গণতন্ত্র-ওয়েবসভা ১ : কেমন রাজনৈতিক দল চাই?
ওয়েবসভা পত্রঃ কেমন রাজনৈতিক দল চাই?
অনুপম সৈকত শান্ত ও নাদির আহমেদ
ভূমিকাঃ
(১) ১৫ বছর জেঁকে বসা ফ্যাসিবাদের পতন ঘটানো জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের অনন্য-সাধারণ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, এবারের এই গণঅভ্যুত্থানেই কোন রাজনৈতিক দল বা তাদের কোন অঙ্গসংগঠন নেতৃত্বদানকারী অবস্থানে ছিল না। কোটা সংস্কার আন্দোলনকে সামনে রেখে গড়ে ওঠা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন গণঅভ্যুত্থানের সময়ে নেতৃত্বদানকারী অবস্থানে ছিল। এই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে গণতান্ত্রিক ছাত্রশক্তির নেতাকর্মীরা থাকলেও, সারাদেশে সমন্বয়ক ও সহ-সমন্বয়কদের নিয়ে যে কমিটি গড়ে উঠেছিল, সেখানে গণতান্ত্রিক ছাত্রশক্তির বাইরের কিছু রাজনৈতিক ছাত্র সংগঠনের কর্মীরা ছিলেন, তেমনি কোন রকম ছাত্ররাজনীতির সাথে যুক্ত না থাকা ছাত্রছাত্রীরাও ছিলেন। অন্যদিকে ২০২৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়া গণতান্ত্রিক ছাত্রশক্তি এমন এক ছাত্র সংগঠন, যাদের কোন মূল রাজনৈতিক দল বা মাদার পার্টি নেই। ফলে, ছাত্র-জনতার এই গণঅভ্যুত্থান দেখিয়ে দিয়েছে যে, প্রবল শক্তিধর ফ্যাসিবাদী শক্তিকে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্যে প্রধান ধারার রাজনৈতিক দলগুলোর নেতৃত্ব জরুরী নয়, তথা বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতা রাজনৈতিক নেতৃত্বের অপেক্ষায় না থেকে নিজেদের স্বতস্ফূর্ত, কিন্তু ঐক্যবদ্ধ শক্তি দিয়ে ক্ষমতাযন্ত্রকে চ্যালেঞ্জ জানাতে ও উচ্ছেদও করতে পারে। এটি আরেকভাবে দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর ব্যর্থতাকেও নির্দেশ করে, কেননা ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তাদের নেতৃত্বের উপর দেশের জনগণ আস্থা ও বিশ্বাস রাখতে পারেনি। যদিও গত ১৫ বছর ধরে নানান আন্দোলন সংগ্রাম করেছে এই রাজনৈতিক দলগুলো ও তাদের নেতা-কর্মীরাই ফ্যাসিবাদী শাসক গোষ্ঠীর জুলুম-নির্যাতন-গুম-বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ডের শিকার হয়েছেন, এবং এই স্মৃতি জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পটভূমি তৈরিতে একটি বড় ভূমিকা রেখেছে।
(২) গণঅভ্যুত্থানে ফ্যাসিবাদের পতনের পরে যে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়েছে, সেখানে কেবল দুজন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্রতিনিধি আছেন, যারা রাজনৈতিক ছাত্র সংগঠন গণতান্ত্রিক ছাত্রশক্তির প্রধানসারির নেতা ছিলেন। এছাড়াও সরকারের একজন উপদেষ্টা হেফাজতে ইসলামের সাবেক আমির ছিলেন (হেফাজতে ইসলাম সরাসরি রাজনৈতিক দল না হলেও সেখানে কওমী ধারার একাধিক ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা যুক্ত আছেন, এবং হেফাজতে ইসলাম সংগঠনটি বিভিন্ন রাজনৈতিক আন্দোলন সংগ্রাম পরিচালনাও করে এসেছে)। এই তিনজন বাদে বাঁকি সকল উপদেষ্টাই সরাসরি কোন রাজনৈতিক দল বা সংগঠনের সদস্য নন বা ছিলেন না।
(৩) গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতা পরিচালনার দায়িত্ব পাওয়া এই “নির্দলীয়” সরকার ছাত্র-জনতার নিরঙ্কুশ সমর্থন লাভ করলেও, এটি একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছে, যাদের দায়িত্বের পরিসমাপ্তি ঘটবে অপর কোন নির্বাচিত “দলীয়” সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের মাধ্যমে। অর্থাৎ জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের নেতৃত্বের যতই নির্দলীয় ও স্বতঃস্ফূর্ত চেহারা থাকুক, এবং ছাত্র-জনতার আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের গুরু দায়িত্ব পাওয়া এই সরকার যতই “নির্দলীয়” হোক, রাষ্ট্রের স্থায়ী পরিচালনার ভার শেষ পর্যন্ত দলীয় রাজনৈতিক শক্তিগুলোকেই নিতে হবে। সেকারণেই বৈষম্যহীন, অসাম্প্রদায়িক ও সকলের জন্যে অন্তর্ভূক্তিমূলক একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র পুনর্গঠন বা বিনির্মাণের এই প্রচণ্ড রাজনৈতিক কাজটি রাজনৈতিক দল বা শক্তিগুলোকে বাদ দিয়ে সম্ভব হবে না। এখানে বলাই বাহুল্য যে, বর্তমানের এই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাজ কেবলমাত্র একটি সুষ্ঠূ নির্বাচনের মাধ্যমে কোন রাজনৈতিক দল বা জোটকে রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন করা নয়, বরং রাষ্ট্রে একটি টেকসই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষে রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয় সংস্কার সম্পন্ন করা বা সংস্কারের কাজগুলো নিদেনপক্ষে শুরু করে দেওয়া এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে সরকারের প্রভাবমুক্ত স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে কার্যকর ভূমিকা রাখা।
(৪) গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র বিনির্মাণের দায়িত্ব পাওয়া অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কোন চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত নয়, বরং রাজনৈতিক দলগুলোর ওপরই মূলত নির্ভর করবে, এই সরকারের গণতন্ত্রের পথে নেয়া সংস্কারগুলো কতখানি টেকসই ভিতের ওপরে দাঁড়াবে। এই জায়গা থেকে দেখলে আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্বই সর্বাধিক। পুরাতন ধারার রাজনৈতিক দলগুলো, বিশেষ করে নির্বাচনের হিসেবে বড় দলগুলো – যারা গত ৫৩ বছরে নানা সময়ে ক্ষমতায় আসীন ছিল বা বিরোধীদলে ছিল, কোন না কোন ভাবে আমাদের দেশকে একটি জনবিরোধী, পীড়নমূলক ও অগণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে আজকের এই অবস্থায় নিয়ে আসার দায়ে দায়ী। ফলে, এই সময়কালে একটা টেকসই গণতন্ত্রের পথে যাত্রায় আস্থা পাওয়ার মত রাজনৈতিক দল তথা সংগঠিত রাজনৈতিক শক্তির অভাব দেখা যাচ্ছে, একরকম রাজনৈতিক শূণ্যতা অনুভূত হচ্ছে। সেই শূণ্যতা পূরণের লক্ষে নাগরিক সমাজের নানারকম উদ্যোগ, পরিকল্পনা ও তৎপরতাও পরিলক্ষিত হচ্ছে। একদিকে, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র বিনির্মাণে এক নতুন রাজনৈতিক আয়োজন দরকার, দরকার সম্পূর্ণ নতুন ধারার রাজনৈতিক শক্তি, অন্যদিকে ঠিক তেমনি দরকার পুরাতন রাজনৈতিক দল ও শক্তিগুলোরও নতুনভাবে নিজেদেরকে আবির্ভুত করা, নিজেদের বড় ধরণের সংস্কার। সুতরাং, নতুন দিনের নতুন বাংলাদেশ গড়বে যেই নতুন ধরণের রাজনৈতিক শক্তি, তার চেহারা ও প্রকৃতি কেমন হবে, আদর্শ-উদ্দেশ্য কেমন হবে, বা গঠন ও কর্মপদ্ধতি কেমন হবে? সে জায়গা থেকেই এ সময়ের ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে, “কেমন রাজনৈতিক দল চাই?” বা “কেমন রাজনৈতিক দল দেখতে চাই?”, কিংবা একটু ঘুরিয়ে বললে, “কেমন রাজনৈতিক দল চাই না?”
বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর ধরণ-ধারণঃ
(৫) বাংলাদেশের সমস্ত রাজনৈতিক দলগুলোকে রাজনৈতিক দর্শন বা দাবি-দাওয়া ও কর্মসূচির ভিত্তিতে মোটা দাগে তিন শ্রেণীতে ভাগ করা যেতে পারেঃ ক) বামপন্থী, খ) মধ্যমপন্থী, এবং গ) ডানপন্থী। পাশ্চাত্যে বামপন্থী বলতে উদারপন্থী দলগুলোকে বুঝানো হয়, ডানপন্থী বলতে রক্ষণশীল দলগুলোকে বুঝে, এবং উদারপন্থা ও রক্ষণশীলতার মাঝামাঝিতে একরকম ভারসাম্য বজায় রাখার নীতি যাদের, তাদেরকে বলে মধ্যপন্থী। তবে, আমাদের দেশে সাধারণত সমাজতান্ত্রিক-কমিউনিস্ট আদর্শের রাজনৈতিক দলগুলোকে বামপন্থী, ধর্মীয় তথা ইসলামপন্থী দলগুলোকে ডানপন্থী, আর সমাজতান্ত্রিক-কমিউনিস্ট কিংবা ইসলামপন্থী আদর্শ ধারণ না করা দলগুলোকে মধ্যপন্থী দল বলা হয়। সঙ্গতকারণেই, আমাদের এই আলাপে ফার লেফট চরমপন্থী দলগুলো এবং ফার রাইট জঙ্গীবাদী – সালাফিস্ট দল বা গোষ্ঠীগুলো জায়গা পাবে না।
(৬) ভোটের হিসেবে দলগুলোর অবয়ব বা বাংলাদেশ স্বাধীনের পর থেকে ৫৩ বছরে ক্ষমতাযন্ত্রের সাথে সংশ্লিষ্টতা-অংশীদারিত্ব বিবেচনায় বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোকে দুটো ভাগে ভাগ করা যেতে পারেঃ ক) বড় চার দল (আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি ও জামাতে ইসলামী), এবং খ) অন্যান্য দল।
(৭) আমাদের বড় চার দলের মধ্যে একটি একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি বিরোধিতা করেছে এবং যুদ্ধাপরাধ তথা রাজাকার, আলবদর ও আলশামস বাহিনী গঠনের মাধ্যমে পাক হানাদার বাহিনীর হত্যাযজ্ঞ ও ধর্ষণে সহযোগিতা এবং নিজেরাও সরাসরি গণহত্যা ও ধর্ষণের মত অপরাধের সাথে জড়িত ছিল। দুটি দলের জন্ম হয়েছে সামরিক ক্যু-এর মধ্য দিয়ে অবৈধ ক্ষমতা দখলকে বৈধ করতে। দুটি রাজনৈতিক দল রাষ্ট্রক্ষমতায় স্বৈরাচারী শাসন কায়েম করেছিল এবং জনগণের অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ক্ষমতাচ্যুত হয়েছিল। এই দলগুলোর নির্বাচনী রাজনীতিতে ভালো জনভিত্তি যেমন আছে, তেমনি তাদের নেতা-কর্মীদের অর্থশক্তি, পেশী শক্তি তথা অস্ত্রশক্তির উপরেও নির্ভর করতে দেখা যায়, সেই সাথে শাসন ক্ষমতা যুক্ত হলে চাঁদাবাজি, টেণ্ডারবাজি, সন্ত্রাস, দখলদারিত্ব, বিরোধী দলের উপরে দমন-নিপীড়ন এবং দুর্নীতির সাথেও যুক্ত হতে দেখা যায়।
(৮) বাম আদর্শবাদী ধারার ও ইসলামপন্থী আদর্শবাদী ধারার রাজনৈতিক দলগুলোর বেশিরভাগেরই সারাদেশে নির্বাচনের রাজনীতির জনভিত্তি নেই। তারা মূলত ঢাকাকেন্দ্রিক, বড় বড় শহর কেন্দ্রিক, কিংবা কোন কোন ক্ষেত্রে মাদ্রাসা কেন্দ্রিক বা পীর কেন্দ্রিক রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন করে। ভোটের রাজনীতিতে বড় দলগুলোর মত ডাকসাইটে প্রার্থী তাদের থাকে না, জনগণও “ভোট নষ্ট” না করে বড় দলের বড় প্রার্থীকে ভোট দিতে যায়, সেই সাথে নির্বাচনে বড় দলগুলোর প্রার্থীদের কালো টাকার ব্যবহার, নির্বাচনী বিধির খেলাপ, সবমিলে ফলাফল হচ্ছে- ছোট দলের জামানত পর্যন্ত বাজেয়াপ্ত হয়ে যায়! এছাড়া, বাম ও ইসলামপন্থী দলগুলোর অনেকের ক্ষেত্রেই আদর্শগত জায়গা থেকে নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় যাওয়া তাদের মূল লক্ষ থাকে না, বরং সমাজতান্ত্রিক বা জনগণতান্ত্রিক বিপ্লব, কিংবা ইসলামী বিপ্লব বা জিহাদের মাধ্যমে ক্ষমতায় যাওয়ার কথা বলে, কোন কোন দল নির্বাচনকেন্দ্রিক হয়ে গেলে অনেক সময়ে দলের অভ্যন্তরে বা একই রকম আদর্শের রাজনীতির চোখে তাদেরকে ভ্রষ্ট, পতিত বা সংশোধনবাদী হিসেবেও চিহ্নিত করা হয়। এরকমের আদর্শগত ধ্যানধারণাও এসব দলকে এককভাবে নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় যাওয়ার লক্ষমাত্রা নির্ধারণে বাঁধা প্রদান করতে পারে। অন্যদিকে, কোন কোন ক্ষেত্রে এসব দলের শীর্ষ নেতারা এমপি – মন্ত্রী হওয়ার লোভে বড় দলগুলোর সাথে নির্বাচনী ঐক্য বা জোট বাঁধে, যা প্রকারান্তরে সেই আদর্শবাদী দলগুলোকে আদর্শচ্যুতির দিকে ধাবিত করে দলে ক্ষতি বৃদ্ধিই করেছে বিভিন্ন সময়ে। এসব দলের আরেকটি বড় সমস্যা হচ্ছে, নানা কারণে দলগুলোর ঘন ঘন ভঙ্গন, যার দরুণ দেশে ছোট দলগুলোর সংখ্যা যেমন ক্রমাগত বেড়েছে, তেমনি তারা ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর হতে হতে অনেক দলই সাইনবোর্ড সর্বস্ব বা নেতা সর্বস্ব দলে পরিণত হয়েছে, বা কোন কোনটি ইতিহাসের অংশ হয়ে গিয়েছে।
রাজনৈতিক দলগুলোর সমস্যা ও সংকটঃ (কেমন রাজনৈতিক দল চাই না)
(৯) গণতন্ত্রহীনতাঃ বাংলাদেশের বামপন্থী, মধ্যমপন্থী ও ডানপন্থী রাজনৈতিক দলগুলো, তথা বড় চার দল ও অন্যান্য দলগুলো- প্রায় কোনটির অভ্যন্তরেই সঠিক গণতন্ত্রের চর্চা নেই। আমাদের দেশে গণতন্ত্রের অর্থ কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠের ভোটে দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব নির্বাচন করা বুঝানো হয়। সেই অর্থে বড় দলগুলোকে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব নির্বাচনের জন্যে কাউন্সিল, সম্মেলন আয়োজন করতে দেখা যায়। প্রধান দুই দলে দুটি পরিবারের সদস্য দলের সর্বস্তরের নেতা-কর্মী-সমর্থকের নিরঙ্কুশ সমর্থন নিয়েই প্রধান নেতার পদে অবস্থান করছেন। তার মানেই এই নয় যে, এসব দলগুলোতে গণতন্ত্রের চর্চা বিদ্যমান। দলগুলোতে গণতন্ত্রের চর্চার মূল সমস্যা হচ্ছে, দলগুলোর সর্বস্তরের সদস্যের মধ্যে গণতান্ত্রিক ধ্যানধারণা-চিন্তাচেতনার অভাব, দলের সিদ্ধান্তগ্রহণের পদ্ধতিতে টপ-টু-বটম-ডাউন এপ্রোচ, নেতার বিপক্ষে মত রাখা তথা নেতাকে নিয়ে প্রশ্ন করার এখতিয়ার না থাকা, বিভিন্ন শাখা সংগঠন ও অঙ্গসংগঠনের ওপরে মূল দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের খবরদারি ও মূল নেতার পছন্দ ও মর্জি মোতাবেক শাখা ও অঙ্গসংগঠনের নেতৃত্ব নির্বাচন, কেন্দ্রীয় নেতার একক আধিপত্য বিস্তার, চিন্তার আদান প্রদানকে অনুৎসাহিত করা, এবং নেতার ব্যক্তি ক্যারিশমাকে কেন্দ্র করে কর্মীদের ক্রিয়াশীল হওয়া, প্রভৃতি প্রবণতা কমবেশি প্রায় সকল রাজনৈতিক দলের মাঝে বিদ্যমান।
