজ্জ্বলন করে। পুজার সময়ে মঙ্গল-কামনায় স্থাপিত ডাব আম্রপল্লব প্রভৃতিতে শোভিত জলপূর্ণ ঘট বা কলসিকে বলা হয় "মঙ্গলঘট"! হিন্দুদের ভগবান শ্রীকৃষ্ণের জন্মদিনে তথা জন্মাষ্টমীতে যে শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয়- সেটাকে বলা হয় "মঙ্গল শোভাযাত্রা", কেননা অবতার শ্রীকৃষ্ণের জন্মই হয়েছিলো অশুভ শক্তি বা অমঙ্গলকে বিনাশ করতে! এছাড়া হিন্দু পুরাণে "মঙ্গল" নামে এক দেবতাও আছে, তিনি ভূদেবী ও বরাহদেবের পুত্র। তিনি শুধু যুদ্ধ ও অকৃতদারের দেবতা নন, তিনি "মঙ্গল" দোষেরও প্রভু ("মঙ্গল" এখানে আবার দোষ)! সবমিলেই "মঙ্গল" শব্দটার হিন্দুয়ানীর তথা হিন্দুধর্মের বিশাল লম্বা সম্পর্ক আছে, সে কারণে পয়লা বৈশাখের শোভাযাত্রার নামে "মঙ্গল" থাকা নিয়ে ভীষণ আপত্তি!

বাংলা ভাষায় এই মঙ্গল শব্দটির বেশ কিছু ব্যবহারগতভাবে ভিন্ন অর্থ রয়েছে। সাধারণভাবে মঙ্গল শব্দের অর্থ হচ্ছে, শুভ, কল্যাণ, হিত, প্রভৃতি। ইংরেজিতে well wishes বলতে যা বুঝায়, বাংলায় সেটা হচ্ছে শুভকামনা বা মঙ্গলকামনা। সোজা কথায় হচ্ছে, কারোর ভালো চাওয়া! "সুস্থ হও", "দীর্ঘায়ু হও", "বড় হও", "তোমার আয়-উন্নতি হোক", "বিপদ-আপদ থেকে রক্ষা পাও", "পরীক্ষায় ভালো ফল করো", "ফুটফুটে সন্তান হোক" - এমন সবই হচ্ছে মঙ্গলকামনার উদাহরণ। এছাড়াও, বাংলাভাষায় মঙ্গল একটি সাপ্তাহিক দিনের বা বারের নাম, মঙ্গলবার। বিভিন্ন ভাষার মত বাংলাতেও সপ্তাহের দিনগুলোর নাম এসেছে সূর্য, চাঁদ ও খালি চোখে দেখতে পারা পাঁচটি গ্রহের নামে। অর্থাৎ, মঙ্গল যেমন একটি বারের নাম, তেমনি এটি একটি গ্রহেরও নাম! এখন প্রশ্ন হচ্ছে - হিন্দুয়ানী এই "মঙ্গল" শব্দটি নিয়ে আমাদের এত সমস্যা থাকলে যদি "মঙ্গল শোভাযাত্রা"র নাম পাল্টানোর দাবি তুলা যায়, তাহলে কি অন্যান্য ক্ষেত্রেও কি এই শব্দটি পাল্টে দেয়ার দাবি তুলতে হবে? মানে, আল্লাহর কাছে তোমার মঙ্গলকামনা করে অনেক দোয়া করেছি - এমন কথাও কি তাহলে আর বলা যাবে না? বলতে হবে, শুভ/ কল্যাণ কামনা? এক্ষেত্রে মুশকিল হচ্ছে - বাংলা থেকে "মঙ্গল" শব্দটা ঝেটিয়ে বিদায় দিলে, তখন