গণতন্ত্র-ওয়েবসভা ৪: শ্রম আইন ২০০৬ : মালিকের না শ্রমিকের?
বাংলাদেশের শ্রম আইন : মালিকের না শ্রমিকের?
শামীম ইমাম
ভূমিকা
ছাত্র সমাজের নেতৃত্বে জনগণের সম্মিলিত অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে ছাত্র-শ্রমিক-জনতার রক্তাক্ত গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটেছে। বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের যৌক্তিক দাবির সাথে জনজীবনের সংকট, লুটপাট, দুর্নীতি, ব্যাংক লোপাট, অর্থপাচার, দমন-নিপীড়নসহ বিগত প্রায় ১৬ বছরের দুঃশাসনে বিক্ষুব্ধ জনগণ এ থেকে মুক্তির আকাঙ্ক্ষায় গণঅভ্যুত্থানের স্রোতধারায় মিলিত হওয়ায় এই ফ্যাসিবাদী দুঃশাসকের পরাজয় ঘটে । বিগত ফ্যাসিবাদী শাসনামলে দেশের বাম, প্রগতিশীল ও গণতান্ত্রিক দল-সংগঠনসমূহের স্বৈরশাসন বিরোধী আন্দোলন-সংগ্রামও এক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে।
ছাত্র জনতার রক্তাক্ত গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় আসা অন্তর্বর্তী সরকারের ঘাড়ে রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক সংস্কারসহ একটি অবাধ ও সুষ্ঠ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে নির্বাচিত সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করা গুরুদায়িত্ব। একদিকে সংস্কারের লক্ষ্যে শ্রম সংস্কার কমিশন সহ ১০টি কমিশন গঠন করা হয়েছে এবং কমিশনগুলি কাজও শুরু করে দিয়েছে - অন্যদিকে সরকার দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হচ্ছে, নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের সীমাহীন মূল্যবৃদ্ধিতে জনগণের নাভিশ্বাস অবস্থা। এমত অবস্থায় গার্মেন্টস, ওষুধ সহ বিভিন্ন শিল্পের শ্রমিকেরা তাদের বকেয়া বেতন-ভাতা পরিশোধ, বাজার দরের সাথে সঙ্গতি রেখে মজুরি বৃদ্ধি সহ ন্যায়সঙ্গত কয়েকটি দাবিতে আন্দোলন করতে বাধ্য হয়। গার্মেন্টস শ্রমিকদের ১৮ দফা দাবির প্রেক্ষিতে শ্রমিক - মালিক - সরকার এর ত্রিপক্ষীয় বৈঠকে শ্রম আইন সংস্কার, ন্যূনতম মজুরি পুনর্মূল্যায়নের আশ্বাস সহ ১৮ দফা মেনে নেয়ার ঘোষণা দেয়া হয়। কিন্তু বাস্তবে বিভিন্ন কারখানায় মালিকরা শ্রমিকদের দাবি মানতে গড়িমসি করায় শ্রমিকরা পেটের দায়ে রাজপথে আন্দোলন অব্যাহত রাখলে যৌথ বাহিনী দিয়ে তাদের উপর গুলি চালানা হয়। ইতিমধ্যে যৌথ বাহিনীর গুলিতে কাউসার হোসেন খান (২৭) ও চম্পা খাতুন (২২) নামে ২ জন শ্রমিক শহীদ হয়েছেন, আহত হয়েছেন শতাধিক শ্রমিক। গার্মেন্টস শ্রমিকসহ অজ্ঞাতনামা নামে মিথ্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে, গ্রেপ্তার করা হয়েছে অনেককে। অতীতের স্বৈরাচারী সরকারের মতো “ষড়যন্ত্র তত্ত্ব” হাজির করে শ্রমিকদের যৌক্তিক ন্যায়সঙ্গত আন্দোলনকে কালিমালিপ্ত করাসহ দমন-নিপীড়ন জারি রয়েছে। শ্রমিকরা অবাধ ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার, তথা বাক ও ব্যক্তিস্বাধীনতা, সংগঠন-সংগ্রাামের অধিকারসহ গণতান্ত্রিক অধিকার এখনো ফিরে পায় নাই। আমাদের দেশে কোন জাতীয় ন্যূনতম মজুরি নাই। আলাদাভাবে ৪৩টি সেক্টরে ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করা আছে। গার্মেন্টস শ্রমিকেরা ন্যূনতম মজুরি দাবি করেছিলেন ২৫ হাজার টাকা, অথচ বিগত সরকার শ্রমিকদের জীবন-জীবিকার ব্যয়ের বিষয়টি তোয়াক্কা না করে ন্যূনতম মজুরি সাড়ে ১২ হাজার টাকা নির্ধারণ করে মালিকদের স্বার্থ রক্ষা করেছিল এবং অনেক গার্মেন্টসের শ্রমিকরা এরও কম মজুরি পান।