(১০) জনমানুষের সাথে সম্পর্কহীনতাঃ বাংলাদেশের বিভিন্ন ধারার রাজনৈতিক দলগুলোর জনসম্পৃক্ততার মাত্রা ও ধরণ বিভিন্নরকম। বড় দলগুলো তুলনায় অনেক বেশি জনসম্পৃক্ত ও তাদের জনভিত্তি অনেক বিস্তৃত। কিন্তু জনজীবনের দৈনন্দিন সমস্যা-সংকটে, শ্রমিকদের, কৃষকের, মেহনতি বা বিভিন্ন পেশাজীবি মানুষের, শিক্ষার্থীদের নানারকম অধিকার আদায়ের আন্দোলনে তাদের ভূমিকা সচরাচর দেখা যায় না, বরং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থাকাকালে অনেক ক্ষেত্রে জনগণের আন্দোলন দমনে অধিক সক্রিয় দেখা যায়। তাদের জনসম্পৃক্তির বড় উৎস হচ্ছে আর্থিক ও সামাজিক নানা সুযোগ সুবিধার আদান-প্রদান, জনগণও নানা প্রয়োজনে এসব দলগুলোর নেতা বা ক্ষমতাশালী নেতার কাছে তদবির নিয়ে হাজির হয়। অন্যদিকে, ইসলামপন্থী দলগুলোর জনসম্পৃক্ততার মূল উৎস ধর্মকেন্দ্রিক সংযোগ, তথা পীর কেন্দ্রিক বা মাদ্রাসা কেন্দ্রিক বা ধর্মীয় ওয়াজ-মাহফিল কেন্দ্রিক সম্পর্ক। কিন্তু এই দলগুলোও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই জনমানুষের দৈনন্দিন সমস্যা-সংকট সম্পর্কে অনাগ্রহী থেকেছে। সেই তুলনায় এদেশের বামপন্থী দলগুলো সবসময়ই জনমানুষের সমস্যা-সংকট নিয়ে কথা বলেছে, শ্রমিকের – কৃষকের – মেহনতি মানুষের অধিকারের দাবিতে লড়েছে। কিন্তু, জনগণের মাঝে জনসম্পৃক্ততা তাদের ক্রমশঃ কমেছে। বড় দলগুলোর মত অর্থ ও ক্ষমতা দিয়ে তারা মানুষকে কাছে টানে না, কিংবা ইসলামপন্থী দলগুলোর মত ধর্মকেন্দ্রিক, তথা পীর কেন্দ্রিক, মাদ্রাসা কেন্দ্রিক বা ওয়াজ-মাহফিল কেন্দ্রিক যোগাযোগও তাদের নেই। তদুপরি, জনমানুষের অধিকার ও দাবি দাওয়া উত্থাপনের ক্ষেত্রে, জনমানুষের চাহিদা, আশা ও আকাঙ্ক্ষা ঠিকঠাক বুঝতে পারা, সঠিক সময়ে সঠিক দাবি তুলে আস্থার জায়গা যেতে পারা – এসবেও তাদের দুর্বলতা প্রকট।
(১১) পপুলিজমের ঝোঁকঃ রাজনৈতিক দলগুলোর মাঝে জনগণের তাৎক্ষণিক সুবিধাকেন্দ্রিক দাবি-দাওয়া উত্থাপন বা প্রতিশ্রুতি প্রদান, কিংবা মানুষের তাৎক্ষণিক ব্যাক্তিগত প্রাপ্তিবোধ উৎসারিত চিন্তাগত দূর্বলতার সুযোগ নিয়ে আপাত জনপ্রিয় বক্তব্য প্রদান বা কর্মসূচি পালনের ঝোঁক দেখা যায়। বড় দলগুলো নির্বাচনের আগে নানান রকমের বাহারি প্রতিশ্রুতির ডালি সাজায়, যেখানে চোখ ধাঁধানো উন্নয়নের গল্প যত থাকে, সে তুলনায় মানুষের জীবনমান পরিবর্তনের আলাপ অনেক কম থাকে। অনেক সময় দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ ধর্মপ্রাণ মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিকে কাজে লাগাতে ধর্মীয় ভেদ নষ্ট হয় এমন বক্তব্য প্রদান করে, কখনো জাতিগত বিদ্বেষ, সাম্প্রদায়িক সংঘাতমূলক বক্তব্য ও কর্মসূচির মাধ্যমেও সস্তা জনপ্রিয়তা অর্জনের চেষ্টা করে। বামপন্থী দলগুলোর মাঝে পপুলিস্ট বা জনতুষ্টিবাদী রাজনীতি করার ঝোঁক অনেক কম থাকার কথা, কিন্তু বাংলাদেশের অধিকাংশ বামপন্থী দল ও তাদের অঙ্গসংগঠনগুলোকে মূলত অর্থনীতিবাদী বিভিন্ন দাবিদাওয়ার মাঝেই ঘুরপাক খেতে দেখা যায়। যদিও বিভিন্ন সময়ে জনগণের একটি ভীষণ “পপুলার” দাবির প্রতি “মধ্যবিত্তসুলভ সুবিধাবাদ” এর তকমা লাগিয়ে মুখ ঘুরিয়ে রাখে, ফলে জনগণ ভীষণভাবে নেমে পড়লে তখন সেই আন্দোলনের অনেক পেছন থেকে দৌড়ে ধরার চেষ্টা করে, নেতৃত্ব পর্যায়ে যাওয়া সম্ভব হয় না।
(১২) আইনের শাসনের প্রতি অশ্রদ্ধাঃ আমাদের রাষ্ট্রের, সমাজের ও রাজনীতির সঠিকভাবে কাজ না করার অন্যতম প্রধান কারণ হচ্ছে, এখানে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা যায়নি। এই আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে না পারার পেছনে রয়েছে এদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা। বিশেষ করে বিভিন্ন সময়ে রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকা ও বিরোধীদলে অবস্থান করা বড় চার রাজনৈতিক দলের রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক চর্চার মাঝে আইনের শাসনের প্রতি ন্যুনতম শ্রদ্ধা দেখা যায়নি। দেশের আইন-কানুনকে থোড়াই কেয়ার করে, তারা আধিপত্য বিস্তারের তথা ক্ষমতার লড়াইয়ের রাজনীতিই তারা করেছে। দখলদারিত্ব, চাঁদাবাজি, টেণ্ডারবাজি, দুর্নীতি, লুটপাট, অর্থপাচার, নিপীড়ন, অস্ত্রবাজি, সন্ত্রাস, হত্যা-খুন-জখম থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় আইনে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে এই রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা যুক্ত হয়েছে। রাজনৈতিক ক্ষমতাকে অঢেল সম্পত্তি বানানোর হাতিয়ার বানিয়েছে, সরকার গঠনের পরে দলীয় ক্ষমতাকে নিরঙ্কুশ করতে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে অবাধ দলীয়করণ করেছে, প্রতিপক্ষ বা প্রতিদ্বন্দ্বীকে দমন-পীড়ন করতে রাষ্ট্রীয় বাহিনীকে ব্যবহার করে এসেছে। যে দলগুলো বড় দলগুলোর কাঁধে চেপে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কাছাকাছি হয়েছে, তাদের মাঝেও একই রকম প্রবণতা প্রকাশিত হয়েছে। অন্যান্য দলগুলো রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বাইরে বা দূরে অবস্থান করলেও, নানা সময়ে অন্তঃদলীয় ও আন্তঃদলীয় কোন্দল ও সংঘর্ষে লিপ্ত হয়েছে, ও অনেকের নেতাকর্মীদেরও নানা সময়ে নিপীড়নমূলক, আইন-শৃঙ্খলা পরিপন্থী ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হয়েও দলীয় সমর্থন বা প্রশ্রয় পেতে দেখা গিয়েছে।
(১৩) পরিবারপ্রথাঃ দেশের প্রধান দুই দলের প্রধান নেতৃত্ব দুটি পরিবার থেকে এসেছেন। একজন প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির কন্যা এবং একজন প্রয়াত রাষ্ট্রপতির স্ত্রী এই দুই দলের সংকটময় সময়ে হাল ধরেন ও দীর্ঘকাল দলদুটিকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেন, একাধিকবার প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিতও হন। তাদের পরে তাদের সন্তানও রাজনীতিতে সক্রিয় হয়েছেন। অপর একটি বড় দলের প্রধান নেতার মৃত্যুর পরে তার স্ত্রী, ছোট ভাই ও সন্তান নেতৃত্বে এসেছেন। এছাড়াও, এসব দলের বড় নেতার সন্তানরাও রাজনীতিতে পিতার জায়গায় প্রভাবশালী নেতা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন এবং সংসদ সদস্য, ক্ষমতাশালী মন্ত্রীও হয়েছেন। এরকম বংশানুক্রমিক পরিবার প্রথার ক্ষতি দু’রকম, প্রথমত দলের অভ্যন্তরে গণতান্ত্রিক চর্চা ব্যহত হয় ও নেতৃত্বের বিকাশ মুখ থুবড়ে পড়ে, এবং দ্বিতীয়ত, দলে ও দলের বাইরে এবং দলটি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসীন হলে রাষ্ট্রে, বিশেষ বিশেষ পরিবারের হাতে যাবতীয় ক্ষমতা কুক্ষীগত হয়।
