গণতন্ত্র-ওয়েবসভা ৩: বাংলাদেশ ও সংবিধান
বাংলাদেশ ও সংবিধান
অনুপম সৈকত শান্ত, রাহাত মুস্তাফিজ, তন্ময় কর্মকার ও মতিউর রহমান
ভূমিকা
ছাত্র-জনতার এক অবিস্মরণীয় গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ১৫ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান ঘটেছে, বাংলাদেশের জনগণ হাজির হয়েছে এক যুগসন্ধিক্ষণে। একদিকে রয়েছে ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থার নিষ্পেষণে ভঙ্গুর ও প্রায় অচল রাষ্ট্রব্যবস্থা, যেখানে একচেটিয়া দলীয়করণ, লাগামহীন দুর্নীতি ও গণতন্ত্রহীনতায় নিমজ্জিত রাষ্ট্রীয় সকল প্রতিষ্ঠান হয়েছে অকার্যকর ও গণবিরোধী। ফ্যাসিবাদী সরকারের পতন ঘটলেও ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থা বা কাঠামো বহাল রয়েছে পুরোমাত্রায়। অন্যদিকে সুযোগ এসেছে বাংলাদেশকে নতুন ভাবে গড়ে তোলার। বৈষম্যহীন, অসাম্প্রদায়িক ও সকলের জন্যে অন্তর্ভূক্তিমূলক একটি গণতান্ত্রিক ও মানবিক বাংলাদেশ নির্মাণের আকাঙ্ক্ষার গণজাগরণ ঘটেছে ছাত্রজনতার এই গণঅভ্যুত্থানে। অভ্যুত্থানকারী ছাত্রজনতা এমন এক বাংলাদেশ গড়তে চায়, যাতে আর কখনো ফ্যাসিবাদ ফিরে না আসে। এই লক্ষে কথা উঠেছে সংবিধান পরিবর্তনের। কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশ গড়ে তুলার কাজটি শুরু করতে হবে কি সংবিধানের পরিবর্তন থেকেই?
বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটির জন্মের পর থেকে গত ৫২ বছরে বারেবারে স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থা ফিরে এসেছে। কখনো আমাদের সংবিধানকে কাটাছেঁড়া করে - দুমড়ে মুচড়ে নির্বাচিত শাসক স্বৈরাচারে রূপান্তরিত হয়েছে, কখনো সংবিধানকে স্থগিত করে অসাংবিধানিক উপায়ে সামরিক সরকার ক্ষমতা দখল করে, সেই অবৈধ ক্ষমতাকে বৈধ করতে সংবিধানে কাটাছেঁড়া করেছে। কখনো নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার বলে সংবিধানকে বদলে ফেলে গণতন্ত্রের কবর রচনা করে একদলীয় বাকশাল কায়েম করা হয়েছে, আবার কখনো হাইকোর্ট দেখিয়ে, সংবিধান থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা তুলে দিয়ে একতরফা প্রহসনের নির্বাচন ব্যবস্থার একদলীয় শাসন ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। যে সামরিক-বেসামরিক দলই ক্ষমতায় গিয়েছে, ক্ষমতায় যাওয়ার পরে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে নিজেদের মত ব্যবহার করে ক্ষমতাকে কুক্ষীগত করেছে। নির্বাচিত সরকারও ক্ষমতাকে আঁকড়ে ধরতে বা পুনরায় নির্বাচিত নির্বাচন ব্যবস্থাকে ধ্বংস করেছে, ফলে দলীয় সরকারের অধীনে ক্ষমতার বাইরের কোন রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচন করতে আগ্রহী না হওয়াতে ‘নির্দলীয়’ ‘নিরপেক্ষ’ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মত এক ব্যবস্থাও চালু হয়েছে। একসময় এই তত্ত্বাবধায়ক সরকারেও দলীয় অনুগত ব্যক্তিকে বসানোর মাধ্যমে নির্বাচনে সুবিধালাভের প্রচেষ্টা চলেছে, তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মাঝে রাজনৈতিক সমঝোতার অভাবে দেশে চরম বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সুযোগে সেনাবাহিনী হস্তক্ষেপ করার সুযোগ পেয়েছে। ফলে, বিগত ৫২ বছরে কেবলমাত্র একবারই স্বাভাবিকভাবে নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তর সম্ভব হয়েছে। স্বাধীনতার পরে প্রথম দুবারই ক্ষমতা হস্তান্তর হয়েছে রাষ্ট্রপ্রধানের রক্তাক্ত পরিণতির মধ্য দিয়ে, দুবার গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে জনগণের রক্তের বিনিময়ে।
আমাদের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো যে গণতান্ত্রিক ও জনবান্ধব করা যায়নি, রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবনে ন্যুনতম গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি যে গড়ে ওঠেনি, তথা স্বাধীনতার ৫৩ বছরেও যে আমাদের দেশটিকে গণতান্ত্রিক ও মানবিক রাষ্ট্র হিসেবে সোজা হয়ে দাঁড় করানো সম্ভব হয়নি, তার মূলে কি রয়েছে সেই ৭২ সালে লিখিত ও ১৭ বার সংশোধিত গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান? সংবিধান বদল হলেই কি সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে? আর এই সংবিধানের পরিবর্তনই বা হবে কী উপায়ে? একটি গণতান্ত্রিক সংবিধান প্রবর্তনে কোথায় কোথায় পরিবর্তন দরকার? সেসবের সমস্ত বিষয়েই আছে কি জনগণের ঐকমত্য?
১৯৭২ সালের সংবিধান ও সংশোধনীসমূহ
১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিলে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক প্রণীত বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে বলা হয়, "সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী বাংলাদেশের জনগণ নির্বাচিত প্রতিনিধিদের প্রতি যে ম্যান্ডেট দিয়েছেন সে ম্যান্ডেট মোতাবেক আমরা, নির্বাচিত প্রতিনিধিরা, আমাদের সমবায়ে গণপরিষদ গঠন করে পারষ্পরিক আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে বাংলাদেশের জনগণের জন্য সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করার উদ্দেশ্যে বাংলাদেশকে একটি সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্র ঘোষণা করছি ..."। সেই ঘোষণাপত্রে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণার যে নয়টি প্রক্ষাপট তুলে ধরা হয়, তার প্রথম চারটি হচ্ছে,
যেহেতু ১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর থেকে ১৯৭১ সালের ১৭ জানুয়ারি পর্যন্ত বাংলাদেশে অবাধ নির্বাচনের মাধ্যমে শাসনতন্ত্র রচনার উদ্দেশ্যে প্রতিনিধি নির্বাচিত করা হয়েছিল; এবং যেহেতু এই নির্বাচনে বাংলাদেশের জনগণ ১৬৯টি আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগ দলীয় ১৬৭ জন প্রতিনিধি নির্বাচিত করেছিল”;
“যেহেতু জেনারেল ইয়াহিয়া খান ১৯৭১ সনের ৩রা মার্চ তারিখে শাসনতন্ত্র রচনার উদ্দেশ্যে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের অধিবেশন আহ্বান করেন”;
“যেহেতু তিনি আহূত এই অধিবেশন স্বেচ্ছাচার এবং বেআইনিভাবে অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করেন”;
“যেহেতু পাকিস্তান কর্তৃপক্ষ তাদের প্রতিশ্রুতি পালন করার পরিবর্তে বাংলাদেশের জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে পারষ্পরিক আলোচনাকালে ন্যায়নীতি বহির্ভূত এবং বিশ্বাসঘাতকতামূলক যুদ্ধ ঘোষণা করেন”;
১৯৭২-এর জানুয়ারির ১১ তারিখ গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের রাষ্ট্রপ্রধান শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক স্বাক্ষরিত “বাংলাদেশের অস্থায়ী সংবিধান আদেশ, ১৯৭২” জারি করা হয়। এই আদেশ বলে শেখ মুজিবুর রহমান প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। পরে রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবু সাইদ চৌধুরী ১৯৭২ সালের ২৩শে মার্চ গণপরিষদ আদেশ জারি করেন। এই আদেশ বলে, ৭ ও ১৭ ডিসেম্বর, ১৯৭০ সালের নির্বাচনের জাতীয় এবং প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচিত ৪৬৯-এর (জাতীয় পরিষদে ১৬৯ জন আর প্রাদেশিক পরিষদে ৩০০ জন) মধ্যে ৪০৩ জন সদস্য নিয়ে গণপরিষদ গঠিত হয়। ৪০৩ জনের মধ্যে ৪০০ জন সদস্য ছিলেন আওয়ামী লীগের, ১ জন ন্যাপের আর ২ জন ছিলেন নির্দলীয়। ১৯৭২ সালের ১১ এপ্রিল গণপরিষদের প্রথম অধিবেশনের দ্বিতীয় দিনে আইন ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে ৩৪ সদস্য বিশিষ্ট “খসড়া সংবিধান-প্রণয়ন কমিটি” গঠিত হয়। ন্যাপের সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত ছাড়া এই কমিটির সবাই ছিলেন আওয়ামী লীগের সদস্য। এদের মধ্যে ২৪ জনই ছিলেন আইনজীবী, ৪ জন অধ্যাপক, একজন চিকিৎসক, একজন সাংবাদিক এবং একজন কৃষকনেতা। কোনরকম আদিবাসী প্রতিনিধিহীন এ কমিটিতে একমাত্র নারী সদস্য ছিলেন রাজিয়া বানু এবং হিন্দু প্রতিনিধি ছিলেন দুজন। সর্বদলীয় ও বিভিন্ন জাতি, লিঙ্গ ও শ্রেণী-পেশার মানুষের অন্তর্ভূক্তিমূলক সংবিধান কমিটি না করায় (গণপরিষদের চরিত্রও অন্তর্ভূক্তিমূলক ছিল না), মুক্তিযুদ্ধকালে দেশে যে একটি গুনগত পরিবর্তন সাধিত হয়েছিল এবং গোটা জাতির রাজনৈতিক চেতনার যে বিকাশ হয়েছিল- সংবিধানে তাকে ধারণ করার একটি সুবর্ণ সুযোগ পাশ কাটানো হয়।
দ্বিতীয়ত, ৭০ সালে ইয়াহিয়া খানের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে পাকিস্তানের শাসনতন্ত্র রচনার লক্ষে বিজয়ী হওয়া পরিষদসদস্যদের স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়নের এখতিয়ার বা নৈতিক বৈধতা নিয়েই সে সময়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল থেকে প্রশ্ন উঠেছিল। পূর্ব পাকিস্তানের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনসহ আওয়ামী লীগের ৬ দফার প্রতি দল মত নির্বিশেষে এদেশের মানুষের যে অভূতপূর্ব ঐক্য সাধিত হয়েছিল, তারই প্রতিফলন ঘটেছিল, সেই নির্বাচনে। স্বাধীন বাংলাদেশে নতুন সংবিধান প্রণয়নের দায়িত্ব সেই গণ পরিষদের হাতে ন্যস্ত করার মাধ্যমে এক দল কেন্দ্রিক ক্ষমতাকাঠামোর মধ্যে ঢুকে পড়ে আওয়ামী লীগ। তদুপরি, পরিষদ-সদস্যদের শতকরা অধিকাংশের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা সংগ্রামের সাথে যুক্ত না থেকে যুদ্ধকালীন সময়টিতে ভারতে আরাম আয়েশে গা ভাসানোর এবং নানা রকমের অগ্রহণযোগ্য কাজে লিপ্ত থাকার প্রামাণিক অভিযোগ আছে। ৫০ জনের অধিক গণপরিষদের সদস্যদের (যারা দুর্নীতির দায়ে বহিস্কৃতি, অনুপস্থিত এবং পদত্যাগী) অবর্তমানে, অর্থাৎ দেশের এক কোটির বেশি লোকের প্রতিনিধিত্ব ছাড়াই গণপরিষদ গঠনের বিষয়ে আপত্তি ওঠে। স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়নকে সামনে রেখে নতুন করে নির্বাচনের মাধ্যমে গণপরিষদ গঠন করতে পারলে, ৭২ এর সংবিধান প্রণেতাদের নৈতিক বৈধতার প্রশ্নগুলো থাকতো না।