অতীত অভিজ্ঞতায় একথা স্পষ্ট যে, একটা স্বৈরাচারী সরকারের উচ্ছেদের পর কেবল একটি নির্বাচন হলেই সংকটের সমাধান হবে না। ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থা পুনরায় যাতে ফিরে না আসে তার জন্য দরকার শোষণ-বৈষম্যহীন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থা। দেশের মেহনতি মানুষের অধিকার নিশ্চিত করা ছাড়া রাষ্ট্রের প্রকৃত গণতান্ত্রিক রূপান্তর সম্ভব না।
‘শ্রম আইন’ হচ্ছে শ্রমিক ও তার নিয়োগকর্তা মালিকের অধিকার ও বিধিনিষেধ সংক্রান্ত আইন (Labor law defines your rights and obligations as workers and employers)। শ্রমকে সুসংগঠিত, সুশৃঙ্খল, গতিশীল ও উৎপাদনশীল করা এই আইনের কাজ। শ্রম আইনের দুটো অংশ থাকে- ব্যক্তিক (individual) ও সমষ্টিগত (collective)। শ্রম আইনের ব্যক্তিক অংশের মূল লক্ষ্য হচ্ছে শ্রমিকের কর্মক্ষেত্রের নানা অধিকার, যেমন তার মজুরি, নিয়মিত মজুরি প্রদান, শ্রমঘন্টা, কর্মপরিবেশ তথা স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তাজনিত নিশ্চয়তা, কাজের নিশ্চয়তা ইত্যাদি। অন্যদিকে শ্রম আইনের সমষ্টিগত অংশের লক্ষ্য হচ্ছে শ্রমিকপক্ষ বা তাদের ইউনিয়ন, মালিকপক্ষ এবং সরকার - এই তিন পক্ষের সম্পর্ক। অর্থাৎ এই অংশে থাকে শ্রমিকদের সাথে মালিকের বিরোধ নিষ্পত্তির উপায়, শ্রমিকদের ইউনিয়ন করার অধিকার, মালিকের লক আউট, ইত্যাদি। মালিক চায় শ্রমিকের নিরবচ্ছিন্ন কাজ, যাতে তার উৎপাদন অব্যাহত থাকে এবং মুনাফা অর্জন করতে পারে। আর, শ্রমিক চায় যে পরিশ্রম দিয়ে মালিকের মুনাফা নিশ্চিত করছে, তার বিনিময়ে এমন একটা মজুরির নিশ্চয়তা, যার মাধ্যমে সে পরিবার নিয়ে খেয়ে-পরে একটা মর্যাদা সম্পন্ন জীবন যাপন করতে পারে, একই সাথে যেখানে সে কাজ করছে সেখানকার কর্ম পরিবেশ, নিরাপত্তা, প্রভৃতির নিশ্চয়তাও যেন থাকে। মালিক যেহেতু সবসময়ই অধিকতর মুনাফা চায়, এবং মুনাফা বৃদ্ধির জন্যে তার খরচ কমানো জরুরি, সেহেতু নানাভাবেই শ্রমিকের মজুরি কমিয়ে, কর্মপরিবেশ সহ শ্রমিকের নানা সুযোগ-সুবিধা কমিয়ে তার খরচ কমানোর চেষ্টা করে। এখানেই শুরু হয় মালিক-শ্রমিক দ্বন্দ্ব বা বিরোধ। সরকার বা রাষ্ট্র কি চায়? তা নির্ভর করে রাষ্ট্র ও শাসকগোষ্ঠীর শ্রেণিচরিত্রের ওপর। একটি পুঁজিবাদী রাষ্ট্র সাধারণভাবে মালিকশ্রেণির পক্ষে থাকলেও একটি গণতান্ত্রিক ও মানবিক রাষ্ট্র শ্রমিকের ন্যূনতম মৌলিক অধিকারগুলোকে অস্বীকারও করতে পারে না। তদুপরি রাষ্ট্রের বিপুল সংখ্যক মেহনতি মানুষের কাজের নিশ্চয়তা ও ভালো মজুরির নিশ্চয়তা জনগণের সম্মিলিত ক্রয় ক্ষমতা যেমন বাড়ায়, তেমনি