(১৪) বিরোধী দল ও মতের প্রতি জীঘাংসাঃ আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর মাঝে পরমতসহিষ্ণুতার বড় অভাব। বড় ও ক্ষমতার আশেপাশের দলগুলোর ক্ষেত্রে এই সমস্যা অনেক প্রকট, সহিংস ও ক্ষেত্রেবিশেষে প্রাণঘাতী রূপও নেয়। ক্ষমতাকে কেন্দ্র করে লড়াইয়ে ক্ষমতায় থাকা ও ক্ষমতা প্রত্যাশী দলগুলোর দ্বন্দ্ব-সংঘাত দেশে অরাজক পরিস্থিতি তৈরি করে, দলগুলোর নেতা-কর্মীই শুধু নয়, সাধারণ জনগণও এর ভুক্তভোগী হয়। তবে, এ সমস্যা শুধু বড় ও ক্ষমতার আশেপাশে থাকা রাজনৈতিক দলগুলোর সমস্যা নয়, অন্য দলগুলোর মাঝেও কমবেশি এমন সমস্যা রয়েছে। ইসলামিকদলগুলোর মাঝেও নানা সময়ে সংঘাতের খবর আমরা দেখেছি, দুই পীরের মুরিদদের মাঝে (দুই রাজনৈতিক দলের সদস্যও তারা) রাজপথে মারামারি, লাঠালাঠি ঘটেছে। বাম দলগুলোর মাঝে এরকম বড় ধরণের সংঘাত দেখা না গেলেও, একে অপরের প্রতি তীব্র রেষারেষি, এমনকি একই যুক্ত প্লাটফর্ম বা জোটে অবস্থানকারী অন্য দলের সাথে প্রতিযোগিতা, অন্য দলের প্রতি অশ্রদ্ধা ও অসহিষ্ণুতা – এসবও প্রকাশিত হতে দেখা গিয়েছে। এই সমস্যা কেবল ভিন্ন দলের প্রতিই নয়, রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরেও ভিন্ন মতকে দমনের চর্চা দেখা যায়, অনেক ক্ষেত্রে গ্রুপিংকে কেন্দ্র করে দলের অভ্যন্তরেই সংঘাতের পরিস্থিতি তৈরি হয়। রাজনৈতিক দলগুলোর ভিন্নমতকে নৃশংসভাবে দমনের এই চর্চা ক্ষমতায় গিয়ে ভয়ানক রূপ নেয়, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকে ব্যবহার করে শুরুতে বিরোধীদলকে দমন, পীড়ন শুরু হয়, একটা সময়ে নিশ্চিহ্ন করারও চেস্টা যুক্ত হয়ে যায়। এবং, তা কেবল বিরোধী দলকে দমন নয়, সাধারণ জনগণের মাঝেও যেকোন রকম বিরোধিতা ও ভিন্নমতকে দমনের দিকেও ধাবিত করে।
(১৫) ক্ষমতালোভ ও ক্ষমতাকে আঁকড়ে ধরার প্রবণতাঃ আমাদের দেশে শাসনতান্ত্রিক ক্ষমতা একটা রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীকে রাতারাতি প্রভূত ক্ষমতার অধিকারী করে, আর শাসনক্ষমতা থেকে সরে যাওয়া তাকে কেবল দুর্বলই করে না, ক্ষেত্রবিশেষে জান-মাল-জীবিকা রক্ষা করাই কঠিন হয়ে যায়। ক্ষমতার পটপরিবর্তনের সাথে সাথেই সারাদেশের সমস্ত জায়গাতেই ক্ষমতার হাতবদল হতে থাকে, এক দলের নেতাকর্মীদের কাছ থেকে দখলদারিত্ব অন্য দলের হাতে যাওয়ার এই প্রক্রিয়া অনেকাংশেই ভীষণ সহিংস হয়! ফলে, শাসনতান্ত্রিক ক্ষমতা যে সমাজের সর্বত্র আধিপত্য বিস্তারকারী ক্ষমতার অধিকারী করে এবং একই সাথে বিত্ত-বৈভব বাড়িয়ে নেয়া ও আরাম-আয়েশ ও ভোগ বিলাসের যে সুযোগ করে দেয়, তা রাজনৈতিক দলগুলোর মাঝে ক্ষমতার প্রতি তীব্র লোভ তৈরি করে। অন্যদিকে, ক্ষমতা হারানোর পরে জান নিয়েই যে টানাটানি লেগে যায়, সেই ভয়ও থাকে প্রচণ্ড। ক্ষমতালোভ আর ক্ষমতা হারানোর তীব্র ভয় – এই দুইয়ের মিলিত ফল হচ্ছে, ক্ষমতা আঁকড়ে রাখার তীব্র প্রচেষ্টা। একবার ক্ষমতায় আসীন হলে, আর কেউ গদি হারাতে চায় না, যেনতেন প্রকারে গদি টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করে, কখনো কখনো মরিয়া হয়ে যায়।
(১৬) আর্থিক অসঙ্গতিঃ রাজনৈতিক দলগুলোর দৈনন্দিন কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্যে যে অর্থের প্রয়োজন হয়, তা মূলত সদস্যদের চাঁদা ও গণচাঁদার ওপরে নির্ভর করে চলার কথা। কিন্তু অনেক দলের ক্ষেত্রেই, বিশেষত বড় দলগুলোর ক্ষেত্রে সদস্য চাঁদার বিষয়টি হয় ধনবান সদস্যদের দলের অভ্যন্তরে প্রভাব প্রতিপত্তি বৃদ্ধির উপায়, এবং গণচাঁদা হয়ে যায়, বিভিন্ন ব্যবসায়ী ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান কেন্দ্রিক চাঁদা। সেই সাথে দলের বিভিন্ন স্তরের ও অঙ্গ সংগঠনের নেতার্কমীদের চাঁদাবাজি, টেণ্ডারবাজি, দখলবাজিও ঐসব নেতাকর্মীর ও দলের আর্থিক উৎসও হয়ে ওঠে। বিভিন্ন ধনকুবের ও ব্যাবসায়িক প্রতিষ্ঠান রাজনৈতিক দলকে বড় অর্থ প্রদান করে, বিনিময়ে নানা সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার লক্ষে, সেক্ষেত্রে রাজনীতি হয়ে ওঠে ব্যবসা, আর সেই সদস্যচাঁদা হয় ব্যবসার লগ্নি। এটি ভালো বুঝা যায়, নির্বাচনের সময়ে, যেখানে রমরমে মনোনায়ন বাণিজ্য চলে, যেখানে দলের নিবেদিত প্রাণ নেতাকর্মীকে টপকে ধনকুবের কোন নেতা চড়া দামে মনোনায়ন কিনতে পারে। তারপরে নির্বাচনেও চলতে থাকে টাকার খেলা। পুরো বিষয়টিতেই যে বিপুল আর্থিক কর্মকাণ্ড চলে, সেখানে কালো টাকার মালিকেরাও এধরণের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হয়! অন্যদিকে বাম দলগুলোর ক্ষেত্রে এমন আর্থিক প্রতাপ ও দুর্নীতির বিষয় সেভাবে নেই, বরং দলের নেতা কর্মী সমর্থকদের অর্থে ও অক্লান্ত পরিশ্রমে দলের সম্পদ গড়ে ওঠে। কিন্তু এসব দলের ক্ষেত্রেও দলের সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের সামনে আর্থিক স্বচ্ছতার অভাব থাকার অভিযোগ দেখা যায়, কখনো দলের সদস্যদের না জানিয়ে দলের নীতি-আদর্শের বিরুদ্ধে গিয়ে শেয়ারে ও ব্যবসায় বিনিয়োগ করা, কিংবা বিশেষ বিশেষ ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর কাছ থেকে গোপনে ডোনেশন নেয়ার অভিযোগও উঠেছে। এছাড়া, দল ভাগের সময়ে দলের অভ্যন্তরে এই সম্পত্তির ভাগাভাগি নিয়ে দ্বন্দ্ব-সংঘাতে লিপ্ত হওয়ার ঘটনা দেখা যায়। আর, সবমিলে এসব দলের আর্থিক যে সক্ষমতা থাকে তা দিয়ে তারা নির্বাচনের রাজনীতিতে বড় বড় দলগুলোর সাথে কোন রকম প্রতিযোগিতা, প্রতিদ্বন্দ্বিতাই গড়ে তুলতে সক্ষম হয় না। এছাড়া দেশের বেশ কিছু দলের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যেখান থেকে দলীয় তহবিলই কেবল সমৃদ্ধ হয় না, দলীয় কর্মীদের কর্মসংস্থানেরও ব্যবস্থা হয়। ইসলামিক দলগুলোর অনেকেই গণচাঁদার ওপরে নির্ভর করলেও, তারা জনগণের কাছে মূলত ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক কারণ দেখিয়ে চাঁদা সংগ্রহ করে! এর বাইরে, কোন কোন রাজনৈতিক দল দেশের বাইরে থেকেও অর্থসংগ্রহ করে বলে অভিযোগ রয়েছে।