তৃতীয়ত, সংবিধান প্রণয়নের প্রক্রিয়াটিও ছিল ভীষণভাবে অগণতান্ত্রিক। গণপরিষদকে কোন রকম আইন প্রণয়নী ক্ষমতা দেয়া হয়নি, সে সময়ে যাবতীয় আইন প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশের মাধ্যমে, অর্থাৎ একক ক্ষমতাবলে প্রণয়ন করা হয়। এরকম এক আইন হচ্ছে গণপরিষদ সদস্য (সদস্যপদ বাতিল) আদেশ, যেখানে বলা হয় কোন রাজনৈতিক দলের প্রার্থী হয়ে গণপরিষদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার পরে সেই দল হতে পদত্যাগ করলে বা বহিস্কৃত করলে, গণপরিষদ থেকেও তার সদস্যপদ খারিজ হয়ে যাবে। এই আইনের মাধ্যমে গণপরিষদ সদস্যদের দলীয় দাসে পরিণত করা হয়। জনগণের মতামত গ্রহণ, গণবিতর্ক আয়োজন, জনমত যাচাই -প্রভৃতির তেমন কোন উদ্যোগ নেয়া হয়নি, কেবল লোক দেখানো এক বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়, স্বভাবতই খুব বেশি সাড়া আসেনি, একশ’রও কম স্মারকলিপি জমা পড়ে। গণপরিষদের দ্বিতীয় অধিবেশনে খসড়া সংবিধান প্রস্তাব আকারে উত্থাপন করার পরে মাত্র ২৪ কার্যদিবসের মধ্যে চূড়ান্ত সংবিধান গৃহীত হয়। মোট ১৬৩ টি সংশোধনী প্রস্তাব উত্থাপিত হয়, যার মধ্যে ৭০ টি প্রস্তাব উত্থাপন করেন সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত ও ২৫ টি প্রস্তাব উত্থাপন করেন এম এন লারমা। ৮৪ টা সংশোধনী প্রস্তাব গৃহীত হয়, যার মধ্যে ১ টি বাদে বাঁকিগুলো আওয়ামী লীগ দলীয় সদস্যদের উত্থাপিত। এসবে অধিকাংশই ভাষাগত পরিমার্জনাজনিত প্রস্তাবনা। এভাবেই একতরফা, একদলীয় গণপরিষদে জাতিবিদ্বেষী, অগণতান্ত্রিক, স্বৈরতান্ত্রিক ৭২ এর সেই সংবিধানটি গৃহীত হয়, তারপরে গণপরিষদ সদস্যরা একযোগে পদত্যাগ করেন।
গৃহীত হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত বাংলাদেশের সংবিধান মোট ১৭ বার সংশোধন করা হয়েছে। সংবিধান কার্যকর করার সাত মাসের মধ্যেই প্রথম সংশোধনী আনা হয় ১৯৭৩ সালের ১৫ই জুলাই। তার দুই মাস পরে ১৯৭৩ সালের ২০ই সেপ্টেম্বর সংবিধানের দ্বিতীয় সংশোধনী বিল পাস হয়। মৌলিক অধিকার স্থগিত করার বিধান সহ ‘জরুরি অবস্থা’ ঘোষণার অনুচ্ছেদ যুক্ত করা হয় যে ২য় সংশোধনীর মাধ্যমে, সেটি ২৬৭-০ ভোটে গৃহীত হয়। ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি গৃহীত চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে বাংলাদেশের সংসদীয় শাসন পদ্ধতির পরিবর্তে রাষ্ট্রপতি শাসিত শাসন পদ্ধতি চালু এবং বহুদলীয় রাজনীতির পরিবর্তে একদলীয় রাজনীতির বাকশাল চালু করা হয়। মুক্তিযুদ্ধের মূলনীতি, সংবিধানের মূলনীতি আর রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি হিসেবে “গণতন্ত্র” থাকার পরেও গণতন্ত্রের কবর রচনা করা বিলটি ২৯৪-০ ভোটে গৃহীত হয়ে যায়।
পঞ্চম ও সপ্তম- উভয় সংশোধনী করা হয় সামরিক শাসনের যাবতীয় কর্মকাণ্ডকে বৈধতা দানের উদ্দেশ্যে। পঞ্চম সংশোধনীতে সংবিধানে “বিসমিল্লাহির-রাহমানির রাহিম” সংযোজন করা হয়। জাতীয় সংসদে এ সংশোধনী ২৪১-০ ভোটে গৃহীত হয় ১৯৭৯ সালের ৬ এপ্রিল। আর সপ্তম সংশোধনী বিলটি ২২৩-০ ভোটে গৃহীত হয়। অষ্টম সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে ইসলামকে স্বীকৃতি প্রদান করা হয় ও ঢাকার বাইরে ৬টি জেলায় হাইকোর্টের স্থায়ী বেঞ্চ স্থাপন করার বিধান চালু করা হয়। বিলটি ২৫৪-০ ভোটে গৃহীত হয়। ১৯৯৬ সালের ২৭ মার্চ ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য নিরপেক্ষ-নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয়। এটি ২৬৮-০ ভোটে গৃহীত হয়।
পঞ্চদশ সংশোধনী পাস হয় ২০১১ সালের ৩০শে জুনে। এই সংশোধনী দ্বারা সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা ও ধর্মীয় স্বাধীনতা অনুচ্ছেদ পুনর্বহাল করা হয় এবং মূলনীতি হিসেবে জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি সংযোজন করা হয়। এই সংশোধনীর মাধ্যমে শেখ মুজিবুর রহমানকে জাতির জনক হিসেবে স্বীকৃতিও দেওয়া হয়। এই সংশোধনীর দ্বারা তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করা হয়। সংবিধানে ৭ অনুচ্ছেদের পরে ৭ (ক) ও ৭ (খ) অনুচ্ছেদ সংযোজন করে সংবিধান বহির্ভূত পন্থায় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখলের পথ রুদ্ধ করা হয়। বিরোধী দলের বর্জনের মধ্যেও ২৯১-১ ভোটে সংশোধনীটি গৃহীত হয়ে যায়। ৭২ এর সংবিধানের ৯৬ অনুচ্ছেদ পুনঃস্থাপনের মাধ্যমে বিচারপতিদের অপসারণের ক্ষমতা সংসদকে ফিরিয়ে দেওয়ার বিধান পাস করা হয় ষোড়শ সংশোধনীর মাধ্যমে ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৪ সালে। ৩৫০ জন সংসদ সদস্যের মধ্যে ৩২৭-০ জনের ভোটে সর্বসম্মতভাবে পাস হয় বিলটি।
দেখাই যাচ্ছে, সবকটি সংশোধনীই সংসদ সদস্যদের নিরঙ্কুশ ভোটে গৃহীত হয়েছে। সংবিধানের মূলনীতি বিরোধী, সংবিধানের মৌলিক কাঠামো বিরোধী, গণ বিরোধী, মানুষের মৌলিক অধিকার খর্ব করা- নানা রকম সংশোধনী কেবল সংসদের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠার মাধ্যমে গৃহীত হয়েছে, কেননা সেই ব্যবস্থা এই সংবিধানের মাঝে রয়েছে। আবার, উচ্চ আদালতের রায়েও সংবিধানের পঞ্চম, সপ্তম, অষ্টম, ত্রয়োদশ ও ষোড়শ সংশোধনী বাতিলও হয়েছে, যদিও কেবল ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায়টি বাদে অন্যান্য সংশোধনী বাতিলের রায় এসেছে অনেক বছর পরে, সরকার ব্যবস্থা পরিবর্তনের পরে।
বাতিল, সংশোধন, নাকি পুনর্লিখন?
বিগত ফ্যাসিবাদী সরকার তার অগণতান্ত্রিক ও স্বৈরাচারী শাসন ব্যবস্থা কায়েম করতে ও চালু রাখতে, এত বেশি সংবিধান (ও আদালত)-কে হাতিয়ার করেছে ও সংবিধানের মাধ্যমে বৈধতা আদায়ের চেষ্টা করেছে যে, এই সংবিধানকে নিয়েই জনমনে তীব্র ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে। যে সংবিধান স্বৈরাচার তৈরি করে, ফ্যাসিবাদকে বৈধতা দেয় ও মানুষের গণতান্ত্রিক-রাজনৈতিক অধিকার রক্ষার নিশ্চয়তা দিতে পারে না, সেই সংবিধানকে নিয়ে গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশ চলতে পারে না। ফলে, আজ গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষার একটা গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের বিভিন্ন ক্ষেত্রে যেসব সংস্কারের আলোচনা চলছে, তার কেন্দ্র রয়েছে এই সংবিধান। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, সংবিধানের প্রয়োজনীয় পরিবর্তন হবে কোন পথে? পুরাতন এই ‘ফ্যাসিবাদী’ সংবিধানকে বাতিল করে কি সম্পূর্ণ নতুন একটি সংবিধান লেখা হবে? নাকি, সংবিধানের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে অষ্টাদশ বা দরকারে আরো এক বা একাধিক সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের প্রয়োজনীয় ও আকাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন সাধন করা হবে? নাকি, পুরাতন সংবিধানের সমস্যা-সংকটের জায়গাগুলো খুঁজে বের করে সংবিধান পুনর্লিখন করে, বাংলাদেশের ২য় সংবিধান হিসেবে তার নতুন পথ চলা শুরু হবে? এই বাতিল, সংশোধন আর পুনর্লিখন বিতর্কের মাঝে, কোনটি বর্তমান সংবিধানের সমস্যা-সংকট থেকে উত্তরণে গ্রহণযোগ্য সমাধান হিসেবে সবচেয়ে ভূমিকা রাখবে, নতুন করে ও আরো গভীরতর সংকট তৈরি ছাড়াই?
সংবিধান বাতিলঃ এটা ঠিক যে, গণঅভ্যুত্থানে একটা ফ্যাসিবাদী সরকারকে উৎখাতের সাথে সাথে ফ্যাসিবাদের সবচেয়ে বড় সহায়ক অবলম্বন ছিল যে বাংলাদেশ সংবিধান, সেটাকেও ছুঁড়ে ফেলা খুব কাম্য হতে পারে। সে জায়গা থেকে বর্তমান সংবিধানকে সম্পূর্ণ বাতিল করে একটি নতুন সংবিধান লিখনের দাবিকে খুব যৌক্তিক মনে হতে পারে। কিন্তু, প্রায়োগিক দিক থেকে এটি কেবল দুরূহই (প্রায় অবাস্তব) নয়, এই প্রচেস্টা দেশকে একটি সংঘাতময় পরিস্থিতির দিকেও নিয়ে যেতে পারে। প্রথমত, জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থান কোন বিপ্লব ছিল না, কোন একটি বিপ্লবী রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বে কোন বিপ্লবী সরকারও গঠিত হয়নি। বস্তুত যে সরকার গঠিত হয়েছে, সেখানে বিভিন্ন জায়গার, বিভিন্ন মত পথের কিছু মানুষের সম্মিলন ঘটেছে, যাদের সারাদেশে কোন শক্ত রাজনৈতিক ভিত্তি নেই। সে কারণেই দেখা যাচ্ছে, গণঅভ্যুত্থানের পরে এই অন্তর্বর্তীকালীন সরকার শপথ গ্রহণ করেছে, ফ্যাসিবাদী সরকারের আমলে নিয়োগ পাওয়া রাষ্ট্রপতির নিকট, সাংবিধানিক শূন্যতা এড়াতে রাষ্ট্রপতিকে অপসারণের জনপ্রিয় দাবিতে পর্যন্ত সাড়া দিতে পারেনি। বলাই বাহুল্য, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রতিটি সদস্য শপথ গ্রহণের সময়ে বাংলাদেশ সংবিধানের রক্ষণ, সমর্থন ও নিরাপত্তা বিধান করার ওয়াদা করেছেন।
গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের গুরু দায়িত্ব নিয়ে তারা সরকার গঠন করায় একভাবে ব্যাপক জনসমর্থন তাদের রয়েছে, বিশেষ করে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সক্রিয় সমর্থনও তাদের মূল সহায়ক শক্তি, কিন্তু গণঅভ্যুত্থানে ছাত্রজনতার যে ঐক্য ঘটেছে, তা প্রধানত ফ্যাসিবাদী নিপীড়নমূলক সরকারের নির্বিচার গুলির বিরুদ্ধে, ফ্যাসিবাদী রাজনৈতিক শক্তির বিরুদ্ধে, এবং কিছুটা ফ্যসিবাদী শাসন কাঠামোর বিরুদ্ধে ও একটা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রীয় কাঠামো গড়ে তোলার পক্ষে। বর্তমান সংবিধানকে বাতিল করে সম্পূর্ণ নতুন করে একটি সংবিধান প্রণয়ন করতে গেলে, এমন অসংখ্য বিষয় চলে আসতে পারে, যেখানে এখনো জনগণের মাঝে ন্যুনতম ঐক্য গড়ে ওঠেনি। ফলে, “জনগণের অভিপ্রায়” হিসেবে একটি নতুন সংবিধান লিখে ফেলার প্রস্তাবনা শুনতে যত মধুরই শোনাক, এই মুহুর্তে ফ্যাসিবাদের পতন ভিন্ন জনগণের আর কোন ঐক্যবদ্ধ ও সমসত্ত্ব অভিপ্রায় তৈরিও হয়নি। তাই, সংবিধান বাতিল করে নতুন সংবিধান প্রণয়নের উদ্যোগ দেশকে দীর্ঘস্থায়ী বিভক্তি ও সংঘাতের দিকে ঠেলে দেয়ার আশংকাও রয়েছে। সংবিধান বাতিল করে নতুন একটি সংবিধান প্রণয়ন ও বলবৎ করার মাঝখানের সময়টিতে যে সাংবিধানিক শূন্যতা তৈরি হবে, সে সময়ে নানারকম অপশক্তিরও মাথাচাড়া দেয়ার সুযোগ তৈরি হয়, রাষ্ট্রীয় বিশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে এই অরাজনৈতিক সরকার যতই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও বিশেষ করে সেনাবাহিনীর ওপরে নির্ভর করতে থাকবে, ততই জনগণের ওপরে সামরিক শাসন চেপে যাওয়ার আশংকাও বাড়তে থাকবে।