হিন্দুরা কল্যাণ বা শুভ শব্দটা ব্যবহার করবে, কৃষ্ণের জন্ম হয়েছে অশুভ ও অকল্যাণকে বিনাশ করতে, কল্যাণ-কামনায় পুজায় শুভ-প্রদীপ প্রজ্জ্বলিত হয়েছে, বা জন্মাষ্টমীতে কল্যাণ-শোভাযাত্রা হয়েছে- এসব বলবে। তখন আবার সেই শব্দগুলোকে ঝেটিয়ে বিদায় করতে হবে? বৈশাখের শোভাযাত্রার নাম আনন্দ শোভাযাত্রা করতে চাইছেন, একইভাবে কি তাহলে বারের নাম বদলে আনন্দবার, গ্রহের নাম রাখা হবে আনন্দগ্রহ? কিন্তু, এই আনন্দ শব্দটারও তো "হিন্দুয়ানী" ব্যবহার আছে। হিন্দু ধর্মগ্রন্থ বেদ, উপনিষদ ও ভগবদ্গীতায়, আনন্দ শাশ্বত সুখকে বোঝায় যা পুনর্জন্ম চক্রের সমাপ্তির সাথে থাকে। উপনিষদে আনন্দ বা পরমানন্দ শব্দটা ব্যবহার করা হয়েছে ভগবান ব্রহ্মাকে বুঝাতে। তাহলে, তো "আনন্দ" শব্দটা ব্যবহারেও মহাসমস্যা দেখা যাবে।
আর, শুধু মঙ্গলবার পাল্টে আনন্দবার করলেই তো হবে না, সপ্তাহের বাকি দিনগুলোর কি হবে?
রবিবার - রবি হচ্ছে সূর্য, হিন্দু পুরাণ মতে রবি বা সূর্য বা আদিত্য হচ্ছে প্রধান এক সৌর দেবতা। তিনি কশ্যপ ও তাঁর অন্যতমা পত্নী অদিতির পুত্র (অদিতির পুত্ররা হচ্ছে আদিত্য)। সূর্যদেবতাকে হিন্দুপুরাণে প্রধান পাঁচজন দেবতার মধ্যে একজন ধরা হয়, যাকে পঞ্চায়তন পূজার সমতুল্য দেবতা হিসেবে বিবেচনা করা হয় এবং স্মার্ত ঐতিহ্যে ব্রহ্ম এর সমতুল্য মনে করা হয়।
সোমবার - সোম বা চন্দ্রও হচ্ছে একজন হিন্দুদেবতা। তার অন্যান্য নাম হচ্ছে ইন্দু (উজ্জ্বল বিন্দু), অত্রিসুত (অত্রির পুত্র), শচীন, তারাধিপতি (নক্ষত্রের প্রভু),বজ্রজ্বালাপতি (অরুণাসূরের অসুরা বোনের স্বামী) ও নিশাকর (রাত নির্মাণকারী)। হিন্দু পুরাণ অনুসারে চন্দ্র অত্রির পুত্র ও সপ্তবিংশতী নক্ষত্রের ও বজ্রজ্বালা নামক অসুরার স্বামী। দক্ষের ২৭টি কন্যা ও অরুণাসূরের অসুরা বোনকে ইনি বিবাহ করেন।
মঙ্গলবার - মঙ্গল হচ্ছে হিন্দু দেবতা
বুধবার - বুধও হচ্ছে হিন্দু দেবতা। চন্দ্রদেবতা এবং রোহিনীর পুত্র বলে তার অন্য নাম সৌম্য (সোমের পুত্র) ও রোহিনেয় বলা হয়। ওনাকে বুদ্ধিদাতা (গাম্ভীর্যপূর্ণ বুদ্ধির জন্যে নাম রাখা হয়েছে বুধ) ও গন্ধর্বদের প্রণেতাও মানা হয়।