(১৭) ব্যবসায়ী – আমলাতন্ত্র – সামরিকতন্ত্রের প্রভাবঃ দেশের বড় দলগুলো ক্রমেই ব্যবসায়ী, আমলাতন্ত্র ও সামরিকতন্ত্রের খপ্পরে পড়েছে। দিনে দিনে এসব দলে নিবেদিত প্রাণ নেতাকর্মীরা কোনঠাসা হয়েছে, ব্যবসায়ী ও প্রাক্তন আমলা – সামরিক কর্মকর্তাদের অবস্থান শক্তিশালী হয়েছে। দেশের বড় বড় ব্যবসায়িক গ্রুপগুলো রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের সাথে সাথে পক্ষ পরিবর্তন করতেও দেখা গিয়েছে বিভিন্ন সময়ে। আবার দেশের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের ক্ষেত্রে ব্যবসায়ী – আমলাতন্ত্র ও সামরিকতন্ত্রের পরোক্ষ – প্রচ্ছন্ন – গোপন প্রভাবও দেখা যায়। সে কারণে ক্ষমতাসীন দল এই ব্যবসায়ী – আমলাতন্ত্র – সামরিকতন্ত্রকে খুশী ও হাতে রাখতে নানারকম প্রণোদনা প্রদানের চেষ্টা করে যায়! সেই প্রণোদনা যখন অনেক বড় হয়, তখন কোন বিশেষ ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলকে জনগণের গণতান্ত্রিক নাগরিক অধিকার কেড়ে নিতেও সম্মতি প্রদান করে, উৎসাহিত করে।
সংকটের কারণ অনুসন্ধানঃ
(১৮) বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর যাবতীয় সংকটের কারণসমূহকে মোটা দাগে দুটি বর্গে ভাগ করা যায়। প্রথম বর্গে আছে মানুষ বা জনগণ, অন্যটি মানুষের সংগঠন তথা এই সমাজ, রাষ্ট্র, প্রতিষ্ঠান, এমনকি রাজনৈতিক দলও হচ্ছে এই সংগঠন। অর্থাৎ, রাজনৈতিক দলগুলোতে এদেশের মানুষই নেতা হয়, কর্মী হয়, সমর্থক হয়। ভোট যদি ঠিকঠাক হয়, এদেরশের মানুষ এসব রাজনৈতিক দলগুলোকে ভোটও দেয়। ফলে, এই মানুষের শিক্ষাগত, রুচি-আচার-আচরণ গত তথা সংস্কৃতিগত অবস্থা ও অবস্থান, তাদের তৈরি রাজনীতিকে নির্মাণ করে, আকার দেয়। কথ্য ভাষায়, যেমন দেশের মানুষ, তেমন তার রাজনীতি! অন্যদিকে, সমাজ – রাষ্ট্র সংগঠন, তথা দেশের আইন কানুন সংবিধান, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোও, তথা রাজনীতি মানুষের রাজনৈতিক চর্চাকেও প্রভাবিত করে, মানে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রকরণ তৈরি করে দেয়। মানুষকেন্দ্রিক ও সংগঠনকেন্দ্রিক – এই দুই বর্গ পরষ্পর বিযুক্ত কারণ নয়, বরং উভয় উভয়টির সাথে দ্বান্দ্বিকভাবে সম্পর্কিত। একে অপরকে প্রভাবিত করে। মানুষ যেমন সংগঠন তৈরি করে, আবার সংগঠনও মানুষকে নির্মাণ করতে থাকে। ফলে, রাজনৈতিক দলের সমস্যা সংকটের কারণ হিসেবে মানুষের রুচি, আদর্শ, নৈতিকতা, সংস্কৃতি এসবের নিম্নগামিতার কথা বলা হলে, তার পেছনের কারণ হিসেবে আবার সেই সংগঠন, বা পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র – তার শিক্ষাব্যবস্থা, আইন কানুন, প্রভৃতির পশ্চাতপদতা চলে আসে, এবং একই সাথে এই সংগঠনগুলোর সমস্যা-সংকটের পেছনে কারণ হিসেবে সেই সংগঠনগুলো গড়ে তোলা বা যুক্ত মানুষকেই পাওয়া যাবে।
(১৯) শিক্ষাব্যবস্থাঃ স্বাধীনতার ৫৩ বছরেও আমাদের একটি গণতান্ত্রিক, সার্বজনীন, বৈষম্যহীন শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। আমাদের বিদ্যমান শিক্ষাব্যবস্থায় ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত দেশের প্রতিটি নাগরিকের সমান প্রবেশাধিকার নেই, প্রাথমিক শিক্ষা পর্যন্ত শিক্ষা বাধ্যতামূলক ও অবৈতনিক হলেও, সকল স্কুলের মান ও শিক্ষা চর্চা একরকম নয়, অধিকাংশ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষাদানের আয়োজন খুবই নাজুক। প্রাথমিকের পরে মাধ্যমিকে ঝরে পড়ার হার এখনও প্রচুর, সরকারি মাধ্যমিক স্কুলের সংখ্যা আশংকাজনকভাবেই কম। গ্রাম ও শহরের স্কুল-কলেজগুলোর মাঝে শিক্ষার মানের পার্থক্য বিশাল। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষায় গবেষণা কার্যক্রম ভয়ানকভাবে অবহেলিত, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান এতই নিম্ন পর্যায়ের ও নিম্নগামী যে, দুনিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর রেটিং-এ আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো একদম তলানির দিকে অবস্থান করে। আমাদের শিক্ষাক্রম নিয়ে ঘন ঘন নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হও, শিক্ষার্থী – শিক্ষক – অভিভাবকদের এর সাথে তাল মেলাতে হিমশিম খেতে হয়। সবমিলেই, এখন পর্যন্ত আমাদের এই শিক্ষাব্যবস্থা তার শিক্ষার্থীকে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ যুক্ত আধুনিক মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে পারে না।
(২০) পারিবারিক-সামাজিক সংস্কৃতিঃ আমাদের সমাজে ও পরিবারগুলোতে এখনো সামন্তীয় ধ্যান ধারণা ও সংস্কৃতি বিরাজমান। পিতৃতান্ত্রিক পরিবার কাঠামোতে সন্তানের ওপরে অধিকাংশ ক্ষেত্রে পিতার, কখনো কখনো পিতামাতার একনায়কতন্ত্র চলে। সিদ্ধান্ত গ্রহণে পরিবারের সকল সদস্যের মতের সমান গুরুত্ব থাকে না। স্কুলেও বাচ্চারা শিক্ষকদের, সমাজে বয়োজ্যেষ্ঠদের প্রশ্ন করতে, তর্ক করতে শেখে না। বাসায় কাজের মানুষ, স্কুলে আয়া-দপ্তরি এবং বড় হয়ে চাকরি করতে গিয়েও হায়ারার্কির চর্চায় অভ্যস্ত হয়। ফলে, এই পারিবারিক ও সামাজিক সংস্কৃতিতেই ক্ষমতাকে সমঝে ও তোয়াজ করার শিক্ষা ও আয়োজন রয়েছে। ক্ষমতাহীন, দুর্বল ও প্রান্তিককে অপর করে দেয়ার সংস্কৃতি চলমান। ফলে, রাজনৈতিক দলে গিয়েও সেই প্রভাব পড়ে। সবল ও ক্ষমতাবানকেই নেতা হিসেবে মেনে নেয়।
(২১) রাষ্ট্রীয় কাঠামো ও সংবিধানঃ বাংলাদেশ রাষ্ট্রটি তার শুরু থেকেই একটি গলদপূর্ণ ও অগণতান্ত্রিক উপায়ে যাত্রা করে। রক্তক্ষয়ী এক যুদ্ধের মাধ্যমে পাকিস্তান থেকে আলাদা বাংলাদেশের জন্ম হলেও, বস্তুত রাষ্ট্রীয় অধিকাংশ কাঠামো থেকে যায় পাকিস্তান ও বৃটিশ আমলের। ১৯৭২ সালে যে সংবিধান প্রণয়ন করা হয়, তার প্রকৃয়া পদ্ধতি ছিল অগণতান্ত্রিক। তদুপরি, সংবিধানটির ভেতরেও ক্ষমতা ভারসাম্যহীনতা, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানসমূহের স্বাধীনতাহীনতা ও জবাবদিহিতাহীনতা এবং জনগণের স্বীকৃত মৌলিক অধিকারের নিশ্চয়তা না থাকা, নতুন জন্ম নেয়া রাষ্ট্রটির ঘুরে দাঁড়ানোর সমস্ত সম্ভাবনা নস্যাৎ হয়ে যায়। আমাদের কোন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানই স্বাধীন ও জনবান্ধব প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠতে পারেনি, বরং সরকারের তথা সরকারি রাজনৈতিক দলের আজ্ঞাবহ প্রতিষ্ঠানে পরিণত হওয়ার আয়োজন সংবিধানেই রাখা হয়েছে। তারপরে সেই সংবিধানটি আরো অনেকবার কাটাছেড়া ও যথেচ্ছাচারে গণতন্ত্রকে নির্বাসনে পাঠানো হয়েছ, সাংবিধানিক ফ্যাসিবাদ এসে বাংলাদেশের জনগণের ওপরে চেপে বসেছে। ফলে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর সমস্যা সংকটের অন্যতম প্রধান কারণ হচ্ছে, আমাদের অগণতান্ত্রিক ও জনগণের ওপরে সরকারে আধিপত্যবাদী সংবিধান ও বিদ্যমান আইন কানুন, এবং রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোর কোনটিই স্বাধীন সত্ত্বা হিসেবে দাঁড়াতে না পারা।