সংবিধান সংশোধনঃ বর্তমান সংবিধানের দেখানো পথেই আইনসভার দুই তৃতীয়াংশ সদস্যের ভোটে সংবিধানের সমস্ত গণবিরোধী বিধান পরিবর্তন - সংশোধন করা সম্ভব। ফলে, গণতান্ত্রিক সংবিধান প্রণয়নের লক্ষে একটি গণপরিষদ সভা বা সংবিধান সভা সংবিধানের প্রয়োজনীয় ও আকাঙ্ক্ষিত সংশোধনীগুলো আনতে পারে। অর্থাৎ, ৭২ সালে লিখিত ও ১৭ বার সংশোধিত সংবিধানেরই অষ্টাদশ বা আরো এক বা একাধিক সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের সংস্কার হতে পারে। এই প্রস্তাবনার সবচেয়ে বড় সুবিধা হচ্ছে, এখানে সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা পুরোমাত্রায় বজায় থাকায়, কোনরকম সাংবিধানিক শূন্যতা তৈরির আশংকা কম। তবে, এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সমস্যা বর্তমান সংবিধানের ৭খ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংবিধানের প্রস্তাবনা, ১ম ভাগ (প্রজাতন্ত্র), ২য় ভাগ (রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি) ও তৃতীয় ভাগ (মৌলিক অধিকার) এবং একাদশ ভাগের ১৫০ অনুচ্ছেদসহ সংবিধানের অন্যান্য মৌলিক বিধানাবলীর সংযোজন, পরিবর্তন, প্রতিস্থাপন, রহিতকরণ বা অন্য কোন উপায়ে সংশোধনের অযোগ্য। এই ৭খ অনুচ্ছেদও প্রথম ভাগে অবস্থিত, তার অর্থ এটিও রহিত বা সংশোধন করা যাচ্ছে না। ফলে সাধারণভাবে সংবিধান সংশোধনীর মাধ্যমে মৌলিক ভাগগুলোতে কোন রকম পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। বস্তুত এই অংশের অনুচ্ছেদগুলোর মাধ্যমে রাষ্ট্রীয়ভাবে ফ্যাসিবাদী ভাবমানস তৈরি করা হয়েছে, এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে জনগণের অধিকারের স্বীকৃতি দেয়া হয়নি বা সীমা আরোপ করে জনগণের মৌলিক অধিকার কেড়ে নেয়া হয়েছে। ফলে, এই ভাগগুলোতে পরিবর্তন, সংযোজন, রহিতকরণ চাইলে, এই সংবিধানকে বহাল রেখে তা সম্ভব নয়। এই অলঙ্ঘ্যনীয় অনুচ্ছেদের কারণেও আগের সংবিধানকে রদ বা বাতিল করে নতুন সংবিধান প্রণয়নের বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। তবে, এক্ষেত্রে আদালতের রায়ে পঞ্চদশ সংশোধনীকে অসাংবিধানিক হিসেবে ঘোষণা এলে, ৭(খ) অনুচ্ছেদ বিলুপ্ত করার সংশোধনী আনার পরে, অন্যান্য প্রয়োজনীয় সংশোধন করা সম্ভব হতে পারে। এছাড়া, সংবিধান সংশোধনীর এই প্রস্তাবনার আরেক বড় সমস্যা হচ্ছে, ফ্যাসিবাদের মূলে রয়েছে যে ১৯৭২ সালের সংবিধান, সেই সংবিধানকে নিয়ে জনমনে থাকা তীব্র ক্ষোভকে এখানে একভাবে অগ্রাহ্য করা হচ্ছে। ফলে, ৭২ এর সংবিধানের ধারাবাহিকতা রক্ষার বিপরীতে এই সংবিধানের বদলে নতুন বা দ্বিতীয় সংবিধানে যাওয়ার জনআকাঙ্ক্ষা এতে পূরণ হচ্ছে না।
সংবিধান পুনর্লিখনঃ বর্তমান সংবিধানের পর্যালোচনা করে যেসব জায়গায় সমস্যা আছে সেগুলোকে পুনর্লিখন করে নতুন একটি সংবিধান গ্রহণ করা যেতে পারে। এক্ষেত্রে, পুরা সংবিধান বাতিল করে সম্পূর্ণ নতুন সংবিধান লিখন নয়, বরং কেবল সমস্যা-সংকটের জায়গাতেই পরিবর্তন করা হবে, কিন্তু সেই পরিবর্তনগুলোকে অষ্টাদশ সংশোধনী হিসেবে নয়, বরং নতুন ও দ্বিতীয় সংবিধান হিসেবে এর যাত্রা শুরু হবে। এর ফলে, সংবিধানের যে অংশগুলোকে বদল করতে জনগণের মাঝে ঐক্যমত্য আছে, বিশেষ করে একটা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় ও জনগণের মৌলিক অধিকারগুলো নিশ্চিত করতে যেসব সংস্কার প্রয়োজন, সেসব অংশ পরিবর্তন করেও নতুন বাংলাদেশ এই নতুন সংবিধান নিয়ে নতুন যাত্রা শুরু করতে পারে। এক্ষেত্রে, বর্তমান সংবিধানের অলঙ্ঘ্যনীয় ভাগগুলোতে সংশোধন করার ক্ষেত্রে আদালতের রায়ের ওপরে নির্ভর করার দরকার হবে না, তেমনি বাহাত্তরের ফ্যাসিবাদী সংবিধানের সাথেও বিচ্ছেদ ঘটানোও সম্ভব হবে। পুনর্লিখিত নতুন সংবিধানটি গৃহীত হওয়ার মধ্য দিয়েই আগের সংবিধান রহিত হবে বিধায়, মাঝখানের সাংবিধানিক শূন্যতার আশংকাও এক্ষেত্রে কম, অর্থাৎ দ্বিতীয় সংবিধানটি গৃহীত ও বলবৎ হওয়ার আগ পর্যন্ত প্রথম সংবিধান চালু থাকবে। সংবিধান পুনর্লিখনের বিষয়ে সবচেয়ে বড় আশংকার কথা যেটি বলা হচ্ছে, তা হলো - জনগণের ঐক্যমত্যের ভিত্তিতে না হয়ে কোন পরিবর্তন চাপিয়ে দেয়া হলে, তা দেশকে দীর্ঘস্থায়ী বিভক্তি ও সংঘাত পরিস্থিতির দিকে নিয়ে যেতে পারে। এই আশংকা বস্তুত অন্য দুই প্রস্তাবনা - অর্থাৎ বাতিল করে সম্পূর্ণ নতুন সংবিধান লিখন, কিংবা সংবিধান সংশোধন, উভয়টির জন্যেই প্রযোজ্য। ফলে, এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে, সংবিধানের এই পরিবর্তন হবে কোন পদ্ধতিতে।
সংবিধান সংস্কার কীভাবে?
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বিভিন্ন যেসব সংস্কার কমিশন গঠন করেছে, তার মধ্যে সংবিধান কমিশন এরই মধ্যে কাজ শুরু করেছে। এছাড়া অন্যান্য সংস্কার কমিশনের সুপারিশ বা প্রস্তাবনার মাঝেও বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সংস্কারে সংবিধানের প্রয়োজনীয় পরিবর্তনের প্রসঙ্গও থাকবে। কমিশনগুলো এরই মধ্যে জনগণের মতামত নেয়ার কাজ শুরু করেছে, প্রতিটি কমিশনের প্রতিবেদন উপস্থাপন করার পরে, এসব নিয়ে বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষের সাথে আলাপ-আলোচনার পরিকল্পনার কথাও জানানো হয়েছে। এসবের মধ্য দিয়ে সংবিধানের যে পরিবর্তনগুলো প্রয়োজন বলে সংবিধান কমিশন প্রস্তাব করবে, সেটা কিভাবে গৃহীত হবে? অর্থাৎ পুনর্লিখন বা সংস্কার করার কাজটি কিভাবে হবে, বা পরিবর্তিত সংবিধানটি বৈধতা পাবে কিভাবে?
সংবিধানের যেকোন পরিবর্তন - সংশোধনের মূল দায়িত্ব একটি নির্বাচিত আইনসভার, সে হিসেবে সংবিধান প্রণয়নের ক্ষেত্রেও বস্তুত জনগণের দ্বারা নির্বাচিত প্রতিনিধিদেরই এই দায়িত্ব পালন করতে দেয়া যেতে পারে। ক্ষমতা হস্তান্তর না করে কেবল সংবিধান প্রণয়ন বা সংস্কারের দায়িত্ব এই নির্বাচিত প্রতিনিধিদেরকে দিয়ে একটি গণপরিষদসভা বা সংবিধান সভা গঠন করা যায়। স্বাভাবিকভাবে এটিই হচ্ছে যথোপযুক্ত পদ্ধতি। তবে, আমাদের প্রচলিত আসনভিত্তিক পদ্ধতিতে (ফার্স্ট পাস্ট দ্য পোস্ট বা ওয়েস্টমিনিস্টার পদ্ধতি) নির্বাচন হলে কোন একটি বড় রাজনৈতিক দল একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে যেতে পারে, এমনকি তারা এককভাবে বা জোটগতভাবে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতাও পেতে পারে এবং তারা নির্বাচনে জয়ের পরে গণপরিষদ সভায় গিয়ে আগের সংবিধানের বিভিন্ন অগণতান্ত্রিক ও ফ্যাসিবাদী বিধিবিধান পরিবর্তনে আর আগ্রহী নাও হতে পারে। আবার, আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের পদ্ধতিতে নির্বাচন হলে পতিত ফ্যাসিবাদী রাজনৈতিক শক্তি ও ধর্মীয় ফ্যাসিবাদী শক্তিও সংবিধানসভায় চলে আসতে পারে - এধরণের আশংকা একেবারে অমূলক নয়। এবং এমনসব আশংকা থেকেই অনেকে নির্বাচিত সংবিধানসভার বিষয়ে আস্থা রাখতে পারছেন না। সে কারণেই এই মুহুর্তে সংবিধান সংস্কার, পুনর্লিখন বা বাতিলের দাবি ও তর্ক-বিতর্ক যত জোরালো, সেই অনুপাতে সংবিধান সভা বা গণপরিষদ সভার নির্বাচনের দাবি জোরালোভাবে প্রায় কাউকেই তুলতে দেখা যাচ্ছে না। ফলে, সংবিধানের আকাঙ্ক্ষিত এই পরিবর্তন হবে কোন পদ্ধতিতে সেই বিষয়ে এখন পর্যন্ত পরিস্কার কোন মতামত গড়ে উঠতে দেখা যাচ্ছে না। যারা পূর্বে বিভিন্ন সময়ে সংবিধান সভা বা গণপরিষদ সভার দাবি তুলেছেন, তাদেরকেও এই সময়কালে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সংবিধান সভার নির্বাচন দাবি তুলতে খুব একটা দেখা যাচ্ছে না। তবে, যারা নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার আশা দেখছেন, তারা সংবিধান সভা নয়, বরং জাতীয় সংসদ নির্বাচনই চাচ্ছেন, এবং ক্ষমতায় যাওয়ার পরে প্রয়োজনীয় সংস্কারগুলো তারাই করবেন বলে জানাচ্ছেন। ক্ষমতায় যাওয়ার পরে তারা যে জরুরী ও আকাঙ্ক্ষিত সংস্কারগুলো করবেনই, তার নিশ্চয়তা কি? এর বিপরীতে, নির্বাচিত জাতীয় সংসদ কিংবা নির্বাচিত সংবিধান সভাকে পাশ কাটানোর বেশ কিছু আলোচনা বা প্রস্তাবনাও আমরা দেখতে পাচ্ছি।
কেউ কেউ বলছেন, সংবিধান কমিশন বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার ও দল-মতের মানুষের সাথে আলাপ আলোচনার ভিত্তিতে সংবিধান লিখে বা পুনর্লিখন করে, গণভোটের মাধ্যমে সেই সংবিধানের বৈধতা দেয়া হবে। কোন একটি বিশেষ অনুচ্ছেদের বিষয়ে জনগণের হ্যাঁ-না ভোটের আশ্রয় নেয়া যেতে পারে, কিন্তু দেড়-দুশ অনুচ্ছেদের আস্ত সংবিধান নিয়েই গণভোট আয়োজন এক অবাস্তব ও অকার্যকর পরিকল্পনা। কোন একজন ব্যক্তির সংবিধানের কয়েকটি অনুচ্ছেদ নিয়ে আপত্তি ও বাকি অনুচ্ছেদগুলোতে পক্ষে অবস্থান থাকতে পারে - সেক্ষেত্রে তিনি হ্যাঁ, নাকি না, কোন ভোট দিবেন? আর, যেসব রাজনৈতিক শক্তির ভয়ে সংবিধান সভাকে পাশ কাটাতে গণভোটের আয়োজন করার প্রস্তাব এসেছে, তারা কি এই গণভোটে কম সক্রিয় থাকবে? সবচেয়ে বড় কথা, গণভোটে যদি “না” জয়যুক্ত হয়, সেক্ষেত্রে কি হবে? পুনর্লিখিত বা সংশোধিত সংবিধানের পুরোটিই কি তখন বাদ হয়ে যাবে? সংবিধান সংস্কার প্রক্রিয়াই তখন সংকটের মধ্যে পড়ে যাবার সম্ভাবনা তৈরি হবে না?
আরেকটি মত দেখা যাচ্ছে, গণপরিষদ সভা করা হবে ছাত্রজনতার সমস্ত স্তরের প্রতিনিধিদের নিয়ে, সেখানে সমস্ত রাজনৈতিক দলগুলোরও অংশগ্রহণ বা প্রতিনিধিত্ব থাকবে। সেখানকার আলাপ-আলোচনা, তর্ক-বিতর্কের মধ্য দিয়ে ঐক্যমত্যের ভিত্তিতে নতুন সংবিধান সংশোধিত বা পুনর্লিখিত বা নতুন করে লিখিত হবে। এভাবে কোন দল বিশেষের প্রতিনিধির সংখ্যাধিক্যের বদলে বরং নানা দল-মত-পথের মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। কিন্তু, দলগুলোর প্রতিনিধিদের বাইরে বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার প্রতিনিধিদের কিভাবে বাছাই করা হবে? আর, সকলের মাঝে ঐক্যমতে পৌঁছানো কি সহজ হবে? ঐক্যমতে পৌঁছতে না পারলে কিভাবে সিদ্ধান্ত নেয়া সম্ভব হবে? তার চেয়েও বড় প্রশ্ন, জনগণের ভোটে নির্বাচিত না হলে - এরকম গণপরিষদ সভার কি সংবিধান প্রণয়নের ও বলবৎকরণের বৈধতা কি থাকবে?