বৃহস্পতিবার - হিন্দু পুরাণে বৃহস্পতি কখনো ঋষি, কখনো দেবতা। প্রাচীণ হিন্দুপুরাণে তিনি একজন ঋষি যিনি দেবতাদের পরামর্শদাতা ও গুরু। বৈদিক গ্রন্থ মতে, তিনি হলেন বাগ্মিতার দেবতা, এবং কখনও কখনও তাকে অগ্নি দেবতার সঙ্গে শনাক্ত করা হয়। তাকে আবার দেবগুরুও বলা হয়।
শুক্রবার - শুক্র হচছে একজন হিন্দুদেবতা ও ঋষি, যিনি হিন্দু পুরাণ অনুসারে অসুর বা দৈত্যদের গুরু। তিনি ঋষি ভৃগু এবং কাব্য/দিব্য মাতার পুত্র, যিনি সপ্তর্ষিদের অন্যতম। তাকে শুক্রাচার্য্য অথবা অসুরাচার্য্য নামেও উল্লেখ করা হয়।
শনিবার - শনি হিন্দুধর্মের একজন দেবতা যিনি সূর্যদেব ও তার পত্নী ছায়াদেবীর পুত্র, এজন্য তাকে ছায়াপুত্র-ও বলা হয়। তাকে কৃষ্ণের অবতার বলে মনে করা হয়, এবং ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণে কৃষ্ণ বলেছেন যে, গ্রহগুলোর মধ্যে তিনি শনি।
অর্থাৎ, দেখা যাচ্ছে সপ্তাহের সাতটি দিনের নামের সাথে, এবং ৫ টি গ্রহ, চাঁদ ও সূর্যের সাথেও হিন্দু দেবতাদের সম্পর্ক আছে। তাহলে সেগুলোকেও এখন পাল্টে ফেলতে হবে? শুধু এই সাতদিন কেন, বাংলা ১২ মাসের নামের পেছনেও আছে ১২ টি নক্ষত্রের নাম, সেই নক্ষত্রগুলোও আবার হিন্দু পুরাণ মতে দক্ষ প্রজাপতির কন্যা। সর্বপ্রাচীন যে গ্রন্থে ২৮ নক্ষত্রের তালিকা পাওয়া তার নাম যজুর্বেদ। এদের প্রথমটি হচ্ছে যুগ্মতারা (অশ্বিনী), সেই হিসেবে ২৭ নক্ষত্রের নাম পাওয়া যায়, যারা হচ্ছে পুরাণ মতে রাজা প্রজাপতি দক্ষের সুন্দরীকন্যা। ২৭ সুন্দরীকন্যাকেই আবার বিয়ে করেছেন চন্দ্র দেবতা। তাদের কেউ কেউ আবার নিজেও দেবী। যেমনঃ
বৈশাখ - নামটি এসেছে বিশাখা নক্ষত্র থেকে।
জৈষ্ঠ - জৈষ্ঠা নক্ষত্র থেকে এসেছে। জৈষ্ঠা একজন হিন্দুদেবী। তিনি প্রতিকূলতা এবং দুর্ভাগ্যের দেবী। তিনি সমৃদ্ধি এবং শুভর দেবী লক্ষ্মীর বড় বোন ও প্রতিপক্ষ।
আষাঢ় – উত্তর ও পূর্ব আষাঢ়া নক্ষত্রের নাম অনুসারে হয়েছে।
শ্রাবণ – শ্রবণা নক্ষত্র থেকে এসেছে।
ভাদ্র -উত্তর ও পূর্ব ভাদ্রপদ নক্ষত্রের নাম অনুসারে হয়েছে।