ক) আইনের শাসনের অনুপস্থিতিঃ একটা দেশে আইনের শাসন আছে তখনই বলা যায়, যদি সে দেশের প্রতিটা নাগরিক, তার লিঙ্গ, জাতি, ধর্ম, শ্রেণী নির্বিশেষে রাষ্ট্রের কাছ থেকে সমান সুরক্ষা পায়। এটি বাংলাদেশে অলীক স্বপ্নের মত। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্যে একদম প্রাথমিক শর্ত হচ্ছে, নির্বাহী বিভাগ (সরকার) থেকে বিচার বিভাগকে পৃথক ও স্বাধীন করে দেয়া, দেশের আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর ওপরেও নির্বাহী বিভাগের যথেচ্ছ খবরদারি বন্ধ করে দেয়া, এবং আইন বিভাগকে (সংসদ) নির্বাহী বিভাগ সমেত অন্যান্য বিভাগের জবাবদিহিতার কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা। সেটি সম্ভব হয়নি, আমাদের বিচার বিভাগ ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী নির্বাহী বিভাগের আজ্ঞাবহ, শুধু তাই নয় একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া রাজনৈতিক দল সরকার গঠন করলে আইন বিভাগও নির্বাহী বিভাগের আজ্ঞাবহ হয়ে যায়। ক্ষমতার এই ভারসাম্যহীনতা আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বাঁধাস্বরূপ, কেননা সেক্ষেত্রে দেশের আইন কানুন – থানাপুলিশ – বিচার আদালত সবই ক্ষমতার পুজারি হয়ে যায়! আর, সেই ক্ষমতার অধিকারী হওয়ার সবচেয়ে বড় উপায় হচ্ছে রাজনৈতিক শাসন ক্ষমতায় আসীন হওয়া। এভাবেই রাজনৈতিক দলগুলো, বিশেষ করে বড় দলগুলো ক্ষমতার গদির জন্যে মরিয়া হয়ে ওঠে।
খ) প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন ব্যবস্থা ও অনুগত নির্বাচন কমিশনঃ আমাদের নির্বাচন ব্যবস্থা ভীষণ গলদপূর্ণ। আসন ভিত্তিক যে নির্বাচন পদ্ধতি বিদ্যমান, সেখানে জনগণের মতামতের প্রকৃত প্রতিফলন ঘটেনা। আমাদের জাতীয় নির্বাচনে কোন একটি দল সারাদেশে ৪০% ভোট পেয়েও দুই তৃতীয়াংশ আসন পেয়ে যেতে পারে। এর ফলে সরকারে যে দলটি যায়, সে অশেষ ক্ষমতার অধিকারী হয়ে ওঠে, আর বিরোধীদল দুর্বল হয়ে যায়, এবং সংসদ অকার্যকর হয়ে পড়ে। এ ছাড়াও আসন কেন্দ্রিক নির্বাচনে প্রতিটি আসনে সংসদ সদস্য পদে বিভিন্ন দলের মনোনায়ন পাওয়া ব্যক্তিরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন, ফলে রাজনৈতিক দলগুলোর চর্চাও এই ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়, দলের রাজনীতি, আদর্শ, কর্মসূচি তথা মেনিফেস্টো খুব কমই আলোচিত হয়। এর প্রভাব পড়ে রাজনৈতিক দলগুলোতেও, ব্যক্তি কারিশমা, ব্যক্তির অর্থ ও মাসল পাওয়ার, এলাকায় ব্যক্তির পারিবারিক মানমর্যাদা- যা যা একজনকে নির্বাচিত করতে পারবে বলে মনে হয়, সেসবই নেতৃত্বের গুনাবলী হিসেবে বিবেচিত হতে থাকে। এছাড়া, আমাদের নির্বাচন কমিশন স্বাধীন ও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান হিসেবে দাঁড়াতে পারেনি। প্রতিটি ক্ষমতাসীন দলই নির্বাচন কমিশনকে নিজের স্বার্থে ব্যবহার করার চেস্টা করেছে। এই নির্বাচন কমিশন সুষ্ঠু – নিরপেক্ষ নির্বাচন করতে সক্ষম নয়, নির্বাচনে কালো টাকার দৌরাত্ম্য বন্ধ করতে সক্ষম নয়! ফলে, বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে অংশ নিতে আস্থা পায় না, এর সমাধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা চালু হয়েছিল, সেই নির্দলীয় তত্ত্বাবধায় সরকার গঠন নিয়ে বড় দলগুলোর মাঝে দ্বন্দ্ব-সংঘাত চরমে উঠেছিল। নির্বাচন কমিশন যেহেতু নির্বাচনে অর্থ ও পেশী শক্তির প্রভাব নির্মূল করতে সক্ষম নয়, সেহেতু নির্বাচনকেনন্দ্রিক বড় দলগুলোও নির্বাচনে নির্বিচারে অর্থ ও পেশী শক্তি ব্যবহার করে।
গ) অকার্যকর সংসদ ও ক্ষমতাশালী সংসদ সদস্যঃ একটা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় জাতীয় সংসদ বা আইনসভাকে হতে হয় জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে রাষ্ট্রের ক্ষমতার উৎস, আর জাতীয় সংসদের বাইরে সংসদ সদস্যদের ক্ষমতা হতে দেশের সাধারণ নাগরিকের সমপরিমাণ। আমাদের দেশে বিষয়টি ঠিক উল্টো, সংসদের ভেতরে সংসদ সদস্যরা নিজ দলীয় প্রধানের আজ্ঞাবহ, ক্ষেত্র বিশেষে ঠুঁটো জগন্নাথ। অন্যদিকে সংসদের বাইরে তারা নিজ নিজ আসনে সবচেয়ে ক্ষমতাবান ব্যক্তি। এই ব্যবস্থাও সরকারে থাকা রাজনৈতিক দলগুলোকে সারাদেশে বাড়তি ক্ষমতা প্রদান করে।
ঘ) বিরোধীদল দমনকারী দুর্নীতি দমন কমিশনঃ ক্ষমতার অপব্যবহারের এক বড় প্রণোদনা হচ্ছে আর্থিকভাবে লাভবান হওয়া। ফলে, রাষ্ট্রীয় পদে বা দায়িত্বে আসীন তথা ক্ষমতায় থাকা ব্যক্তিদের একটি পয়সাও অবৈধভাবে আয়-উপার্জনে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করার রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান হচ্ছে দুর্নীতি দমন কমিশন, যা কোনকালেই বাংলাদেশে সঠিকভাবে তার দায়িত্ব পালন করতে পারেনি। এই প্রতিষ্ঠানটি সরকারী রাজনৈতিক দলের আজ্ঞাবহ হয়ে থেকেছে, এবং ক্ষমতাসীনদের ওপরে নজরদারি চালিয়ে তাদের যেকোন রকম দুর্নীতির পথ বন্ধ করে দেয়ার চাইতেও, পূর্বতন সরকারে থাকা দল তথা বিরোধীদলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে, বিরোধীদলকে দমনের উদ্দেশ্যে এই প্রতিষ্ঠানকে ব্যবহার করা হয়েছে। ক্ষেত্রবিশেষে, মিথ্যা ও বানোয়াট মামলাও দেয়ার অভিযোগ এসেছে। ফলে বিরোধী রাজনৈতিক নেতৃত্বের নামে দুর্নীতির অভিযোগগুলোকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসামূলক হিসেবে দেখা হয়েছে, এবং রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের সাথে সাথে সেই মামলাগুলো দ্রুতগতিতে খারিজ করা হয়েছে। বাংলাদেশে একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী দুর্নীতি দমন কমিশনের অনুপস্থিতি ক্ষমতাসীন ও ক্ষমতাপ্রত্যাশী রাজনৈতিক দলগুলোর আর্থিক দুর্বৃত্তায়নের পথ সুগম করে দিয়েছে!