সর্বশেষ আরেকটি প্রস্তাবনা দিয়েছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ও সংবিধান কমিশনের একজন সদস্য। তিনি জানিয়েছেন, নতুন সংবিধান বর্তমান সরকারই কার্যকর করবে। আদৌ কি নির্বাহী বিভাগের এই এখতিয়ার আছে? এভাবে এখন যদি একটি সংবিধানকে বৈধতা দেয়াও হয়, ভবিষ্যতে উচ্চ আদালতে তার বৈধতা নিয়ে যে প্রশ্ন উঠবে না, সে নিশ্চয়তা কি আছে?
বর্তমান সংবিধানের সমস্যা-সংকট
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানে ১১ টি ভাগে মোট ১৫৩ নাম্বার পর্যন্ত অনুচ্ছেদ রয়েছে। সংবিধানের শিরোনামের পরে শুরু হয়েছে “বিস্মিল্লাহির-রহ্মানির রহিম (দয়াময়, পরম দয়ালু, আল্লাহের নামে)/ পরম করুণাময় সৃষ্টিকর্তার নামে” দিয়ে, তারপরে আছে প্রস্তাবনা এবং প্রস্তাবনার পর থেকে ১১ টি ভাগে অনুচ্ছেদ গুলো ১ থেকে ১৫৩ নাম্বার পর্যন্ত বিবৃত হয়েছে। এই ১১ টি ভাগের মধ্যে প্রস্তাবনা, ১ম ভাগ (প্রজাতন্ত্র), ২য় ভাগ (রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি) ও ৩য় ভাগ (মৌলিক অধিকার) - কে মৌলিক অধ্যায় বলা যেতে পারে। এরপরে ৪র্থ ভাগ (নির্বাহী বিভাগ), ৫ম ভাগ (আইনসভা), ৬ষ্ঠ ভাগ (বিচার বিভাগ), ৭ম ভাগ (নির্বাচন), ৮ম ভাগ (মহা হিসাব-নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক), ৯ম ভাগ (বাংলাদেশের কর্মবিভাগ) ও ৯(ক) ভাগ (জরুরী বিধানাবলী) হচ্ছে রাষ্ট্র পরিচালনার জন্যে সাংবিধানিক রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সম্পর্কিত অধ্যায়। ১০ম ভাগ-ও (সংবিধান সংশোধন) মৌলিক অধ্যায়ে স্থান পেতে পারে। সবশেষে রয়েছে একাদশ ভাগ (বিবিধ)।
বাংলাদেশ সংবিধানের প্রধান সমস্যাগুলো হচ্ছেঃ
ক। প্রস্তাবনা, ১ম, ২য়, ৩য় ও ১০ম ভাগ (মৌলিক অধ্যায়)
১ম ভাগের প্রজাতন্ত্র হচ্ছে বাংলাদেশ রাষ্ট্র ও নাগরিকের পরিচিতিমূলক ভাগ। এই ভাগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনুচ্ছেদ হচ্ছে অনুচ্ছেদ ৭, সংবিধানের প্রাধান্য। সংবিধানের প্রাধান্য বলতে বাংলাদেশের সমস্ত আইনের মধ্যে সর্বোচ্চ আইন হিসেবে যেমন বলা হয়েছে, তেমনি এই সংবিধানে জনগণকে সকল ক্ষমতার কেন্দ্রে নিয়ে এসে, জনগণের অভিপ্রায়ের পরম অভিব্যক্তিরূপে সংবিধানকে কার্যকর করা হয়েছে। বলা হয়েছে,
“(১) প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ; এবং জনগণের পক্ষে সেই ক্ষমতার প্রয়োগ কেবল এই সংবিধানের অধীন ও কর্তৃত্বে কার্যকর হইবে৷
(২) জনগণের অভিপ্রায়ের পরম অভিব্যক্তিরূপে এই সংবিধান প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ আইন এবং অন্য কোন আইন যদি এই সংবিধানের সহিত অসমঞ্জস হয়, তাহা হইলে সেই আইনের যতখানি অসামঞ্জস্যপূর্ণ, ততখানি বাতিল হইবে”৷
অর্থাৎ পুরো সংবিধানের অন্য সব ভাগের সমস্ত অনুচ্ছেদের মূলগত বিষয়ই হবে জনগণের পক্ষে সেই ক্ষমতা প্রয়োগ। ফলে, এই অনুচ্ছেদ মোতাবেকই কখনো কখনো সংবিধানে দেখানো বিধানাবলীর ওপরে জনগণের অভিপ্রায়কে জায়গা দেয়াও সাংবিধানিক হতে পারে।
১ম ভাগের পরে ২য় ভাগে রয়েছে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি এবং ৩য় ভাগে মৌলিক অধিকার। জনগণ যেহেতু সকল ক্ষমতার মালিক, রাষ্ট্র পরিচালনার মূলেই রয়েছে জনগণেরই সেই ক্ষমতাকে নিশ্চিত করা, সেহেতু বস্তুত প্রজাতন্ত্রের পরের ভাগেই মৌলিক অধিকার থাকা দরকার। এবং, জনগণের এই মৌলিক অধিকার রক্ষা করার লক্ষে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি ভাগটি এর পরে আসতে পারে।
১। রাষ্ট্রধর্ম বনাম ধর্ম-নিরপেক্ষতা ও ধর্মীয় স্বাধীনতা
১ম ভাগের ২ক অনুচ্ছেদে (রাষ্ট্রধর্ম) আছে, “প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম, তবে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রীষ্টানসহ অন্যান্য ধর্ম পালনে রাষ্ট্র সমমর্যাদা ও সমঅধিকার নিশ্চিত করিবেন”। আবার প্রস্তাবনায় এবং ২য় ভাগের ৮ অনুচ্ছেদে (মূলনীতিসমূহ) যথাক্রমে সংবিধানের এবং রাষ্ট্র পরিচালনার অন্যতম মূলনীতি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে ধর্মনিরপেক্ষতাকে। সেই ধর্মনিরপেক্ষতার ব্যাখ্যায় ১২ অনুচ্ছেদে (ধর্মনিরপেক্ষতা ও ধর্মীয় স্বাধীনতা) বলা হয়েছে, “(খ) রাষ্ট্র কর্তৃক কোন ধর্মকে রাজনৈতিক মর্যাদা দান বিলোপ করা হবে”। অর্থাৎ, সংবিধানের মূলনীতি হিসেবে উল্লেখ করা ধর্মনিরপেক্ষতার অনুচ্ছেদ এর সাথে ২ক অনুচ্ছেদ সাংঘর্ষিক।
২। জাতির পিতার প্রতিকৃতি
১ম ভাগে প্রজাতন্ত্রের পরিচিতিমূলক অনুচ্ছেদসমূহের মাঝখানে ৪ক অনুচ্ছেদে (জাতির পিতার প্রতিকৃতি) একটি নির্দেশনা জারি করা হয়েছে, “জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতি রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, স্পীকার ও প্রধান বিচারপতির কার্যালয় এবং সকল সরকারী ও আধা-সরকারী অফিস, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, সংবিধিবদ্ধ সরকারী কর্তৃপক্ষের প্রধান ও শাখা কার্যালয়, সরকারী ও বেসরকারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশের দূতাবাস ও মিশনসমূহে সংরক্ষণ ও প্রদর্শন করিতে হইবে”। এমন নির্দেশনা বস্তুত নির্বাহী বিভাগের পরিপত্রের অনুরূপ। জাতির পিতার প্রতিকৃতিকে জাতির ওপরে চাপিয়ে দেয়ার এহেন সাংবিধানিক পরিপত্র বস্তুত পতিত ফ্যাসিবাদী দলটির পরিবারতন্ত্র ও চেতনা-ব্যবসারই অংশ বিশেষ।
৩। জাতীয়তা ও নাগরিকত্ব
বাংলাদেশ সংবিধানের ৬(২) নাম্বার অনুচ্ছেদে আছে, "বাংলাদেশের জনগণ জাতি হিসাবে বাঙালি এবং নাগরিকগণ বাংলাদেশী বলিয়া পরিচিত হইবেন"। এই অনুচ্ছেদটি ২০১১ সালের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে এভাবে লিখিত হয়। ১৯৭২ সালে যখন প্রথম সংবিধান লেখা হয়েছিলো, তখন নাগরিকগণের পরিচিতি হিসেবে কেবল জাতি পরিচয় বাঙালি বলা হয়েছিলো, নাগরিক হিসেবে যে আমরা বাংলাদেশী সেটি বলা ছিল না (“বাংলাদেশের নাগরিকগণ বাংলাদেশী বলিয়া পরিচিত হইবেন”)। সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীতে সমস্ত জায়গায় বাঙালি কেটে দিয়ে বাংলাদেশী করা হয়। বাংলাদেশের নাগরিকগণ বাংলাদেশী বলে পরিচিত হয় ঠিকই, কিন্তু বাঙালি জাতীয়তাবাদের জায়গায় বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ হয়ে যায়।
বাঙালি জাতীয়তাবাদ বনাম বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ বিতর্কে বুদ হয়ে থাকা বাংলাদেশের জনগণ স্বাধীনতার ৫৩ বছর পার হওয়ার পরে আত্মপরিচয় নিয়েই ঐক্যমতে পৌঁছাতে পারেনি। জাতিগত পরিচয় হিসেবে বাংলাদেশের সমস্ত জনগণকে বাঙালি বললে আর সব জাতিসত্ত্বা নাই হয়ে যায়, আবার বাংলাদেশী বললে অন্যান্য জাতিসত্ত্বার সাথে সাথে বাঙালিকেও অস্বীকার করা হয়। অথচ, সংবিধানের ৬(২) অনুচ্ছেদটিতে বাংলাদেশের জনগণকে নাগরিক হিসেবে বাংলাদেশী আর জাতি হিসেবে বাঙালির পাশাপাশি অন্য সব জাতিসত্ত্বাকে (চাকমা, মারমা, সাঁওতাল, ত্রিপুরা, গারো, ওঁরাও, তঞ্চ্যঙ্গা, ম্রো, বম, পাংখো, চাক, খেয়াং, খুমি, লুসাই, কোচ, ডালু, কুকি, রাখাইন, মণিপুরী, হাজং, খাসিয়া, মং, মুন্ডা, কোল, কন্দ, পাঙন, লাওরা, মুরং, রাজবংশী, পাত্র, গণ্ড, বাগদী, ভিল, টিপরা, রনজোগী, হো, খাড়িয়া, খেড়োয়ার, প্রভৃতি) স্বীকার করে নিলেই সেটি অন্তর্ভূক্তিমূলক হয়, বাঙালি বনাম বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ নিয়ে অপ্রয়োজনীয় বিতর্কের অবসানও ঘটানো সম্ভব হয়।
৪। সংবিধানের প্রতি নাগরিকের আস্থা পরাহত করণ
বাংলাদেশ সংবিধানের ৭ক অনুচ্ছেদে (সংবিধান বাতিল, স্থগিতকরণ, ইত্যাদি অপরাধ) শক্তি প্রয়োগ বা প্রদর্শনের মাধ্যমে অসাংবিধানিক উপায়ে সংবিধান বা এর কোন অনুচ্ছেদ স্থগিত, রদ, রহিত বা বাতিল বন্ধ করার ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। কিন্তু তা করতে গিয়ে সংবিধানকে প্রশ্নাতীত এক মর্যাদা প্রদান করা হয়েছে। ৭ক অনুচ্ছেদের ১(খ) এ বলা হয়েছে, “এই সংবিধান বা ইহার কোন বিধানের প্রতি নাগরিকের আস্থা, বিশ্বাস বা প্রত্যয় পরাহত করিলে কিংবা উহা করিবার জন্য উদ্যোগ গ্রহণ বা ষড়যন্ত্র করিলে- তাহার এই কার্য রাষ্ট্রদ্রোহিতা হইবে এবং ঐ ব্যক্তি রাষ্ট্রদ্রোহিতার অপরাধে দোষী হইবে”। এবং একই অনুচ্ছেদের ৩ নাম্বার দফায় বলা হয়েছে, এই অপরাধে দোষী ব্যক্তি “প্রচলিত আইনে অন্যান্য অপরাধের জন্য নির্ধারিত দণ্ডের মধ্যে সর্বোচ্চ দণ্ডে দণ্ডিত হইবে”। বলাই বাহুল্য, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সংবিধান কমিশনের সকল সদস্য এবং সেই কমিশন গঠনকারী সরকারের সদস্যবৃন্দসহ বাংলাদেশের অধিকাংশ সচেতন ব্যক্তি, যারা বর্তমান সংবিধান বাতিল বা সংস্কার অথবা পুনর্লিখনের কথা বলছেন, সকলেই এই অনুচ্ছেদ মোতাবেক রাষ্ট্রদ্রোহিতার অপরাধে দোষী, এবং তাদের সর্বোচ্চ দণ্ড প্রাপ্য।
৫। সংবিধান ও রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিসমূহ
আমাদের সংবিধানের প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, “... জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার সেই সকল আদর্শ এই সংবিধানের মূলনীতি হইবে”। ৮ অনুচ্ছেদে (মূলনীতিসমূহ) বলা হয়েছে, “জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা- এই নীতিসমূহ এবং তৎসহ এই নীতিসমূহ হইতে উদ্ভূত এই ভাগে বর্ণিত অন্য সকল নীতি রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি বলিয়া পরিগণিত হইবে”। পরবর্তী ৪টি অনুচ্ছেদ ৯ (জাতীয়তাবাদ), ১০ (সমাজতন্ত্র ও শোষণমুক্তি), ১১ (গণতন্ত্র ও মানবাধিকার) এবং ১২ (ধর্ম নিরপেক্ষতা ও ধর্মীয় স্বাধীনতা)-এ এই চার মূলনীতির বিবরণ দেয়া হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের এই কথিত চার মূলনীতিকে একত্রে বলা হয় মুজিববাদ, যা বস্তুত বিগত ফ্যাসিবাদী শাসন ব্যবস্থার ভাবমানস তৈরিতে মূল ভূমিকা রেখেছে। এই চার মূলনীতির মাঝে বাঙালি জাতীয়তাবাদ বাংলাদেশের অপরাপর জাতিসত্ত্বাকে অস্বীকার করার মাধ্যমে জাতিগত বৈষম্য ও নিষ্পেশনের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার নামে মুক্তিযুদ্ধোত্তর সময়ে ঢালাও রাষ্ট্রীয়করণের নামে অবাধ লুটপাটের মহোৎসব শুরু হয়েছিল, যার মাধ্যমে আমাদের উৎপাদনমুখী অর্থনীতিকে শুরুতেই গলা টিপে মারা হয়েছে। সংবিধানের মূলনীতি হিসেবে গণতন্ত্র কেবল নামেই থেকেছে, ৭২ সালের সংবিধান প্রণয়ন থেকে শুরু করে, সংবিধানের বিভিন্ন অনুচ্ছেদে ক্ষমতা কুক্ষীগত করার আয়োজন সম্পন্ন করেই থামা হয়নি, কয়েক বছরের মধ্যে ২য় সংশোধনীর মাধ্যমে জরুরী বিধিমালার অনুচ্ছেদ সংযোজন করে মৌলিক অধিকারে লাগাম টানা হয় এবং “সাংবিধানিক” উপায়েই ৪র্থ সংশোধনীর মাধ্যমে গণতন্ত্রের বুকে পেরেক ঠুকে দেয়া হয়। ধর্মনিরপেক্ষতাও বস্তুত নামেই থেকেছে। অথচ, এই চার মূলনীতিকে কখনো মুজিববাদ, কখনো মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নাম দিয়ে, পতিত ফ্যাসিবাদী রাজনৈতিক শক্তি চেতনা ব্যবসা করে গিয়েছে, যেই চেতনা ব্যবসা ক্রমেই তাদেরকে ফ্যাসিবাদ কায়েমে শক্তি যুগিয়েছে।