আশ্বিন – অশ্বিনী নক্ষত্র থেকে এসেছে। অশ্বিনী ঘোটকীরূপ ধারিণী সূর্যের পত্নী। তার আরেক নাম সংজ্ঞা। তার দুই জমস সন্তান অশ্বিনীকুমার।
কার্তিক – কৃত্তিকা নক্ষত্র থেকে এসেছে। কৃত্তিকার আরেক নাম অগ্নি। তিনি সপ্তর্ষিদের পত্নী হিসেবেও পরিচিত।
অগ্রহায়ণ (মার্গশীর্ষ) – অগ্রহায়ণ নামটা নক্ষত্রের নামের সাথে সম্পর্কিত নয়, প্রাচীণ বাংলার কোন কোন বর্ষপঞ্জিতে এই মাসটি ছিল প্রথম মাস, সেখান থেকে এসেছে অগ্রহায়ন (হায়ণ হচ্ছে বছর, আর অগ্রহায়ণ হচ্ছে বছরের অগ্র বা শুরু)। আবার কোন কোন প্রাচীণ বর্ষপঞ্জিতে (এবং ভারতীয় বিভিন্ন বর্ষপঞ্জিতে) এই মাসের নাম মার্গশীর্ষ, যেটি এসেছে মৃগশিরা নক্ষত্র থেকে।
পৌষ – পুষ্যা নক্ষত্র থেকে এসেছে। পুষ্যা নক্ষত্রের আরেক নাম তিষ্যা।
মাঘ – মঘা নক্ষত্রের নাম অনুসারে হয়েছে।
ফাল্গুন – উত্তর ও পূর্ব ফাল্গুনী নক্ষত্রের নাম অনুসারে হয়েছে।
চৈত্র – চিত্রা নক্ষত্র থেকে এসেছে।
অর্থাৎ, বাংলা মাসের ১২ টি নাম (মার্গশীর্ষকে ধরে) এসেছে ১৫ টি নক্ষত্র থেকে, যারা হিন্দু পুরাণ মতে কেবলমাত্র জড়নক্ষত্রই নন, বরং ভগবানকন্যা ও দেবতাপত্নী, কেউ কেউ দেবী। এখন, এসব মাসের নামের সাথেও যেহেতু হিন্দুপুরাণের সংযোগ দেখা যাচ্ছে, তাহলে মাসের নামগুলোও পাল্টে ফেলতে হবে?
যেকোন ভাষার ক্ষেত্রেই একটা ব্যাপার দেখা যাবে, ভাষার তথা ভাষাস্থিত বিভিন্ন শব্দের উৎপত্তি যেহেতু অনেক কাল পূর্বে হয়, যখন বর্তমান সময়ের চাইতে সমাজ - সংস্কৃতি, মানুষের বিশ্বাস বা ধর্মবিশ্বাস, আচার - অনুশাসন প্রভৃতি সম্পূর্ণ ভিন্নরকম ছিল, সেহেতু অনেক শব্দই পাওয়া যাবে, যেগুলো সেই আদিকালের মানুষের ধর্মীয়বিশ্বাস, আচার-আচরণ, রীতিনীতির সাথে সম্পর্কিত। কিন্তু কালের বিবর্তনে মানুষের সংস্কৃতি ও ধর্মীয় বিশ্বাস যেমন পাল্টেছে, তেমনি সেই শব্দগুলোর অর্থ, ব্যবহারও আমূল পাল্টেছে! উৎপত্তিগত ভাবে এখনো এসব শব্দের প্রাচীণ উৎস খুঁজে পাওয়া যায়, কিন্তু প্রাত্যহিক জীবনে মানুষ যখন শব্দগুলো ব্যবহার করে, তার সাথে সেই ব্যুৎপত্তিগত অর্থের কোনরকম সম্পর্কই খুঁজে পাওয়া যাবে না। কেননা, প্রাচীণ কালে মানুষের জানাবুঝার পরিধি ছিল একেবারেই সীমাবদ্ধ, তখন