ঙ) স্বায়ত্বশাসনবিহীন বিশ্ববিদ্যালয়ঃ বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংগ্রামের ইতিহাসে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার্থীদের ও ছাত্র সংগঠনগুলোর উজ্জ্বল ভূমিকা আছে। আবার, সে কারণেই ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল সবসময় বিশ্ববিদ্যালয়কে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করেছে। বড় দলগুলোর ছাত্র সংগঠনও বিশ্ববিদ্যালয়ে দখলদারিত্বের লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়েছে, একে অপরের সাথে সংঘাতে লিপ্ত হয়েছে, এবং একটা পর্যায়ে এসে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকে ব্যবহার করে ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠন বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজের একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছে। হলগুলো দখল, শিক্ষার্থীদের রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশগ্রহণে বাধ্য করা, নানারকম নিপীড়ন এসব চলতে থাকে, এবং বিশ্ববিদ্যালয় ও আশেপাশের এলাকায় সরকারী ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীরা টেণ্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, অস্ত্রবাজির মত অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হয়ে পড়ে। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ে নারী শিক্ষার্থীর ওপরে যৌন নিপীড়ন, ধর্ষণ ও ধর্ষণের সেঞ্চুরির মত ভয়ানক অপরাধেও লিপ্ত হতে দেখা গিয়েছে। এসব কিছুই হতে পেরেছে, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে সরকার বা নির্বাহী বিভাগ কর্তৃক নিয়ন্ত্রণ করার কারণে, কেননা নির্বাহী বিভাগ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনে, এমনকি শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে এমনই দলীয়করণ করতে পারে যে, প্রশাসনের নাকের ডগায় বসে, তাদের অনুকম্পা বা প্রশ্রয়েই সরকার দলীয় ছাত্র সংগঠন দখলদারিত্ব চালায়, টেণ্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, যাবতীয় অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হয়, হলে ও ক্যাম্পাসে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করতে পারে। সাধারণ শিক্ষার্থীরা এই দলীয় প্রশাসনের কাছে কোন রকম সুরক্ষাই পায় না, তার চেয়ে ছাত্র সংগঠনের নেতা বা বড় ভাইয়ের অনুগত থাকলে অনুকম্পা লাভ সহজতর হয়!
(২২) গণমাধ্যমের ওপরে নিয়ন্ত্রণঃ আমাদের দেশের গণমাধ্যম মুক্ত নয়। গণমাধ্যমের ওপরে কয়েক ধরণের নিয়ন্ত্রণ বলবৎ আছে। প্রথমত, আমাদের দেশে অধিকাংশ ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট গণমাধ্যমই সরকারের তথা ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের নিয়ন্ত্রণাধীন ও আজ্ঞাবহ। সরকার নানা সময়ে গণমাধ্যমের খবর প্রকাশের ক্ষেত্রে নানান বিধিনিষেধ আরোপ করে থাকে। দ্বিতীয়ত, গণমাধ্যমগুলো বায়াসড বা পক্ষপাতদুষ্ট। প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো, দলীয় প্রধান ও ডাকসাইটে নেতার খবর যত গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করে, সে তুলনায় অন্য ছোট রাজনৈতিক দল বা বড় দলেরও মধ্যম বা নীচু সারির নেতাদের খবর সেভাবে গুরুত্ব পায় না। তৃতীয়ত, আমাদের গণমাধ্যমগুলোর অধিকাংশই কোন কোন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের অধীন। গণমাধ্যমগুলোর নিজেদেরও থাকে ব্যবসায়িক লক্ষ ও উদ্দদেশ্য। ফলে, তারা নিজদের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের স্বার্থ পরিপন্থী কোন খবর পরিবেশন করে না, তেমনি কোন নিউজের ব্যবসায়িক ভ্যালু কেমন (পাবলিক কেমন খাবে) তা অনুযায়ী খবর পরিবেশনে গুরুত্ব দেয়। এসবও রাজনৈতিক সংস্কৃতির ওপরে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
(২৩) স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাঃ আমাদের আসন ভিত্তিক নির্বাচন পদ্ধতিতে যে সংসদসদস্যরা নির্বাচিত হন, তারা সংসদের আইনপ্রণেতা হিসেবে ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানসমূহের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার দায়িত্ব পালনের চাইতেও এলাকার বা তার আসনের একজন এমপি হয়ে থাকেন। এর ফলে আমাদের স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা কখনই দাঁড়াতে পারেনি। স্থানীয় জনগণের ভাগ্যোন্নয়নের সিদ্ধান্ত নেয়া, বাজেট প্রণয়ন করা, স্থানীয় প্রশাসনকে নেতৃত্ব দিয়ে জনগণের কল্যাণে কাজ করা – এই কাজগুলো এখনকার স্থানীয় সরকারের যে ব্যবস্থা বিদ্যমান আছে, তারা করতে পারে না; বরং সরকারী কিছু বরাদ্দের বিলিবন্টন, আর এলাকার লোকজনের নানারকম তদবির ও দেন দরবার বাদে স্থানীয় সরকারের তেমন কাজ নেই। ফলে, উপজেলা বা ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে স্থানীয় জনগণের মাঝে কাজ করা ও জনগণের সাথে আত্মিক সম্পর্ক গড়ে তোলার সুযোগও তাই মেলে না। রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাকর্মীরাও একদম তৃণমূল পর্যায়ে জনসম্পৃক্ত রাজনীতি করার চর্চাটাও করতে পারে না!
(২৪) ভঙ্গুর অর্থনৈতিক ভিত্তিঃ বাংলাদেশের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সমস্যার মূলে রয়েছে আমাদের দুর্বল অর্থনৈতিক ভিত্তি। আমাদের পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক কাঠামোতে পুঁজিপতি শ্রেণী ঐতিহাসিকভাবেই লুটপাটকারী, কালোবাজারি, মজতুদার, ভূমিদস্যু, চোরাকারবারি, অর্থপাচারকারী ও ঋণখেলাপী। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে উৎপাদনমুখী অর্থনীতির বদলে রাজনৈতিক ছত্রছায়া যে লুটপাটের অর্থনীতি গড়ে উঠেছে, তা একদিকে আমাদের বুর্জোয়া শ্রেণীর চরিত্র নির্মাণ করেছে, অন্যদিকে কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত হওয়ায় আধুনিক ও উন্নত একটা শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার গরজ বুর্জোয়া শ্রেণী বোধ করেনি। জনমানুষের মধ্যে সামন্তীয় ধ্যান ধারণা দূর হয়ে আধুনিক গণতান্ত্রিক মূল্যবোধও গড়ে ওঠার সুযোগ পায়নি। এসবই আমাদের রাজনীতিকে কলুষিত করেছে। ক্ষমতার আশেপাশে থাকা বড় রাজনৈতিক দলগুলো হচ্ছে এই বুর্জোয়া শ্রেণীরই রাজনৈতিক দল। যেই বুর্জোয়া শ্রেণী অসাধু ও দুর্নীতিপরায়ন, তাদের রাজনৈতিক শক্তির চরিত্রও অনুরূপই হবে! লুটপাট, চোরাকারবারি, ভূমিদস্যুতা, ঋণের খেলাপ, অর্থ পাচার থেকে শুরু করে অবৈধ উপায়ে বুর্জোয়াদের সমস্ত আয়-উপার্জন নির্বিঘ্নে করার জন্যে শাসনতান্ত্রিক ক্ষমতা যে জরুরৎ, সেটিই ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনৈতিক দলগুলো নিশ্চিত করেছে। আর, এই দুর্নীতিপরায়ন রাজনৈতিক প্রভাবে আমাদের দেশের সবগুলো প্রতিষ্ঠানেই রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতি ছেয়ে গিয়েছে।
করণীয় ও অকরণীয়ঃ