রাষ্ট্রটির বাজার অর্থনীতিকেও চাঙ্গা রাখে। ফলে, মালিকশ্রেণির লাগামহীন মুনাফালোভ যখন শাসকগোষ্ঠীকে পেয়ে বসে, তখনই সরকারে থাকা রাজনৈতিক দল, ব্যবসায়িক সিণ্ডিকেট, আমলাতন্ত্র ও সামরিকতন্ত্র একবিন্দুতে মিলেই জুলুম-জবরদস্তির শাসনব্যবস্থা কায়েম করে, রাষ্ট্র হয়ে ওঠে নিপীড়নের যন্ত্র, উন্নয়নের বাহারি গল্পের আড়ালে চলে অবাধ লুটপাট আর অর্থ পাচার, এভাবেই জন্ম হয় ফ্যাসিবাদের। সে কারণেই , আমরা যদি রাষ্ট্রীয় কাঠামোর রন্ধ্রে রন্ধ্রে জিইয়ে থাকা ফ্যাসিবাদ নির্মূল করতে চাই - দেখা দরকার, আমাদের রাষ্ট্রের আইন, বিচার ব্যবস্থা, আইন শৃঙ্খলা বাহিনী কতখানি শ্রমিক বান্ধব! শ্রমিকের অধিকার নিশ্চিত করার মত কোন রাষ্ট্রীয় আয়োজন কি বিদ্যমান আছে আমাদের দেশে? আমাদের সংবিধানে ও শ্রম আইন ২০০৬-এ কি শ্রমিকের অধিকার রক্ষিত হয়েছে?
বাংলাদেশ সংবিধানে শ্রমিকের অধিকার
পাকিস্তান পর্বে সমস্ত গণতান্ত্রিক আন্দোলন থেকে শুরু করে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে শ্রমিকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ও ভূমিকা ছিল। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী যে আমাদের ওপর শোষণ চাপিয়ে দিয়েছে, তা আমরা অনুধাবন করতে পেরেছি তাদের অর্থনৈতিক শোষণ তথা আমাদের পাট চাষী ও পাটশ্রমিকের রক্ত ঘাম করা শ্রমের অর্থে পশ্চিম পাকিস্তানি ধনকুবেরদের ফুলে ফেপে ওঠা আর পশ্চিম পাকিস্তানের উন্নয়ন দেখেই। অথচ, রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা লাভের পরে সেই শ্রমিকদের কথা কি বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটি মনে রাখতে পেরেছে? নিদারুণ বাস্তবতা হচ্ছে, শ্রমিকদের অধিকার নিশ্চিত করার জন্যে একটি শ্রম আইন করতে করতেই আমাদের ৩৫ বছর লেগেছে, ততদিন চলেছে ঔপনিবেশিক বৃটিশ ও পাকিস্তান আমলের একই আইন দিয়ে। ১৯৭২ সালে যে স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়ন করা হয়েছে, সেখানে মৌলিক অধিকার নামক ভাগে শ্রমিকের কোন অধিকারের কথা বলা হয়নি। বস্তুত সমস্ত সংবিধানে “শ্রমিক” শব্দটি আছে একটি মাত্র অনুচ্ছেদে, সংবিধানের দ্বিতীয় ভাগ (রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি) এর ১৪ নাম্বার অনুচ্ছেদে (কৃষক ও শ্রমিকের মুক্তি)। এই অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, “রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব হইবে মেহনতী মানুষকে - কৃষক ও শ্রমিককে - এবং জনগণের অনগ্রসর অংশসমূহকে সকল প্রকার শোষণ হইতে মুক্তি দান করা৷” আমাদের মুক্তিযুদ্ধের আকাঙ্ক্ষাই ছিল পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের মুক্তি, সেই মুক্তি কেবল রাজনৈতিক মুক্তি নয়, অর্থনৈতিক মুক্তি, সাংস্কৃতিক মুক্তি - সকল প্রকার শোষণ-নিপীড়ন থেকে মুক্তি, সকল প্রকার বৈষম্য থেকে মুক্তি। সেই আকাঙ্ক্ষারই আক্ষরিক প্রতিফলন ঘটেছে এই অনুচ্ছেদে, কিন্তু এই আকাঙ্ক্ষাকে মূর্ত করার মত কোন বিধান না থাকায়, অর্থাৎ কৃষক-শ্রমিকের মুক্তি আসবে কোন