তারা অলীক, অদৃশ্য শক্তিতে বিশ্বাস করতো, সেই শক্তির আঁধার হিসেবে চোখের সামনে থাকা প্রাকৃতিক বস্তুকে কল্পনা করে নিতো। মানুষের আচার আচরণের সাথে মিল রেখে জড় বস্তুকে সজীব এন্টিটি হিসেবে কল্পনা করে নিতো। প্রাকৃতিক বিভিন্ন ঘটনা, যেগুলোর কোন কার্যকারণ বা ব্যাখ্যা তারা জানতো বিধায়, নানারকম কল্পকাহিনীর আশ্রয় নিতো, এভাবেই তাদের জানার যে আগ্রহ তার জবাব খুঁজে নিতে চাইতো। এভাবেই, সূর্য, চাঁদ, তারারা বিভিন্ন দেব-দেবীর মর্যাদা লাভ করেছে, পাহাড়, প্রকাণ্ড বৃক্ষ, এমনকি বড় পাথরও দেবতা হিসেবে পুজিত হয়েছে! বিভিন্ন জীবজন্তু হয়েছে কখনো দেবদেবী, কখনো বা দেবদেবীর বাহন! ফলে, সেই সময়ে মানুষের তৈরি শব্দগুলোতে এসবের ছোয়া থাকবে, কিংবা প্রাকৃতিক নানাকিছুই আদিম ধর্মবিশ্বাসের মাঝে পাওয়া যাবে! তার মানে কি এই যে, সেই শব্দগুলোর ব্যবহারে সেই আদিম ধর্মীয় বিশ্বাস প্রকাশ পায়? সূর্যকে দেবতা হিসেবে পূজা কেবল ভারতীয় ধর্মীয় বিশ্বাসেই হয়নি, দুনিয়ার অধিকাংশ মিথেই সূর্য ছিল প্রধানতম দেবতা। তার মানে কি এই যে, আজকে যখন কেউ সূর্যকে সূর্য বলছে, সেখানে সে সূর্যকে দেবতা হিসেবে মেনে নিচ্ছে। পেঁচা - ময়ুর - রাজহংস - এগুলো পাখি মাত্র, ইদুর - হাঁতী - এগুলো প্রাণী মাত্র! এগুলো কোন আদিম বিশ্বাসে যদি লক্ষ্মীদেবীর বাহন পেঁচা হয়, সরস্বতী দেবীর বাহন যদি রাজহাঁস হয়, গণেশের বাহন যদি ইদুর হয়, শিবের বাহন যদি ষাঁড় হয়, কার্তিকের বাহন যদি ময়ূর হয়, দূর্গার বাহন যদি সিংহ হয় প্রভৃতি, তার মানে এই নয় যে - এইসব পাখি বা পশুগুলো হিন্দুয়ানীর প্রতীক! বস্তুত পেঁচা বা রাজহংস দেখলেই যাদের "হিন্দুয়ানী" অভিযোগ মাথায় আসে, আসলে তারাই সেই প্রাচীণ মিথকে বিশ্বাস করে বসে আছে! যতই বলা হোক, কৃষক সমাজে পেঁচা যেহেতু ইদুর খায়, পেঁচাকে বন্ধু প্রাণী হিসেবে ধরা হয়, সেখান থেকে এমন প্রতিকৃতি করা, তার জবাবেও যখন কেউ বলতে থাকে, না এটা হচ্ছে হিন্দুদেবী লক্ষ্মীরই বাহন; তখন আসলে পেঁচাকে স্রেফ একটা পাখি হিসেবে যে বা যারা দেখতে পারছে না, তারাই আসলে মূল শিরক করছে, নয় কি?