ফলে, সংবিধান থেকে এই চার মূলনীতির বদলে মুক্তিযুদ্ধের ঘোষণার “সাম্য”, “মানবিক মর্যাদা” ও “সামাজিক ন্যায়বিচার” এবং জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষার “বৈষম্যহীনতা”, “অন্তর্ভূক্তিমূলক ব্যবস্থা” ও “গণতন্ত্র”কে সংবিধানের মূলনীতি হিসেবে প্রতিস্থাপন করা যেতে পারে।
৮ অনুচ্ছেদের (২) নাম্বার দফায় বলা হয়েছে, “এই ভাগে বর্ণিত নীতিসমূহ বাংলাদেশ-পরিচালনার মূলসূত্র হইবে, আইন-প্রণয়নকালে রাষ্ট্র তাহা প্রয়োগ করিবেন, এই সংবিধান ও বাংলাদেশের অন্যান্য আইনের ব্যাখ্যাদানের ক্ষেত্রে তাহা নির্দেশক হইবে এবং তাহা রাষ্ট্র ও নাগরিকদের কার্যের ভিত্তি হইবে, তবে এই সকল নীতি আদালতের মাধ্যমে বলবৎযোগ্য হইবে না” ৷ অর্থাৎ রাষ্ট্র পরিচালনার মূলসূত্র হিসেবে যে মূলনীতিসমূহকে ২য় ভাগে উল্লেখ করা হয়েছে, তার সবই রাষ্ট্রের ঘাড়ে দেয়া হয়েছে, কিন্তু রাষ্ট্র ব্যর্থ হলে আদালতে গিয়ে রাষ্ট্রকে বাধ্য করার উপায়ও বন্ধ করার মাধ্যমে, সবই রাষ্ট্রের জন্যে ঐচ্ছিক করে দেয়া হয়েছে।
৬। জাতীয় ও উপজাতীয় সংস্কৃতি
আমাদের সংবিধানের "জাতীয় সংস্কৃতি" শীর্ষক ২৩ নাম্বার অনুচ্ছেদে আছে, "রাষ্ট্র জনগণের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকার রক্ষণের জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন এবং জাতীয় ভাষা, সাহিত্য ও শিল্পকলাসমূহের এমন পরিপোষণ ও উন্নয়নের ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন, যাহাতে সর্বস্তরের জনগণ জাতীয় সংস্কৃতির সমৃদ্ধিতে অবদান রাখিবার ও অংশগ্রহণ করিবার সুযোগ লাভ করিতে পারেন"৷ ঠিক এরপরেই যুক্ত করা হয়েছে ২৩ক নাম্বার অনুচ্ছেদ (উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃ-গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের সংস্কৃতি), যেখানে বলা হয়েছে, "রাষ্ট্র বিভিন্ন উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃ-গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের অনন্য বৈশিষ্ট্যপূর্ণ আঞ্চলিক সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্য সংরক্ষণ, উন্নয়ন ও বিকাশের ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন"।
অর্থাৎ অনুচ্ছেদ ২৩ এর জাতীয় সংস্কৃতি হচ্ছে বাঙালি জাতির সংস্কৃতি, জাতীয় ভাষা, সাহিত্য ও শিল্পকলাসমূহ হচ্ছে বাংলা ভাষা। সাহিত্য এবং বাঙালির শিল্পকলা। তারপরে দয়া করে উপজাতি(?), ক্ষুদ্র(?) নৃ-গোষ্ঠীর সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ, উন্নয়ন ও বিকাশের কথা বলা হয়েছে! এভাবে ২৩ ও ২৩ক অনুচ্ছেদ দুটি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জন্যে অবমাননাকর। দুটো অনুচ্ছেদকে মূলত একটি অনুচ্ছেদের (জাতীয় সংস্কৃতি শিরোনামে) দুটি দফা হিসেবে রেখে প্রথম দফায় “সকল” ভাষা, সাহিত্য ও শিল্পকলাসমূহের পরিপোষণ ও উন্নয়নের কথা বলা যেতে পারে, এবং পরের দফায় “বিভিন্ন উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃ-গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়” -কে “বিভিন্ন আদিবাসী জাতিসত্তা ও সম্প্রদায়” দিয়ে প্রতিস্থাপন করা যেতে পারে।
৭। মৌলিক অধিকার
আমাদের সংবিধানে ৩য় ভাগে ২৬ থেকে ৪৭ক পর্যন্ত ২৩ টি অনুচ্ছেদ রয়েছে, যেখানে রাষ্ট্র জনগণের ১৭ টি অধিকার স্বীকার করে নিয়েছে, এছাড়া ২৬ অনুচ্ছেদে এই ভাগে বর্ণিত মৌলিক অধিকারের সাথে অসামঞ্জস্য আইন বাতিলের কথা বলা হয়েছে, এবং ৪৪ অনুচ্ছেদে অধিকারসমূহ বলবৎ করতে উচ্চ আদালতে মামলা রুজু করার বিধানও রাখা হয়েছে। অন্যদিকে এই ভাগে বর্ণিত মৌলিক অধিকারসমূহের অনেকগুলোই শর্ত সাপেক্ষ অর্থাৎ অধিকারের সীমা প্রদান করে দেয়া হয়েছে (যেমনঃ অনুচ্ছেদ ৩৩ - গ্রেপ্তার ও আটক সম্পর্কে রক্ষাকবচ, অনুচ্ছেদ ৩৪ - জবরদস্তি-শ্রম নিষিদ্ধকরণ, অনুচ্ছেদ ৩৫ - বিচার ও দন্ড সম্পর্কে রক্ষণ, অনুচ্ছেদ ৩৬ - চলাফেরার স্বাধীনতা, অনুচ্ছেদ ৩৭ - সমাবেশের স্বাধীনতা, অনুচ্ছেদ ৩৮ - সংগঠনের স্বাধীনতা, অনুচ্ছেদ ৩৯ - চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা এবং বাক্-স্বাধীনতা, অনুচ্ছেদ ৪১ - ধর্মীয় স্বাধীনতা, অনুচ্ছেদ ৪২ - সম্পত্তির অধিকার)। অবশ্য কিছু অনুচ্ছেদে অধিকারের এই সীমারেখা যৌক্তিক, তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মৌলিক অধিকার সমূহের লাগাম টেনে ধরতে চাপানো বাধা-নিষেধগুলো অস্পষ্ট বা অধিকার কেড়ে নেয়ার শামিল। এছাড়া, এই অনুচ্ছেদগুলোর মধ্যে আলাদাভাবে মানুষের অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা ও শিক্ষা - প্রভৃতিকে মৌলিক অধিকার হিসেবে উল্লেখ করা হয়নি। রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি নামক ভাগে, এসবকে মানুষের মৌলিক প্রয়োজন হিসেবে উল্লেখ করে এই প্রয়োজনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব হিসেবে বলা হলেও মৌলিক অধিকার শীর্ষক ভাগের কোথাও এগুলোর স্থান হয়নি। রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি ভাগে রাষ্ট্র একই পদ্ধতির গণমুখী ও সার্বজনীন শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য এবং আইনের দ্বারা নির্ধারিত স্তর পর্যন্ত সকল বালক-বালিকাকে অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষাদানের জন্য কার্যকর ভূমিকা পালন করবে বলা হলেও, মৌলিক অধিকার হিসেবে শিক্ষার অধিকার যে নাগরিকের মৌলিক অধিকার, তার কোন স্বীকৃতি সংবিধানে নেই। একইভাবে, ২য় ভাগে কর্মের অধিকার, বিশ্রাম, বিনোদন ও অবকাশের অধিকার, সামাজিক নিরাপত্তার অধিকার প্রভৃতি নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রকে দেয়া হলেও, মৌলিক অধিকার ভাগে এসবের কোন উল্লেখ নেই। এর অর্থ হচ্ছে, জনগণ এই অধিকার বঞ্চিত হলে তা আদায়ের জন্যে মামলা রুজু করতে পারবে না।
এছাড়াও, সংবিধানের মৌলিক অধিকার নামক ভাগে জনগণের বিভিন্ন অংশের মানুষের অধিকার এর উল্লেখ নেই। রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি ভাগে শ্রমিক ও কৃষকের শোষণ থেকে মুক্তি আর কৃষি বিপ্লবের “গল্প” থাকলেও, মৌলিক অধিকার ভাগে শ্রমিকের অধিকার, কৃষকের অধিকার বলে কোন কিছু নেই। শ্রমিকের ন্যুনতম মজুরি পাওয়ার অধিকার, ট্রেড ইউনিয়নের অধিকার, নিরাপদ কর্মপরিবেশের অধিকার বা কৃষকের ফসলের ন্যায্যমূল্য পাওয়ার অধিকার, বীজ, সার, সেচ, কৃষি উপকরণ স্বল্পমূল্যে পেতে রাষ্ট্র থেকে ভর্তুকি পাওয়ার অধিকারের স্বীকৃতি এই সংবিধানে নেই, অথচ সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্র শ্রমিক ও কৃষকের শোষণ মুক্তি করে ফেলবে! একইভাবে, এই সংবিধানে নারীর অধিকার, বয়স্কদের অধিকার, শিশুর অধিকার, আদিবাসীর অধিকার, দলিত ও হতদরিদ্র, ছিন্নমূল মানুষের অধিকার - প্রভৃতি অধিকার বলে কোন অনুচ্ছেদ নেই। আমাদের সংবিধান লিঙ্গ বলতে কেবল পুরুষ ও নারীকেই চিনে। অনুচ্ছেদ ২৮ (ধর্ম, প্রভৃতি কারণে বৈষম্য), ২৯ (সরকারী নিয়োগ-লাভে সুযোগের সমতা), ৩৮ (সংগঠনের স্বাধীনতা) ও ১২১ (প্রতি এলাকার জন্য একটিমাত্র ভোটার তালিকা)-এ “নারীপুরুষভেদে” বা “নারী-পুরুষ” বলা আছে। সেসব জায়গায় “নারীপুরুষভেদে”-কে “লিঙ্গেভেদে” এবং “নারী-পুরুষ”-কে “যেকোন/ সকল লিঙ্গ” দিয়ে প্রতিস্থাপিত করা যেতে পারে।
৮। দায়মুক্তি ও মৌলিক অধিকার হরণ
বর্তমান সংবিধানে মৌলিক অধিকারের স্বীকৃতি যতটুকুই বা আছে, সেটাও হরণ করার আয়োজন রয়েছে। ৪৫ অনুচ্ছেদ বলা হয়েছে, “কোন শৃঙ্খলা-বাহিনীর সদস্য-সম্পর্কিত কোন শৃঙ্খলামূলক আইনের যে কোন বিধান উক্ত সদস্যদের যথাযথ কর্তব্যপালন বা উক্ত বাহিনীতে শৃঙ্খলারক্ষা নিশ্চিত করিবার উদ্দেশ্যে প্রণীত বিধান বলিয়া অনুরূপ বিধানের ক্ষেত্রে এই ভাগের কোন কিছুই প্রযোজ্য হইবে না”। ৪৬ অনুচ্ছেদে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সীমানার মধ্যে যে কোন অঞ্চলে শৃঙ্খলা-রক্ষা বা পুনর্বহালের প্রয়োজনে প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত কোন ব্যক্তি বা অন্য কোন ব্যক্তিকে সংসদ দায়মুক্ত করতে পারবে বলা হয়েছে। ৯ম-ক ভাগের (জরুরী বিধানাবলী) ১৪১গ অনুচ্ছেদে জরুরী-অবস্থার সময় মৌলিক অধিকারসমূহকে স্থগিত করে বলা হয়েছে, “(১) জরুরী-অবস্থা ঘোষণার কার্যকরতা-কালে প্রধানমন্ত্রীর লিখিত পরামর্শ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি আদেশের দ্বারা ঘোষণা করিতে পারিবেন যে, আদেশে উল্লেখিত এবং সংবিধানের তৃতীয় ভাগের অন্তর্গত মৌলিক অধিকারসমূহ বলবৎকরণের জন্য আদালতে মামলা রুজু করিবার অধিকার এবং আদেশে অনুরূপভাবে উল্লেখিত কোন অধিকার বলবৎকরণের জন্য কোন আদালতে বিবেচনাধীন সকল মামলা জরুরী-অবস্থা ঘোষণার কার্যকরতা-কালে কিংবা উক্ত আদেশের দ্বারা নির্ধারিত স্বল্পতর কালের জন্য স্থগিত থাকিবে”। এছাড়া ১৪১খ অনুচ্ছেদের বলে মৌলিক অধিকার ভাগের অনুচ্ছেদ ৩৬ (চলাফেরার স্বাধীনতা), ৩৭ (সমাবেশের স্বাধীনতা), ৩৮ (সংগঠনের স্বাধীনতা), ৩৯ (চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা এবং বাক্-স্বাধীনতা), ৪০ (পেশা বা বৃত্তির স্বাধীনতা) ও ৪২ (সম্পত্তির অধিকার) - এই অনুচ্ছেদসমূহের কারণে সাধারণভাবে নির্বাহী বিভাগ যেসব বিধান করতে সক্ষম নয় বা রাষ্ট্র যে আইন করতে সক্ষম নয়, জরুরী অবস্থা ঘোষণার কার্যকরতা-কালে সেই বিধান বা আইন করার ক্ষমতা রাষ্ট্র বা নির্বাহী বিভাগ লাভ করবে।