পথে, তাদের কোন কোন অধিকারের স্বীকৃতি রাষ্ট্র দিচ্ছে বা কোন কোন অধিকার পূরণে রাষ্ট্র বাধ্য থাকবে, তার কোন উল্লেখ সংবিধানে না থাকায়, এই অনুচ্ছেদে থাকা শ্রমিকের মুক্তি কথাটি কেবল কথার কথাই হয়ে থাকেনি, গত ৫৩ বছর যাবত বাংলাদেশের শাসকগোষ্ঠীর প্রতারণার স্মারক হিসেবেও থেকেছে। ৮(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী দ্বিতীয় ভাগের রাষ্ট্রীয় মূলিনীতিসমূহ বলবৎকরণের জন্যে আদালতে যাওয়া যাবে না, এর ফলে এই ভাগে বলা রাষ্ট্রীয় দায়িত্বসমূহ রাষ্ট্র তথা সরকার সমূহের জন্যে ঐচ্ছিক হয়ে রয়েছে, অর্থাৎ এই ভাগের অর্পিত দায়িত্ব পালনে রাষ্ট্রকে বাধ্য করার উপায় রাখা হয়নি।
ফলে সংবিধানের ১৫ অনুচ্ছেদে জনগণের মৌলিক প্রয়োজনের (অন্ন, বস্ত্র, আশ্রয়, শিক্ষা ও চিকিৎসাসহ জীবনধারণের মৌলিক উপকরণের ব্যবস্থা, কর্মের অধিকার, সামাজিক নিরাপত্তার অধিকার প্রভৃতি) ব্যবস্থা করা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব হিসেবে বলা হলেও এগুলোর কোনটাই মৌলিক অধিকার ভাগে স্থান পায়নি, রাষ্ট্র দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে আদালতে যাওয়াও যাবে না। অনুচ্ছেদ ১৫(খ) এ বলা হয়েছে, “কর্মের অধিকার, অর্থাৎ কর্মের গুণ ও পরিমাণ বিবেচনা করিয়া যুক্তিসঙ্গত মজুরীর বিনিময়ে কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তার অধিকার।” একদিকে যুক্তিসঙ্গত মজুরির বিনিময়ে কর্মসংস্থানের অধিকার মৌলিক অধিকার ভাগে স্থান পায়নি, অন্যদিকে কর্মের গুণ ও পরিমাণ বিবেচনার কথা বলা হলেও পরিবার সহ খেয়ে পরে মর্যাদাপূর্ণ জীবন যাপনের জন্যে প্রয়োজনীয় ন্যূনতম মজুরির নিশ্চয়তার অধিকারও স্বীকার করা হয়নি। সংবিধানের ২৯ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কেবলমাত্র প্রজাতন্ত্রের কর্মে বা সরকারি চাকরিতে নিয়োগ ও পদলাভের ক্ষেত্রে ধর্ম, জাতি, জন্মস্থান ভেদে ও নারী-পুরুষভেদে বৈষম্য না থাকার কথা বা সমান সুযোগ প্রদানের কথা বলা হয়েছে, কিন্তু প্রজাতন্ত্রের কর্মের বাইরে তথা আধা-সরকারি, বেসরকারি কর্মে, বিভিন্ন বেসরকারি বা ব্যক্তিমালিকানাধীন শিল্প প্রতিষ্ঠান, কলকারখানায় নিয়োগ ও পদোন্নতিতে বৈষম্য দূরীকরণের কথা সংবিধানে বলা হয়নি। আর, সরকারি বা বেসরকারি কোন কর্মেই বেতন বৈষম্য দূরীকরণের কথা নেই। আমাদের নারী শ্রমিকরা বেতনভাতা ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে যে ভয়াবহ বৈষম্যের শিকার সেখান থেকে এই সংবিধান কোনরূপ সুরক্ষা দিতে পারে না।
শ্রম আইন ২০০৬
২০০৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে অষ্টম জাতীয় সংসদের শেষ অধিবেশনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকার শ্রম আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে গণতান্ত্রিক রীতিনীতি না মেনে বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬ নামের আইনটি (২০০৬ সনের ৪২ নং আইন) পাস করে। সংসদে বাংলাদেশ শ্রমবিল, ২০০৬ উত্থাপনের পূর্বে দেশের শ্রমিক আন্দোলনের সাথে সম্পর্কিত