(২৫) বৈষম্যহীন ও সকলের জন্যে অন্তর্ভূক্তিমূল একটি গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ বিনির্মাণের লক্ষে যে নতুন ধারার রাজনীতি গড়ে তোলা আবশ্যক, তার জন্যে আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে আমূল পাল্টে ফেলা দরকার। এই দরকারি কাজটি রাতারাতি কিছু আইনের মাধ্যমে করা সম্ভব নয়। আমাদের সংবিধান ও বিভিন্ন আইন অবশ্যই পাল্টাতে হবে, তবে সেগুলো রাজনৈতিক দলগুলোকে ধরে বেঁধে গণতান্ত্রিক করার লক্ষে নয়, বরং দেশে জনমানুষের মৌলিক অধিকারগুলো নিশ্চিত করতে, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে, রাষ্ট্রীয় সমস্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বাধীন ও সরকারের তথা ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের প্রভাবমুক্ত গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে এবং ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে জনমানুষের হাতে ক্ষমতা ফিরিয়ে দিতে। এই কাজগুলোর মধ্য দিয়েই মানুষের মাঝে যে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ গড়ে উঠবে, সেটাই দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে বদলাতে ভূমিকা রাখবে।
(২৬) আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা হচ্ছে, সেই আইন দেশের নাগরিককে জাতি, লিঙ্গ, ধর্ম, জন্ম, বংশ, শ্রেণী নির্বিশেষে সুরক্ষা দিচ্ছে, নাকি তার অধিকার কেড়ে নিচ্ছে। গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা হচ্ছে, সেই আইন নাগরিকের হাতে ক্ষমতা দিচ্ছে, নাকি রাষ্ট্রকে নাগরিকের ওপরে ক্ষমতা দিচ্ছে। কখনো কখনো কোন কোন আইনকে বিশেষ সংকট মোকাবেলায় খুব কার্যকর মনে হতে পারে, জনগণও সেরকম আইন প্রণয়নের জন্যে সমস্বরে দাবি তুলতে পারে, কিন্তু যে আইন রাষ্ট্রকে জনগণের ওপরে বাড়তি ক্ষমতা চর্চার সুযোগ দেয়, মানুষের অধিকার তথা ক্ষমতা কেড়ে নেয়, সেই আইন শেষ পর্যন্ত জনগণের বিরুদ্ধেই ব্যবহৃত হয়। দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী, নৃশংস অপরাধী বা খুনীকে র্যাব বা সেনাবাহিনীর অপারেশনে বিনাবিচারে হত্যার লাইসেন্স দেয়ার পক্ষে জনগণের যে সম্মতি ছিল, সেটাই পরবর্তীতে ফ্যাসিবাদী হত্যা, গুম, খুনকে উৎসাহিত করেছে, আয়নাঘরের সৃষ্টি করেছে।
(২৭) শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দলীয় রাজনীতি বা কোন ধরণের রাজনীতি না করার স্বাধীনতা যেমন গণতান্ত্রিক অধিকার, তেমনি যেকোন ধরণের দলের ও সংগঠনের রাজনীতি করাও একটা মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার, যতক্ষণ এই রাজনীতি অন্য কারোর মৌলিক অধিকার কেড়ে না নিচ্ছে। অর্থাৎ, কাউকে কোন রাজনীতি করতে বাধ্য করা যেমন অগণতান্ত্রিক, একইভাবে কাউকে তার নিজের ইচ্ছেমত রাজনীতি করতে দিতে না চাওয়া, তথা রাজনীতি নিষিদ্ধ করতে চাওয়াও অগণতান্ত্রিক আচরণ।
(২৮) রাজনৈতিক দলগুলোতে গণতন্ত্রের চর্চা নেই, পরিবার প্রথা চলমান, জনসম্পৃকতা নেই, ইত্যাদি যেসব সমস্যা আছে, তার পরিবর্তন জনগণের আদর্শ ও মূল্যবোধের পরিবর্তনের মাধ্যমেই আসা সম্ভব। অর্থাৎ একটা অগণতান্ত্রিক – একনায়কতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলে যারা সদস্য হবেন, তাদের মাধ্যমেই পরিবর্তনের চেস্টাটা আসতে হবে, সেই চেস্টায় দলের পরিবর্তন না হলে, দল ছাড়বেন, নতুন দল গড়বেন, জনগণ সেই দলকে ভোট দিবে না; এসব পথ বাদ দিয়ে রাষ্ট্রকে দলের নিবন্ধন আইনের নামে খবরদারি করতে দেয়ার অর্থ হচ্ছে, জনগণের হাত থেকে রাষ্ট্রকেই ক্ষমতাশালী করা।
(২৯) রাষ্ট্র যাবতীয় আইন-কানুন তৈরি করবে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে গণতান্ত্রিক করার লক্ষে, অ-রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে তথা ব্যক্তিক বা সামষ্ঠিক উদ্যোগে গড়ে ওঠা সংগঠনকে (যেমনঃ রাজনৈতিক দল, ধর্মীয় সংগঠন) গণতান্ত্রিক বানানো রাষ্ট্রের এখতিয়ারের মাঝে পড়ে না (অপরের অধিকার কেড়ে নিলে বা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত হলে, রাষ্ট্র অবশ্যই এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিবে)। রাজনৈতিক দলগুলো নিজের অভ্যন্তরে যে চর্চাই রাখুক, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে ও রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডে যখন গণতান্ত্রিক আচরণে বাধ্য হবে, সেটিও রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরে গণতন্ত্রের চর্চায় উদ্বুদ্ধ করবে। সেই সাথে রাষ্ট্রের ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের গণতান্ত্রিক চর্চাও জনগণের মাঝেও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ তৈরিতে ভূমিকা রাখে, যা প্রকারান্তরে রাজনৈতিক দলগুলোর অগণতান্ত্রিক চর্চাকে দূর করবে।
(৩০) শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও পেশাজীবিদের রাজনীতি বা “দলীয়” রাজনীতিতে বাঁধা প্রয়োগ বা নিষিদ্ধকরণ নয়, বরং দলীয়-নির্দলীয় সমস্তরকম রাজনীতির সুযোগ রেখে, রাজনীতির মাধ্যমে অবৈধ ও বৈধভাবে ক্ষমতায় আরোহন করার পথ বন্ধ করা জরুরী। অর্থাৎ ছাত্ররাজনীতির মাধ্যমে যেমন হলে বা ক্যাম্পাসে কোন নেতার অবৈধ রাজত্ব কায়েমের পথ বন্ধ করতে হবে, তেমনি শিক্ষক বা পেশাজীবি রাজনীতির মাধ্যমে প্রশাসনিক পদে যাওয়ার পথ বন্ধ করতে হবে (তা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডীন, একাডেমিক কাউন্সিল, সিণ্ডিকেট, সিনেট হোক, কিংবা পেশাজীবিদের প্রশাসনিক পদ হোক)। ছাত্র রাজনীতি, শিক্ষক রাজনীতি, কারখানায় শ্রমিক রাজনীতি বা পেশাজীবি রাজনীতির মধ্য দিয়ে ছাত্রদের, শিক্ষকদের, শ্রমিকদের, পেশাজীবিদের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা যাতে প্রশাসনের সাথে নিজ নিজ চাওয়া পাওয়া বা দাবি দাওয়া উত্থাপন করতে পারে, ক্ষমতাধারণকারী প্রশাসনের জবাবদিহিতা যাতে নিশ্চিত করতে পারে এবং প্রশাসন যাতে এই নির্বাচিত প্রতিনিধিদের প্রভাবিত-প্রলুব্ধ-আজ্ঞাবহ করতে না পারে, তা নিশ্চত করতে নিয়মিত নির্বাচনের মাধ্যমে প্রতিনিধি বাছাইয়ের ব্যবস্থা করতে হবে।
উপসংহারঃ
(৩১) নতুন দিনের রাজনীতি বা নতুন ধারার রাজনৈতিক দল গড়ে তোলা সম্ভবপর করার জন্যে বিরাজনীতিকরণ নয়, বরং ব্যাপক অংশের মানুষের রাজনীতি সচেতনতা দরকার, দরকার গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ! গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আমাদের দেশের ছাত্রজনতার মাঝে যে গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ার আকাঙ্ক্ষা তথা রাজনৈতিক বোধ তৈরি হয়েছে, সেটিকে কাজে লাগিয়ে রাষ্ট্রের সংবিধানিক ও আইনগত পরিবর্তন এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দাঁড় করানোর মধ্যমে দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয় ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবেই ক্ষমতার বিকেন্দ্রিকরণ নিশ্চিত করা যায়, আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোরও ইতিবাচক পরিবর্তন আসা সম্ভব! দেশের সকল রাজনৈতিক দল, জোট, সংগঠন বা প্লাটফর্মগুলোর কর্তব্য রাষ্ট্রের এহেন পরিবর্তনের পক্ষে কাজ করা এবং নিজেদেরও ঐতিহাসিক ভুলভ্রান্তি অনুধাবন করে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন সাধন করা।
মূল প্রবন্ধ লিখেছেনঃ অনুপম সৈকত শান্ত ও নাদির আহমেদ
সংক্ষিপ্ত ভার্সন পাঠঃ নাদির আহমদে
আলোচকঃ
সামিনা লুৎফা, সহযোগী অধ্যাপক, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। সদস্য, গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটি
সায়ক চাকমা, আইনজীবী ও অ্যাক্টিভিস্ট। সদস্য, জাতীয় নাগরিক কমিটি
সৈয়দ ফায়েজ আহমদে, অনুবাদক ও সাংবাদিক। সংগঠক, আমাদের পার্টিআরিফ রহমান, লেখক ও অ্যাক্টিভিস্ট। সংগঠক, জনভাষ্য
সঞ্চালকঃ
আখতার সোবহান মাসরুর, সদস্য, গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ নেটওয়ার্ক