আসলে, ভাষার একটা ধারাবাহিক পথচলার ইতিহাস থাকে, পথ পরিক্রমায় নতুন নতুন শব্দ তৈরি হয়, অনেক শব্দ হারিয়ে যায়, আবার অসংখ্য শব্দ তার আগের অর্থ, ব্যবহার বদলে ফেলে। এই বিষয়টি কেবল বাংলা ভাষাতেই নয়, দুনিয়ার যেকোন ভাষার ক্ষেত্রেই পাওয়া যাবে। বাংলা সাতবারের নাম উপরে বলেছি। গোটা দুনিয়াতেই (বাংলাদেশের মানুষও) সপ্তাহের ৭ দিনের নাম হিসেবে ইংরেজি নামও সমান চালু আছে। এই নামগুলোর দিকেও যদি তাকাই - তাহলেও একই রকম কাহিনীই আমরা পাবো। ইংরেজি ভাষার আদি রুট হচ্ছে জার্মানিক ভাষা, সেখান থেকে এংলো সাক্সন, সেই সাথে সেখানে মিশ্রণ ঘটেছে নর্সদের ভাষা ও মিথের, তার ফলেই এসেছে সপ্তাহের এই নামগুলো। বাংলায় সাত দিনের নাম যেমন সাতটি গ্রহ (সূর্য ও চাঁদকে ধরে), ইংরেজি নামের ক্ষেত্রেও অনেকটা তাই, তবে- সেগুলো মূলত গ্রহের নাম থেকে সরাসরি আসেনি, বরং সেই গ্রহের সাথে সম্পর্কিত দেবতা/ দেবীর নামানুসারে হয়েছে দিনের নাম। যেমনঃ
SUNDAY - সান বা সূর্যের দিন। রোমান ভাষায় সোল এর দিন, সেখানে সোল হচ্ছে সূর্যদেবতা। ইতালিয়ান, ফ্রেঞ্চ, স্পানিশ ভাষায় এটি হচ্ছে ডে অব লর্ড, বা ঈশ্বরের দিন।
MONDAY - মুন বা চাঁদের দিন। রোমানে লুনা'র দিন, এই লুনা হচ্ছে চন্দ্রদেবী।
TUESDAY - Tiw এর দিন, এই Tiw হচ্ছে এংলো সাক্সন যুদ্ধদেবতা
WEDNESDAY - Woden এর দিন, এই Woden হচ্ছে এংলো সাক্সন দেবতাদের রাজা
THURSDAY - Thor এর দিন, এই Thor হচ্ছে নর্স দেবতা, বজ্র, বিজলী ও ঝড়ের দেবতা। রোমানে এটা জোভিস ডে বা জুপিটারের দিন। জুপিটার হচ্ছে সবচেয়ে বড় রোমান দেবতা।
FRIDAY - ফ্রিগ বা ফ্রেয়ার দিন। ফ্রিগ হচ্ছে নর্স দেবী।
SATURDAY - Saturn এর দিন। স্যাটার্ণ অবশ্য রোমান দেবতা, ইংরেজি এই দিনটির নামে রোমান দেবতা ঢুকে গিয়েছে!
বাংলায় সাত বারের নাম হয়েছে গ্রহের নামে, কিন্তু ইংরেজি বারের নামগুলো তো সবই দেব-দেবীর নামে। তাহলে এখন যারা সানডে, মানডে বলে - তারা কি তবে সে এংলো সাক্সন, নর্স বা রোমান দেবদেবীতে বিশ্বাস রেখেই এসব নাম ব্যবহার করে? এতে কি শিরক করা হয়? তাহলে কি এই নামগুলো সব বাদ দিয়ে দিতে হবে?