৯। সংবিধান সংশোধন
বাংলাদেশ সংবিধানের ১০ম ভাগ হচ্ছে সংবিধান সংশোধন। এর ১৪২ অনুচ্ছেদে (সংবিধানের বিধান সংশোধনের ক্ষমতা) এই সংবিধানের কোন বিধান সংযোজন, পরিবর্তন, প্রতিস্থাপন বা রহিতকরণের দ্বারা সংশোধন করার জন্যে সংসদের মোট সদস্য-সংখ্যার অন্যূন দুই-তৃতীয়াংশ ভোটে গৃহীত হওয়ার শর্ত যুক্ত করা হয়েছে। এই অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংবিধানের যেকোন বিধানই সংসদের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের ভোটে বদলে ফেলা সম্ভব। এমন কোন সাংবিধানিক আদালতের ব্যবস্থা নেই, যেটি সংবিধানের কোন বিধানের সংশোধনী (এবং রাষ্ট্রের কোন একটি আইন) সংবিধানের মৌলিক নীতি ও বিধানের সাথে সাংঘর্ষিক কি না, তা যাচাই করে দেখবে। যেমনঃ সংবিধানের ১ম ভাগের (প্রজাতন্ত্র) ৭(২) অনুচ্ছেদে আছে, “জনগণের অভিপ্রায়ের পরম অভিব্যক্তিরূপে এই সংবিধান প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ আইন এবং অন্য কোন আইন যদি এই সংবিধানের সহিত অসমঞ্জস্য হয়, তাহা হইলে সেই আইনের যতখানি অসামঞ্জস্যপূর্ণ, ততখানি বাতিল হইবে”৷ ২য় ভাগের (রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি) ৮(২) অনুচ্ছেদে আছে, “এই ভাগে বর্ণিত নীতিসমূহ বাংলাদেশ-পরিচালনার মূলসূত্র হইবে, আইন-প্রণয়নকালে রাষ্ট্র তাহা প্রয়োগ করিবেন, এই সংবিধান ও বাংলাদেশের অন্যান্য আইনের ব্যাখ্যাদানের ক্ষেত্রে তাহা নির্দেশক হইবে …”। এবং ৩য় ভাগের (মৌলিক অধিকার) ২৬ অনুচ্ছেদে আছে, “(১) এই ভাগের বিধানাবলীর সহিত অসামঞ্জস সকল প্রচলিত আইন যতখানি অসামঞ্জস্যপূর্ণ, এই সংবিধান-প্রবর্তন হইতে সেই সকল আইনের ততখানি বাতিল হইয়া যাইবে। (২) রাষ্ট্র এই ভাগের কোন বিধানের সহিত অসমঞ্জস কোন আইন প্রণয়ন করিবেন না এবং অনুরূপ কোন আইন প্রণীত হইলে তাহা এই ভাগের কোন বিধানের সহিত যতখানি অসামঞ্জস্যপূর্ণ, ততখানি বাতিল হইয়া যাইবে”। জনগণের অভিপ্রায়ের পরম অভিব্যক্তিরূপে এই সংবিধান রাষ্ট্রের অন্য কোন আইনের সাথে অসামঞ্জস্য কি না, বা রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি ভাগে বর্ণিত নীতিসমূহ রাষ্ট্র তার আইন প্রণয়নের কালে সঠিকভাবে প্রয়োগ করতে পারছে কি না, কিংবা মৌলিক অধিকার শীর্ষক ভাগের বিধানাবলীর সাথে প্রচলিত আইনসমূহ সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, অসামঞ্জস্যপূর্ণ হলে কতখানি, এই বিষয়টি নির্ধারণের জন্যে সাংবিধানিক দায়িত্ব আদালতকে দেয়া হয়নি। উচ্চ আদালতে কোন আইন বা সংবিধানের কোন সংশোধনী নিয়ে মামলা রুজু করা হলেই আদালত শুনানি শেষে রায় দেয়, তারপরে সেই রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টেও আপিল করার ব্যবস্থা আছে। কিন্তু, যেকোন আইন করার পরে বা সংবিধানের সংশোধনীর পরপরেই সেটা অনুমোদনের জন্যে রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠানো হয় (রাষ্ট্রপতি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে অনুমোদন না দিলেও অনুমোদন দিয়েছেন বলে ধরা হবে), কিন্তু কোন সাংবিধানিক আদালতের অনুমোদনের বাধ্যবাধকতা নেই। ফলে, ১৯৭৯ সালের ৫ম সংশোধনীকে আদালতে অসাংবিধানিক ও অবৈধ বলে রায় ঘোষণা হয় ৩১ বছর পরে ২০১০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে, ১৯৮৬ সালের ৭ম সংশোধনীকে উচ্চ আদালত অবৈধ ঘোষণা ২০১০ সালের আগস্ট মাসে। উচ্চ আদালতের রায়ে বাতিল ঘোষিত হওয়ার সাথে সাথে সেই সংশোধনীর আগের অবস্থায় সংবিধান চলে যায় না, সংসদ পরবর্তী সংশোধনীর মাধ্যমে আদালতের সেই রায় কার্যকর করে। ষোড়শ সংশোধনীর বিষয়ে হাইকোর্ট বাতিলের রায় দিলে তৎকালীন সরকার পক্ষ আপিল করে এবং সুপ্রিম কোর্টও হাইকোর্টের রায়কে বহাল রাখে। তারপরেও আজ পর্যন্ত আমাদের সংবিধানে সর্বোচ্চ আদালতে বাতিলকৃত ষোড়শ সংশোধনী থেকে গিয়েছে। ২০১৭ সালে আপিল বিভাগ এই সংশোধনীকে বাতিল করে দেয়ার অপরাধে তৎকালীন প্রধান বিচারপতিকে পদ ও দেশ ছাড়তে হয়, সরকার পক্ষ আপিল বিভাগের সাত বেঞ্চের সর্বসম্মতিক্রমে আসা রায় পুনর্বিবেচনা চেয়ে ২০১৭ সালের ২৪ ডিসেম্বর আবেদন করে রাষ্ট্রপক্ষ। তারপরে সেটা বছরের পর বছর সেভাবেই ফেলে রাখা হয়, সংসদেও কোন সংশোধনী এনে আদালত কর্তৃক বাতিল কৃত ষোড়শ সংশোধনীকে সরানো হয়নি। ফ্যাসিবাদী সরকারের পতনের পরেই গত মাসে আপিল বিভাগে পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চে শুনানির জন্যে উঠতে পেরেছে।
ফলে, সংবিধানের যেকোন সংশোধনীর (ও যেকোন আইন প্রণয়নের) ক্ষেত্রে আইনসভার দুই-তৃতীয়াংশের (ও সংখ্যাগরিষ্ঠের) ভোটে গৃহীত হওয়ার পরে সাংবিধানিক আদালতের অনুমোদনের বাধ্যবাধকতা যুক্ত হতে পারে।
এছাড়া, সংবিধানের ৮(৩) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, “সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদের অধীন প্রণীত সংশোধনের ক্ষেত্রে এই অনুচ্ছেদের কোন কিছুই প্রযোজ্য হইবে না”। ৭খ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, “সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদে যাহা কিছুই থাকুক না কেন, সংবিধানের প্রস্তাবনা, প্রথম ভাগের সকল অনুচ্ছেদ, দ্বিতীয় ভাগের সকল অনুচ্ছেদ, নবম-ক ভাগে বর্ণিত অনুচ্ছেদসমূহের বিধানাবলী সাপেক্ষে তৃতীয় ভাগের সকল অনুচ্ছেদ এবং একাদশ ভাগের ১৫০ অনুচ্ছেদসহ সংবিধানের অন্যান্য মৌলিক কাঠামো সংক্রান্ত অনুচ্ছেদসমুহের বিধানাবলী সংযোজন, পরিবর্তন, প্রতিস্থাপন, রহিতকরণ কিংবা অন্য কোন পন্থায় সংশোধনের অযোগ্য হইবে”। সংবিধানের মৌলিক অংশ (প্রস্তাবনা, ১ম ভাগ, ২য় ভাগ ও ৩য় ভাগ) - এর যেকোন অনুচ্ছেদ এবং একাদশ ভাগের ১৫০ অনুচ্ছেদকে সংশোধন অযোগ্য করা হয়েছে। সংবিধানের সংশোধন বিষয়ক এই অনুচ্ছেদগুলোকে ১০ম ভাগে (সংবিধান সংশোধন) না রেখে ১ম ও ৩য় ভাগে রাখার উদ্দেশ্য হচ্ছে, সংবিধানের মৌলিক অংশকে অলঙ্ঘনীয় বা অসংশোধনযোগ্য করে দেয়া এই অনুচ্ছেদটিকেও একই রকম অলঙ্ঘনীয় করে ফেলা! সংবিধানের কোন অনুচ্ছেদ বা রাষ্ট্রের কোন আইনকেই অসংশোধন যোগ্য - অলঙ্ঘনীয় হিসেবে হাজির করার এই এখতিয়ার আদৌ কোন সংসদের নেই, যে সংসদ মূলত একটি নির্দিষ্ট সময়ে, পরিস্থিতিতে এবং নির্দিষ্ট সময়কালের জন্যেই জনগণের ভোটে নির্বাচিত হন। ফলে, এরকম বিধান সংবিধানের মৌলিক কাঠামোরই পরিপন্থী বিধায় বাতিল যোগ্য হতে পারে।
তবে, সংবিধানের মৌলিক অধ্যায় সমূহের অনুচ্ছেদসমূহের পরিবর্তন, সংযোজন, রহিতকরণ - প্রভৃতি সংশোধনের প্রক্রিয়া জটিলতর করা যেতে পারে। সেক্ষেত্রে, মৌলিক অধ্যায়ের কোন অনুচ্ছেদের সংশোধনের ক্ষেত্রে সংসদের দুই-তৃতীয়াংশের ভোট এবং সাংবিধানিক আদালতে অনুমোদনের পরে গণভোটের বিধান রাখা যেতে পারে। অথবা, যেকোন সংশোধনী ও আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রেই - সংসদে গৃহীত হওয়ার পরে এবং সাংবিধানিক আদালতে অনুমোদনের পরে, এর বিরুদ্ধে যদি নির্দিষ্ট জনগণ (যেমন এক লক্ষ) স্বাক্ষর সংগ্রহ করতে পারে, তবে গণভোটের আয়োজন, এরকম বিধানও যুক্ত করা যেতে পারে।
খ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানসমূহ: নির্বাহী বিভাগ, আইন বিভাগ ও বিচার বিভাগ
বাংলাদেশ সংবিধানে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানসমূহের আলোচনা রয়েছে ৪র্থ ভাগ (নির্বাহী বিভাগ), ৫ম ভাগ (আইনসভা), ৬ষ্ঠ ভাগ (বিচার বিভাগ), ৭ম ভাগ (নির্বাচন), ৮ম ভাগ (মহা হিসাব-নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক) ও ৯ম ভাগ (বাংলাদেশের কর্মবিভাগ)-এ। সংবিধানের এই ক্রমটিতে আইনসভার আগে অবস্থান পেয়েছে, নির্বাহী বিভাগ। সংবিধানে আইন বিভাগের ওপরে নির্বাহী বিভাগকে শুধু স্থান দেয়া হয়নি নির্বাহী বিভাগকে সর্বময় ক্ষমতা দিয়ে, আইনবিভাগকে প্রায় ঠুঁটো জগন্নাথ করে রাখা হয়েছে। এছাড়া আইন শৃঙ্খলা বাহিনী, দুর্নীতি দমন কমিশনের মত গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান করা হয়নি।
১০। নির্বাহী বিভাগ
আমাদের সংবিধানে ‘রাষ্ট্রপতি’, ‘স্থানীয় শাসন’, ‘প্রতিরক্ষা কর্মবিভাগ’ ও ‘অ্যাটর্ণি জেনারেল’ পরিচ্ছেদ নির্বাহী বিভাগের অধীনে রাখা হয়েছে। ফলে, তারা কেন্দ্রীয় সরকারের (মন্ত্রিসভার) তথা নির্বাহী ক্ষমতার অধিকারী হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতাবলয়ের অধীনে অবস্থান করে। স্থানীয় সরকার কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণে ও তার ওপরে নির্ভরশীল থাকায়, এবং স্থানীয় সংসদ সদস্যদের ক্ষমতার বলয়ের অধীনে থাকায়, আমাদের স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাই গড়ে উঠতে পারেনি। আইন শৃঙ্খলা বাহিনী, জনপ্রশাসন - এ দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান সংবিধানে স্থান পায়নি, তারাও মূলত কেন্দ্রীয় সরকারেরই অধীনস্ত প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করে।
১০। রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা
যদিও সংবিধানের ৪৮(১) ও ৪৮(২) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে যে, “বাংলাদেশের একজন রাষ্ট্রপতি থাকবেন, যিনি আইন অনুযায়ী সংসদ-সদস্যগণ কর্তৃক নির্বাচিত হবেন এবং রাষ্ট্রপ্রধানরূপে রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের অন্য সকল ব্যক্তির ঊর্ধ্বে স্থান লাভ করিবেন”, তথাপি মূলত আমাদের সংবিধান অনুযায়ী সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তি হচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী। বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রধানে নিয়োগের দায়িত্ব বা ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির হাতে থাকলেও, সংবিধানের ৪৮(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রিপতির যাবতীয় ক্ষমতাকে বস্তুত প্রধানমন্ত্রী হাতে হস্তান্তর করা হয়েছে। এই অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, “এই সংবিধানের ৫৬ অনুচ্ছেদের (৩) দফা অনুসারে কেবল প্রধানমন্ত্রী ও ৯৫ অনুচ্ছেদের (১) দফা অনুসারে প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্র ব্যতীত রাষ্ট্রপতি তাঁহার অন্য সকল দায়িত্ব পালনে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী কার্য করিবেন”।