এমনটি দুনিয়ার সমস্ত ভাষা নির্বিশেষেই পাওয়া যাবে! খোদ আরবী ভাষার মাঝেও, এমনকি কোরআনের ব্যবহৃত শব্দগুলোও সব হযরত মুহম্মদের সময়ে নতুন করে তৈরি হয়নি, বরং আরো অনেক আগে থেকেই আরব অঞ্চলে চলে এসেছে। হ্যাঁ, হযরত মুহম্মদ ইসলাম ধর্মের প্রচলনের সময়ে এবং পরবর্তীতে খলীফাদের শাসন আমলে - আরবী অসংখ্য পুরাতন শব্দকে নতুন ভাবে পরিচিত করা হয়েছে, নতুন অর্থ প্রদান করা হয়েছে, কিন্তু মোটেও নতুন নতুন শব্দ তৈরি করা হয়নি! যেকোন মুসলমান মাত্রই আমরা জানি - আল্লাহর সুন্দরতম ৯৯ নাম বা আসমাউল হুসনার কথা। তার মধ্যে আল্লাহ বাদে বাঁকি ৯৮ টা নামই হচ্ছে গুনবাচক নাম, মানে আল্লাহর বিভিন্ন গুন হচ্ছে সেই নামগুলো (এসব গুনাবলী মূলত মানুষের সাথে যায়)। এই গুনবাচক শব্দগুলোর কোনটাই মূলত নতুন শব্দ নয়, বরং আরবী ভাষায় ইসলাম পূর্ব যুগ থেকেই ছিল, এবং পৌত্তলিক আরবে বিভিন্ন দেবদেবীর গুন হিসেবে সেই শব্দগুলোর ব্যবহারও ছিল। কাবা শরীফেই ছিল কয়েক শ দেবদেবীর মূর্তি, সেগুলোর একেকটা ছিল একেক গুনের অধিকারী। ইসলামের নবী হযরত মুহাম্মদ এক আল্লাহকে প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে সমস্ত শরিককে অস্বীকারই শুধু করেননি, তাদের সকল গুনের সন্নিবেশ ঘটিয়েছেন আল্লাহর মাঝে! একই শব্দগুলো এককালে অন্য দেব দেবীর গুন বুঝাতে ব্যবহৃত হতো বলে কি কেউ প্রশ্ন করছে, কেন আল্লাহকে সেই দেবদেবীর গুনগুলো দিয়ে ডাকা হচ্ছে? এমন প্রশ্নই অবান্তর, কেননা - ভাষা তার পথ পরিক্রিমায় এভাবেই বিবর্তিত হয়, নতুন নতুন সমাজ বাস্তবতায় পুরাতন শব্দই নতুন অর্থ ধারণ করে। আজকে যে মঙ্গল শব্দ নিয়ে এত আপত্তি, এই গুনটি খোদ আল্লাহরও আছে, তার দুটি নাম হচ্ছে আর রহমান এবং আর রহীম। রহমান অর্থ পরম দয়ালু, পরম করুণাময়, সবচেয়ে দয়ালু, কল্যাণময়, রহীম অর্থ অতিশয়-মেহেরবান, অতি দয়ালু। এর মানেই হচ্ছে - আল্লাহ কল্যাণ করেন, মঙ্গল করেন, দয়া করেন। তো এমন মঙ্গল তো শুধু আল্লাহই করেন না, বা আল্লাহই প্রথম করা শুরু করেননি। ইসলামপূর্ব সব ধর্মীয় বিশ্বাসে, সমস্ত মিথের অসংখ্য দেব দেবী, ভগবান, ঈশ্বর পাওয়া যাবে, তারাও মঙ্গল করেন, দয়া করেন, করুণা করেন, কল্যাণ করেন। মানুষের মঙ্গল করেন, জীবকূলের মঙ্গল করেন, এমনকি জড়কূলেরও মঙ্গল করেন! মানুষ সেই দেবদেবী, ভগবান, ঈশ্বর, আল্লাহ, গড, জিহোভা, ঋষি, মুনি, পীর, আউলিয়া, মাজার - এমন যা কিছু আছে, তাদের কাছে মঙ্গল কামনা করে। এমনকি নাস্তিকরাও শুভকামনা, মঙ্গলকামনা করতে পারে, ভালো ভবিষ্যতের প্রত্যাশা করতে পারে। সেই কামনা অবশ্য কারোর কাছে নয়, বরং আশা করে- মানুষই প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখবে, এই ভালো কিছু