এভাবে রাষ্ট্রপতির সকল ক্ষমতা বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর হাতেই ন্যস্ত করা হয়েছে এবং রাষ্ট্রপতি পদটি কার্যত একটি আলংকারিক পদে পরিণত হয়েছে। ফলে, ৪৮(৩) অনুচ্ছেদ রেখে ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা করা সম্ভব নয়। সংবিধানের ৫৫ ও ৫৬ অনুচ্ছেদ অনুসারে, প্রজাতন্ত্রের নির্বাহী ক্ষমতার অধিকারী প্রধানমন্ত্রী সময়ে সময়ে যেরূপ স্থির করবেন, সেরূপ অন্যান্য মন্ত্রী, উপমন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী থাকবেন, যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রী নিয়োগ দিবেন রাষ্ট্রপতি। একদিকে ৫৫(৩) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, “মন্ত্রিসভা যৌথভাবে সংসদের নিকট দায়ী থাকিবেন”, অন্যদিকে ৫৮(২) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, “প্রধানমন্ত্রী যে-কোন সময়ে কোন মন্ত্রীকে পদত্যাগ করিতে অনুরোধ করিতে পারিবেন এবং উক্ত মন্ত্রী অনুরূপ অনুরোধ পালনে অসমর্থ হইলে তিনি রাষ্ট্রপতিকে উক্ত মন্ত্রীর নিয়োগের অবসান ঘটাইবার পরামর্শ দান করিতে পারিবেন”। এভাবে মন্ত্রিসভাকে বস্তুকে জাতীয় সংসদের নয়, প্রধানমন্ত্রীর ক্রীড়ানকে পরিণত করা হয়েছে।
রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী উভয়ের নিয়োগ হয় সংসদের মাধ্যমে। অনুচ্ছেদ ৪৮(১) অনুযায়ী, “বাংলাদেশের একজন রাষ্ট্রপতি থাকিবেন, যিনি আইন অনুযায়ী সংসদ-সদস্যগণ কর্তৃক নির্বাচিত হইবেন” এবং অনুচ্ছেদ ৫৬(৩) অনুযায়ী, “যে সংসদ-সদস্য সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের আস্থাভাজন বলিয়া রাষ্ট্রপতির নিকট প্রতীয়মান হইবেন, রাষ্ট্রপতি তাঁহাকে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করিবেন”। বস্তুত প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ রাষ্ট্রপতি করবেন বলা হলেও সেটি কেবল আনুষ্ঠানিকতা, কেননা জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যে সংসদ সদস্য (সাধারণত নির্বাচনে বিজয়ী রাজনৈতিক দলের প্রধান) সংখ্যাগরিষ্ঠ সংসদ সদস্যের আস্থা অর্জন করতে পারবেন, তাকেই রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দিবেন। অন্যদিকে রাষ্ট্রপতির নিয়োগের ক্ষেত্রে সংসদের কথা বলা হলেও, তিনি জনগণের ভোটে নির্বাচিত কোন সংসদ সদস্য নন, এই মনোনায়ন সিদ্ধান্ত নেয় মূলত সরকার গঠন করা রাজনৈতিক দল বা দলসমূহই, বলতে গেলে প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং, যদি তার দলের সংসদে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকে। অন্যদিকে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর অপসারণের ক্ষমতাও সংসদের ঘাড়ে থাকলে, এক্ষেত্রে পার্থক্য হচ্ছে - রাষ্ট্রপতিকে অভিসংশনের সিদ্ধান্ত সংসদের হাতে থাকলেও, সংসদের কর্তৃত্ব যেহেতু প্রধানমন্ত্রীর হাতে (অনুচ্ছেদ ৭০ এর মাধ্যমে), সেহেতু রাষ্ট্রপতির নিয়োগ ও অপসারণ উভয়ের সিদ্ধান্ত প্রধানমন্ত্রী নিতে পারেন। কিন্তু, সংবিধান অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী নিজে পদত্যাগ না করা পর্যন্ত (বা অন্য দেশে পলায়না না করা পর্যন্ত), মন্ত্রিসভা ও সংসদ সদস্যরা নিজেদের পদ অক্ষুন্ন রেখে প্রধানমন্ত্রীকে অপসারণ করতে পারবেন না। ৫৭ (২) অনুচ্ছেদে আছে, “সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের সমর্থন হারাইলে প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করিবেন কিংবা সংসদ ভাংগিয়া দিবার জন্য লিখিতভাবে রাষ্ট্রপতিকে পরামর্শ দান করিবেন এবং তিনি অনুরূপ পরামর্শদান করিলে রাষ্ট্রপতি, অন্য কোন সংসদ-সদস্য সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের আস্থাভাজন নহেন এই মর্মে সন্তুষ্ট হইলে, সংসদ ভাংগিয়া দিবেন”। ৫৭ (৩) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, “প্রধানমন্ত্রীর উত্তরাধিকারী কার্যভার গ্রহণ না করা পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীকে স্বীয় পদে বহাল থাকিতে এই অনুচ্ছেদের কোন কিছুই অযোগ্য করিবে না”। অর্থাৎ, প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে যদি অনাস্থা প্রস্তাব সংখ্যাগরিষ্ঠ সংসদ সদস্যের ভোটে জয়যুক্ত হয়, তাহলে প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রপতির মাধ্যমে পুরো সংসদই ভেঙ্গে দিতে পারবেন, এবং পরবর্তী নির্বাচনের আগ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করে যেতে পারবেন! ফলে, এই সংবিধানে স্বাভাবিক পন্থায় একই জাতীয় সংসদের অধীনে প্রধানমন্ত্রী পরিবর্তনের উপায় রাখা হয়নি। এভাবেই প্রধানমন্ত্রীকে মন্ত্রিসভা, রাষ্ট্রপতি, আইনসভার ওপরে এবং রাষ্ট্রপতির মাধ্যমে সকল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানসমূহের ওপরে অপার ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে। আর, কোনভাবে যদি প্রধানমন্ত্রী সংসদের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা (দুই তৃতীয়াংশ) পেয়ে নির্বাচিত হয়ে যান, তাহলে আমাদের সংবিধান অনুযায়ীই সবচেয়ে বড় স্বৈরশাসকের চাইতেও বেশি ক্ষমতার অধিকারী হয়ে যান।
১১। সংসদ/ আইনসভা
আমাদের সংসদীয় গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হচ্ছে, আমরা সংসদকে জনগণের প্রতিনিধিরূপে সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী হিসেবে গড়ে তুলতে পারিনি, অথচ সংসদ সদস্যরা, বিশেষ করে সরকার দলীয় সংসদ সদস্যরা সংসদের বাইরে সারা দেশের এলাকা বা আসনগুলোতে প্রভূত ক্ষমতা চর্চার সুযোগ পেয়ে যান। অথচ হওয়ার কথা ছিল উল্টোটা। একজন সংসদ সদস্য হচ্ছেন আইন সভার সদস্য, যে আইনসভা বা সংসদ জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে সরকারের ওপরে ও বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ওপরে একটা নজরদারি ও দেখভালের সংস্থা হিসেবে কাজ করবে এবং জনগণের প্রয়োজনে আইন প্রণয়ন বা সংশোধন করবে, রাষ্ট্র পরিচালনার যাবতীয় নীতি প্রণয়ন করবে ও বাজেট পর্যালোচনা পূর্বক অনুমোদন দিবে। এমন সংসদ যে আমরা কখনোই প্রতিষ্ঠা করতে পারিনি, তার বীজ আমাদের সংবিধানেই রয়েছে। এই সংবিধানই একজন সংসদ সদস্যকে নিজ এলাকায় বা আসনে ব্যাপক ক্ষমতার অধিকারী করে, আর সংসদের ভিতরে ক্ষমতাহীন বা একদম ঠুঁটো জগন্নাথ করে রাখার ব্যবস্থা করেছে। আমাদের সংবিধানের পঞ্চম ভাগ (আইনসভা) এর ৭০ অনুচ্ছেদে আছে, "কোন নির্বাচনে কোন রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরূপে মনোনীত হইয়া কোন ব্যক্তি সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হইলে তিনি যদি- (ক) উক্ত দল হইতে পদত্যাগ করেন, অথবা, (খ) সংসদে উক্ত দলের বিপক্ষে ভোটদান করেন, তাহা হইলে সংসদে তাঁহার আসন শূন্য হইবে, তবে তিনি সেই কারণে পরবর্তী কোন নির্বাচনে সংসদ-সদস্য হইবার অযোগ্য হইবেন না"। এই অনুচ্ছেদটি সংসদকে ক্ষমতাহীন ও অকার্যকরই কেবল করেনি, সংসদ সদস্যদের দলীয় বা জোটপ্রধানের অনুগত - আজ্ঞাবহ - তাঁবেদার বানানোর মাধ্যমে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলপ্রধান বা জোটের প্রধান তথা প্রধানমন্ত্রীকেই নিরঙ্কুশ ক্ষমতার অধিকারী করেছে।
১২। ন্যায়পাল
সংবিধানের ৭৭(১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, "সংসদ আইনের দ্বারা ন্যায়পালের পদ-প্রতিষ্ঠার জন্য বিধান করতে পারবেন"। অর্থাৎ ন্যায়পালের মত গুরুত্বপূর্ণ পদের প্রতিষ্ঠাকে সংসদের জন্যে ঐচ্ছিক করা হয়েছে! ৭৭(২) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, "সংসদ আইনের দ্বারা ন্যায়পালকে কোন মন্ত্রণালয়, সরকারী কর্মচারী বা সংবিধিবদ্ধ সরকারী কর্তৃপক্ষের যে কোন কার্য সম্পর্কে তদন্ত পরিচালনার ক্ষমতাসহ যেরূপ ক্ষমতা কিংবা যেরূপ দায়িত্ব প্রদান করবেন, ন্যায়পাল সেইরূপ ক্ষমতা প্রয়োগ ও দায়িত্ব পালন করবেন"। মন্ত্রণালয়, সরকারী কর্মচারী বা সংবিধিবদ্ধ সরকারী কর্তৃপক্ষকেও সংসদের নজরদারি ও জবাবদিহিতার ভেতরে নিয়ে আসার এই জরুরী কাজটিকে ঐচ্ছিক করে রাখায়, গত ৫২ বছরেও ন্যায়পাল নিয়োগ করা হয়নি।
১৩। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা
বিগত ফ্যাসিবাদী শাসন ব্যবস্থা কায়েমে সরকার সবচেয়ে বেশী ভর করেছে বিচার বিভাগের উপরে। সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী উচ্চ আদালতে বাতিল করাকে কেন্দ্র করে তৎকালীন সরকারের নিয়োগপ্রাপ্ত ও এককালের অনুগত প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহাকে দেশ থেকে বিতাড়িত হতে হয়েছিলো। এরপরে তিনি জানিয়েছেন, এক সময়ে প্রতিটা রায়ই আসতো গণভবন থেকে। বিচারবিভাগের উপরে ভর করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করা হয়েছিলো, একইভাবে কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময়েও বিচার বিভাগের উপরে ভর করে পার পাওয়ার চেস্টা করেছিলো বিগত ফ্যাসিবাদী সরকার। পরিস্কারভাবেই বুঝা যাচ্ছে, আমাদের বিচার বিভাগ কোনভাবেই স্বাধীন নয়। সংবিধানের দ্বিতীয়ভাগ (রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি) এর ২২ নাম্বার অনুচ্ছেদে আছে, "রাষ্ট্রের নির্বাহী অঙ্গসমূহ হইতে বিচারবিভাগের পৃথকীকরণ রাষ্ট্র নিশ্চিত করিবেন"৷ অথচ সংবিধানের চতুর্থভাগ (নির্বাহী বিভাগ) এর প্রথম পরিচ্ছেদ হচ্ছে রাষ্ট্রপতি, অর্থাৎ সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি স্বয়ং নির্বাহী বিভাগের অংশ। তাহলে, সংবিধানের ৯৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রধান বিচারপতি ও সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের নিয়োগ রাষ্ট্রপতির হাতে থাকলে কিভাবে বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে পৃথক বলা সম্ভব? এই রাষ্ট্রপতির নিয়োগ যেখানে জাতীয় নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের হাতে থাকে এবং রাষ্ট্রপতি প্রধান বিচারপতির নিয়োগ ভিন্ন সকল কাজেই প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ মানতে বাধ্য?
আমাদের বিচার বিভাগ যে একেবারেই স্বাধীন নয়, তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ মিলে, যেকোন রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের সময়ে, যখন একাধারে বিভিন্ন মামলায় আটক থাকা বা সাজা পাওয়া বন্দীদের একের পর এক মুক্তি মিলতে থাকে। অর্থাৎ, সরকার পরিবর্তন হলে, তথা নির্বাহী বিভাগের পরিবর্তনের সাথে সাথেই একই বিচার বিভাগ যাদেরকে আগে জেলে ঢুকিয়েছিলো, নিজেদের রায় বা বিচার বদলে দিয়েই কি মুক্ত করে দিচ্ছে না? (রাজনৈতিক পট পরিবর্তন হলে) কেবল নির্বাহী বিভাগ পরিবর্তনের সাথে সাথেই কখনো কখনো বিচারকদের মাঝেও অদল-বদল হয়ে যাচ্ছে। এসবই আসলে নির্দেশ করে, আমাদের বিচার বিভাগ প্রচণ্ডভাবেই নির্বাহী বিভাগের উপরে নির্ভরশীল বা পরাধীন। বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারও শপথ গ্রহণের আগেই অন্যায়ভাবে আটককৃত আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের মুক্তি প্রদানের পাশাপাশি যেভাবে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সাজাপ্রাপ্ত নেতাকর্মী (তাদের কেউ কেউ রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়ে মিথ্যা মামলায় বন্দী ছিলেন) ও চিহ্নিত অপরাধীদেরকে মুক্তি দেয়া হয়েছে, নিষিদ্ধ ও জঙ্গী সংগঠনের অপরাধীরাও মুক্ত হয়েছে (পক্ষান্তরে দেশজুড়ে একটা ত্রাসের রাজত্ব তৈরি করতে দেয়া হয়েছে), তাতেও পরিস্কার হয় যে, এখনো এই বিচার বিভাগ স্বাধীন নয়।
সংবিধানের ষষ্ঠ ভাগ (বিচার বিভাগ) এর ২য় পরিচ্ছেদ (অধস্তন আদালত) এর ১১৫ ও ১১৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, "বিচারবিভাগীয় পদে বা বিচার বিভাগীয় দায়িত্বপালনকারী ম্যাজিস্ট্রেট পদে"ও রাষ্ট্রপতি নিয়োগদান করতে পারেন এবং "বিচার-কর্মবিভাগে নিযুক্ত ব্যক্তিদের এবং বিচারবিভাগীয় দায়িত্বপালনে রত ম্যাজিস্ট্রেটদের নিয়ন্ত্রণ (কর্মস্থল- নির্ধারণ, পদোন্নতিদান ও ছুটি মঞ্জুরীসহ) ও শৃংখলাবিধান" এর দায়িত্ব বা ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির হাতে ন্যস্ত করা হয়েছে (এবং এসবই তিনি প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ মোতাবেক করবেন)। এই নিয়োগগুলোর মাধ্যমে দলীয় ও আজ্ঞাবহ আইনজীবীদের বিচারিক দায়িত্ব দেয়া সম্ভব হয়, পদোন্নতি সহ বিভিন্ন সুবিধালাভের কারণে বিচারকরাও সরকারের সুনজরে থাকার চেস্টায় লিপ্ত হতে পারেন। দ্বিতীয়ত, সুপ্রিমকোর্টের বিচারকদের অপসারণ জাতীয় সংসদের দুই তৃতীয়াংশ সদস্যের হাতে যাওয়ার মাধ্যমে, সেই সংসদে যদি কোন দলের দুই তৃতীয়াংশ আসন থাকে ও ৭০ অনুচ্ছেদের মাধ্যমে সকলে প্রধানমন্ত্রীর আজ্ঞাবহ হন, এটিও প্রধান বিচারপতি ও সুপ্রিম কোর্টের বিচারকগণকে অপসারণের ভয়ে সরকারের আজ্ঞাবহ করতে পারে। এমনকি, এমনও ঘটেছে যে, দুর্নীতি বা পূর্বতন কোন অপরাধের রেকর্ড যুক্ত কোন বিচারককে হাইকোর্ট বা আপিল বিভাগের বিচারক বা প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দেয়ার মাধ্যমে সেই বিচারকদের সুতাটা সরকার নিজের হাতেই রেখে দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করেছে!
অধস্তন আদালতের নিয়োগ ও নিয়ন্ত্রণ সুপ্রিম কোর্টের হাতে থাকাই বাঞ্ছনীয়। প্রধান বিচারপতি ও উচ্চ আদালতের বিচারকগণের নিয়োগের ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির কাছ থেকে সরানো অথবা রাষ্ট্রপতি পদটিকে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শের আওতামুক্ত ও সরকারী দলের সম্পূর্ণ প্রভাব মুক্ত করা জরুরী। আপিল বিভাগ কর্তৃক ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় কার্যকর হলে বিচারকের অপসারণের দায়িত্ব সংসদের হাত থেকে পুনরায় সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের কাছে চলে যাবে।
১৪। নির্বাচন
নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে স্বৈরাচার সরকারের পতনের পরে গণতন্ত্রের যে পথচলা শুরু হলো, তা মুখ থুবড়ে পড়ার সবচেয়ে বড় কারণ হচ্ছে, নির্বাচন ব্যবস্থাকে ক্ষমতাসীন দল প্রভাবিত করার মাধ্যমে নির্বাচনের ফলকে নিজের পক্ষে আনার চেস্টা করে গিয়েছে। প্রথম দফাতেই এরকম কারচুপির নির্বাচনের কারণ হিসেবে শাসন ক্ষমতায় থাকা দলীয় সরকারকে দায়ী করে একটা নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের সমাধান বের করা হয়। কিন্তু একটা সময়ে দেখা যায়, সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপরিকে প্রধান করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের আগেই দলীয় বিবেচনায় প্রধান বিচারপতি নিয়োগের মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারকেও প্রভাবিত করার চেস্টা শুরু হয় এবং এক পর্যায়ে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে কে দায়িত্ব পালন করবেন সে ব্যপারে একমত হতে না পারায়, সংঘাতময় পরিস্থিতি তৈরি হয়। ফলশ্রুতিতে সামরিক প্রভাবিত এক সিভিল সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করে। এভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাও যে প্রকৃত সমাধান নয়, সেই বিষয়টি বুঝা যায়, কিন্তু দলীয় সরকারের অধীনে নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও সুষ্ঠু নির্বাচন করা যে সম্ভব সেই আস্থাও জনগণের মধ্যে ও বিরোধীদলগুলোর মাঝে তৈরি হয়নি। এরপরের ক্ষমতাসীন দলটি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠন করেই সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশনাকে নিজেদের মত করে ব্যবহার করে এই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকেই সংবিধান থেকে তুলে দেয়ার মাধ্যমে ফ্যাসিবাদী চেহারা নিয়ে আবির্ভূত হয়। দলীয় সরকারের অধীনে পরপর তিন বার একতরফা ভোটচুরির নির্বাচন করে ক্ষমতায় আঁকড়ে ধরে থাকে। এভাবেই ত্রুটিপূর্ণ নির্বাচন ব্যবস্থার মধ্য দিয়েই আসলে আমাদের গণতান্ত্রিক চর্চা দূরীভূত হয়ে সেখানে স্বৈরতান্ত্রিক শাসন জনগণের উপরে জেঁকে বসে। ফলে, স্বৈরতন্ত্রকে চিরতরে বিলোপ করার জন্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, এমন একটি স্বাধীন, প্রভাবমুক্ত ও শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন ও নির্বাচন ব্যবস্থা, যেটি যেকোন সরকারের অধীনেই সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ নির্বাচন করতে সক্ষম হবে। সে লক্ষে সংবিধানে পরিবর্তন আনা জরুরী।
নির্বাচন কমিশন শক্তিশালী করার জন্যে নির্বাচন কমিশনের গঠনের ক্ষেত্রে ১১৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নির্বাচন কমিশনার নিয়োগে রাষ্ট্রপতির মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর প্রভাবকে দূর করা আবশ্যক। অনুচ্ছেদ ১২৬ অনুযায়ী নির্বাচনকালীন সময়ে নির্বাচন কমিশনের দায়িত্বপালনে সহায়তা করা সকল নির্বাহী কর্তৃপক্ষের কর্তব্য বলার মাধ্যমে নির্বাচন কমিশনকে নির্বাহী বিভাগের সহায়তায় চলা প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা হয়েছে। নির্বাচনকালীন সময়ে নির্বাচন কমিশনকে রাষ্ট্রের নির্বাহী ক্ষমতার অধিকারী করা না গেলে, শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন গড়ে তোলা সম্ভব নয়। এছাড়াও, বর্তমানের আসনকেন্দ্রিক নির্বাচন পদ্ধতির মাধ্যমে একটি দলের একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা, এমনকি অর্ধেকেরও কম ভোট পেয়েও নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করতে পারে, যা সরকারী দলকে প্রভূত ক্ষমতার অধিকারী করে। ফলে, এহেন নির্বাচনী পদ্ধতি পরিবর্তনের বিষয়েও জাতীয় ঐক্য প্রয়োজন।
১৫। দুর্নীতি দমন কমিশন
বাংলাদেশের মত দুর্নীতিপ্রবণ একটি দেশে দুর্নীতি নির্মূলে দুর্নীতি দমন কমিশনের ভূমিকা ব্যাপক! অথচ, দুর্নীতি দমন কমিশনের কথা আমাদের সংবিধানে উল্লেখিত হয়নি। দুর্নীতি দমন কমিশন আইন ২০০৪ এর ঘাটতি দূর করতে সংশোধন যেমন দরকার, একই সাথে আমাদের সংবিধানেও দুর্নীতি দমন কমিশন শীর্ষক ভাগ যুক্ত করা যেতে পারে। দুর্নীতি দমন কমিশনকেও স্বাধীন, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে ও একই সাথে এর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে একে প্রয়োজনীয় অনুচ্ছেদ সংবিধানে সংযুক্ত করা যেতে পারে।
উপসংহার
আমাদের অগণতান্ত্রিক সংবিধানই যে ফ্যাসিবাদের বীজ ধারণ করে, সে বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। ফলে আমাদের রাষ্ট্রীয় কাঠামো থেকে ফ্যাসিবাদ - স্বৈরতন্ত্রকে নির্মূল করতে এই সংবিধানের পরিবর্তন তথা সম্পূর্ণ বাতিল করে নতুন সংবিধান প্রণয়ন বা সংশোধন বা পুনর্লিখন আবশ্যক। সে লক্ষে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সংবিধান কমিশন কাজও শুরু করেছে। এক্ষেত্রে, আমাদের সামনে রয়েছে ১৯৭২ সালে লিখিত ও ১৭ বার সংশোধিত সংবিধান এবং সেই সংবিধান প্রণয়নের ইতিহাস। বর্তমান সংবিধানের সমস্যা-সংকটগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যালোচনা যেমন জরুরি, তেমনি দরকার ইতিহাসের দিকেও আলো ফেলা। ১৯৭২ সালে সংবিধান প্রণয়নের ক্ষেত্রে যে ভুলগুলো করা হয়েছিলো, যে অগণতান্ত্রিক ও স্বৈরতান্ত্রিক উপায় অবলম্বন করা হয়েছিল, সেসবের পুনরাবৃত্তি একেবারেই কাম্য নয়। তাই, সংবিধান প্রণয়নের জন্যে কোন রকম তড়িঘড়ি না করে, ব্যাপক অংশের মানুষের অংশগ্রহণে, বিভিন্ন জাতি - ধর্ম - লিঙ্গের প্রতিনিধিদের অন্তর্ভূক্তি নিশ্চিত করে, সর্বস্তরে ব্যাপক আলাপ-আলোচনা ও তর্ক-বিতর্ককে পাথেয় করেই নতুন সংবিধান প্রণয়নের উদ্যোগ নেয়া জরুরী। এক্ষেত্রে, বিভিন্ন মত পথকে ভয় পেয়ে ও এড়িয়ে, অল্প কিছু মানুষ মিলে যত ভালো সংবিধানই লিখা হোক না কেন, সেটি দীর্ঘস্থায়ী বিভক্তি ও সংঘাতকে উসকে দিতে পারে। ন্যুনতম ঐক্যের ভিত্তিতে নতুন সংবিধান গ্রহণ করার সবচেয়ে গণতান্ত্রিক ও বৈধ পথ নিলেই, এই পরিবর্তন স্থায়িত্ব পেতে পারে।
মূল প্রবন্ধঃ অনুপম সৈকত শান্ত, রাহাত মুস্তাফিজ, তন্ময় কর্মকার ও মতিউর রহমান
প্রবন্ধ উপস্থাপনঃ তন্ময় কর্মকার
আলোচকঃ সারা হোসেন, হাসনার কাইয়ূম, জাহেদ উর রহমান ও সাইমী ওয়াদুদ
সঞ্চালকঃ রাহাত মুস্তাফিজ