করার বা হওয়ার জন্যে! তো, ভাষার মজা তো এখানেই, এটা সকলের জন্যে অবারিত, উন্মুক্ত - সবাই তা নিজের মত ব্যবহার করতে পারে! সবাই যদি নিজের মত করে প্রতিক্ষেত্রেই আলাদা আলাদা শব্দ তৈরি করতো, তাহলে একটা ভাষা প্রতিশব্দের ভারেই মারা পড়তো, তাকে আর অন্যের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করতে হতো না! বুঝা দরকার - কোন সংস্কৃতি, দর্শন বা ধর্মদর্শন যখন এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে ভ্রমণ করে, তখন সেই অঞ্চলে যেমন নতুন শব্দ নিয়ে হাজির হয়, তেমনি পুরাতন শব্দকেও আত্মীকরণ করে, এমনকি পুরাতন শব্দের সম্পূর্ণ ভিন্ন বিশ্বাসগত অর্থ থাকলেও, নতুন ব্যবহারের মাধ্যমে তা নতুন অর্থ বা ব্যঞ্জনাও লাভ করতে পারে। আরবের মক্কা - মদীনায় মুহম্মদ যখন নতুন ধর্ম প্রচার করলেন, তখন অন্য অঞ্চল থেকে শব্দ নিয়ে আসার উপায় ছিল না, ফলে আরবের প্রচলিত শব্দগুলোকে নতুনভাবে ব্যবহার করা ছাড়া উপায় ছিল না! যেই একত্ববাদের উপরে দাঁড়িয়েছে ইসলাম ধর্মটি, সেই মহান সৃষ্টিকর্তাকে ডাকার জন্যে ব্যবহৃত খোদ "আল্লাহ" শব্দটিও কোন নতুন শব্দ ছিল না! মুহাম্মদ (সা) এর পৌত্তলিক পিতার নাম ছিল আব্দুল্লাহ (এটা আরব পৌত্তলিকদের মাঝে খুব কমন নাম ছিল), যার অর্থ আল্লাহর দাস। নিশ্চিতভাবেই ইসলাম ধর্ম প্রচারের আগে পৌত্তলিকদের কাছে এই আল্লাহর যে অর্থ বা মানে ছিল, তা ইসলামের আল্লাহর অনুরূপ ছিল না! তাতে আল্লাহ শব্দ ব্যবহারে কারোরই কোন অসুবিধাও হয়নি, ইসলামের কালেমার প্রথম বাক্যেই মুসলমানের কাছে এই "আল্লাহ"র নতুন ও নির্দিষ্ট অর্থ স্থির হয়ে যায়! ফলে, শব্দের আদিম উৎস, যুগে যুগে ভিন্ন রকম বিশ্বাসীদের ব্যবহার - এসবের দিকে দেখার চাইতেও দরকার, বর্তমানে এই শব্দ কোন অর্থ ধারণ করছে, বা শব্দটা কোন উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হচ্ছে! নয় কী?
["যত দোষ নন্দ ঘোষ" প্রবাদটির অনুকরণে লেখার শিরোনামটি নিয়েছি। এই প্রবাদের উৎসের সাথেও হিন্দু পুরাণের যোগ আছে, কৃষ্ণের জন্মের পরে বৃন্দাবনে তার পালক পিতা নন্দ ঘোষ ও পালক মাতা যশোদার কাছে লালিত পালিত হয়। বাচ্চাকালে প্রচণ্ড দুষ্ট কৃষ্ণ পাড়া প্রতিবেশীর ঘুম হারাম করেছিলো। পিতা নন্দলাল ঘোষের কাছে অভিযোগ নিয়ে আসতো, কিন্তু পিতা তার আদুরে সন্তান কৃষ্ণকে শাসনই করতে চাইতো না। নন্দের লাই পেয়েই কৃষ্ণ এমন দুরন্ত, দুষ্ট হয়েছে - এই ছিল সবার অভিযোগ, পিতা তা মেনেও নিতো। সেখান থেকেই প্রবাদ এসেছে, যত দোষ নন্দ ঘোষ! এই প্রবাদের উৎপত্তির কথা অধিকাংশ মানুষ জানে না, সাধারণভাবে ঢালাওভাবে, পূর্বধারণা বশত বা ভুলভাবে একজনকেই সকল দোষারোপ করা হলে এই প্রবাদ বাক্যটা ব্যবহৃত হয়! ]