শ্রমিক সংগঠন, ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশন, শ্রমিক নেতৃবৃন্দের মতামত জানার জন্য, মতামত সংগঠিত করার জন্য নেয়া হয়নি প্রয়োজনীয় কার্যকর উদ্যোগ। মূলত শ্রমিক স্বার্থের পক্ষের গুরুত্বপূর্ণ কোনো সুপারিশও গ্রহণ করা হয়নি। সংগত কারণেই তখন চারদলীয় জোট সরকারের বাইরের শ্রমিক সংগঠন, ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশন ও ট্রেড ইউনিয়নগুলো এই আইনটিকে ‘অগণতান্ত্রিক শ্রম আইন’ হিসেবে আখ্যায়িত করে প্রত্যাখ্যান করে।
বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬ প্রকৃত অর্থে দেশের পূর্বেকার (এই শ্রম আইন অনুমোদনের আগ পর্যন্ত) শ্রম আইনগুলোর সংশোধিত, পরিবর্তিত ও সমন্বিত রূপ। এই সমন্বয়ের কাজটি ১৯৯২ সালে ‘শ্রম আইন কমিশন’-এর মাধ্যমে শুরু হয়। পূর্বেকার শ্রম আইন সম্পর্কিত আলাদা ২৭টি আইন রহিত করে তাদের সমন্বয়ে নতুন আইনটি প্রণয়ন করা হয়েছে। শ্রম আইন ২০০৬-এ মূলত কারখানা ও প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শ্রমিকদের চাকরির শর্তাবলি, ট্রেড ইউনিয়ন গঠন ও শিল্প বিরোধ নিষ্পত্তি, ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ ও মজুরি পরিশোধ, শ্রমিকের সামাজিক নিরাপত্তা, দুর্ঘটনা প্রতিরোধ ও ক্ষতিপূরণ প্রদান, শ্রম কল্যাণ, শিশুশ্রম, শিল্প পরিসংখ্যান সংগ্রহ, অভিবাসন, পরিবহন সেক্টর, সংবাদপত্র, চা বাগান, ডক, খনি, হোটেল-রেস্তোরাঁ, রফতানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা, রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পে নিয়োজিত শ্রমিকদের চাকরির শর্তাবলি ইত্যাদি সম্পর্কিত বিধান রয়েছে।
বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬ সংশোধনকল্পে আগের সরকারের ধারাবাহিকতায় কার্যত কোনো রীতিনীতি, নিয়ম-পদ্ধতি না মেনে বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পক্ষে রাষ্ট্রপতি ডিসেম্বর ২০০৭-এ বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬ সংশোধনী অধ্যাদেশ জারি করেন। ওই সংশোধনীটি ছিল স্থিতিশীল শ্রম পরিস্থিতি ও শিল্পের বিকাশকে অব্যাহত রাখা এবং সুশাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার পরিপন্থী। তখন যৌক্তিক কারণেই দেশের রাজনৈতিক দল, শ্রমিক সংগঠন, ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশন, শ্রমিক নেতৃবৃন্দের পক্ষ থেকে উক্ত সংশোধনী অধ্যাদেশ বাতিলের দাবি জানানো হয়। এই দাবিতে জোরালো শ্রমিক আন্দোলনের একপর্যায়ে তৎকালীন সরকার সংশোধনী অধ্যাদেশের পুরোটার পরিবর্তে একাংশ গেজেট আকারে প্রকাশ করতে বাধ্য হয়।
আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় এসে প্রচলিত শ্রম আইনের অগণতান্ত্রিক ধারাসমূহ বাতিল করে গণতান্ত্রিক শ্রম আইন প্রণয়নের লক্ষ্যে ‘শ্রম আইন সংশোধন কমিটি’ গঠন করে। এই কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত শ্রমিক সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে বেশ কয়েকটি সংশোধন প্রস্তাবও দেয়া হয়। আলাপ-আলোচনা ও সংশোধন প্রস্তাব নিয়ে বিতর্কের পরিপ্রেক্ষিতে শ্রম আইন সংশোধন কমিটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, কিছু সংশোধনী গ্রহণ করা হবে। অথচ সত্য হলো, শ্রমিক সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে দেয়া সংশোধনীগুলো গ্রহণ করা হয়নি, গ্রহণ করা হয়েছে মালিকদের পক্ষ থেকে দেয়া প্রস্তাব। অতীতের সরকারগুলোর মতো মহাজোট সরকারও প্রয়োজনীয় গণতান্ত্রিক রীতিনীতি না মেনে স্বৈরতান্ত্রিকভাবে ১৫ জুলাই ২০১৩ বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬-এর সংশোধনী প্রস্তাব জাতীয় সংসদে পাস করে এবং ২২ জুলাই বাংলাদেশ শ্রম (সংশোধন) আইন, ২০১৩ নামে গেজেট আকারে প্রকাশ করে। অথচ আওয়ামী লীগ বিগত ২০০৮ সালের নির্বাচনে তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে ওয়াদা করেছিল, আইএলও কনভেনশন অনুযায়ী একটি গণতান্ত্রিক শ্রম আইন প্রণয়ন করবে।
মহাজোট সরকারের ‘বাংলাদেশ শ্রম (সংশোধন) আইন, ২০১৩’ গেজেট আকারে প্রকাশের পর দেশের রাজনৈতিক দল, শ্রমিক সংগঠন, ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশন ও শ্রমিক নেতৃবৃন্দের পক্ষ থেকে এই আইনের শ্রমিক ও শিল্পস্বার্থ বিরোধী অগণতান্ত্রিক ধারাসমূহ বাতিলের দাবি জানানো হয়েছে। বিশ্বব্যাপীও সমালোচিত হয়েছে মহাজোট সরকারের পাস করা এই শ্রম (সংশোধন) আইন। বিশ্বের ১৫৩ দেশের ৩০৮টি সংগঠনের এফিলিয়েটেড সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড ইউনিয়ন কনফেডারেশন (আইটিইউসি) সংশোধিত শ্রম আইনের সমালোচনা করে বলেছে, সংশোধিত শ্রম আইন আন্তর্জাতিক মানের অনেক নিচে অবস্থান করছে। ট্রেড ইউনিয়নবিরোধী মনোভাবের কারণে আইনের মধ্যে থেকেই সংগঠিত হওয়ার সুযোগ থেকে শ্রমিকদের বঞ্চিত করা সহজ হবে। এছাড়া অন্য আরও শ্রমিক ও মানবাধিকার শ্রমিক সংগঠনগুলোও এই বিষয়ে তাদের অসন্তুষ্টির কথা জানিয়েছে। এরপরে ২০১৮ সালে আরেকদফা সংশোধনী আনা হয়।
বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬ প্রণীত ও কার্যকর হওয়ার পর হতে এ পর্যন্ত ২০০৯, ২০১০, ২০১৩ ও ২০১৮ সালে ব্যাপক সংশোধন আনা হয়েছে। এসব সংশোধনীতে কিছু কিছু ইতিবাচক বিষয় থাকলেও শ্রম আইন কার্যত ক্রমান্বয়ে আরো বেশী অগণতান্ত্রিক শ্রম আইনে পরিণত হয়েছে।
এছাড়া বিগত মহাজোট সরকার ২০১৫ সালে একটি শ্রম বিধিমালা প্রণয়ন করে, যা প্রণয়নের ক্ষেত্রেও শ্রমিকদের এবং দেশের শ্রমিক আন্দোলনের সাথে সম্পর্কিত শ্রমিক সংগঠন, ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশন, শ্রমিক নেতৃবৃন্দের মতামত জানার জন্য প্রয়োজনীয় কার্যকর উদ্যোগ নেয়নি।
কী আছে বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬-এ?
১। মজুরি, নিম্নতম মজুরি ও মজুরি বোর্ডঃ আমাদের শ্রমিকদের মজুরি এত কম যে, নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্য সহ দৈনন্দিন জীবনযাপনের খরচ তাতে সংকুলান হয় না, ফলে তাদেরকে মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে রাস্তায় নামতে হয়। এর বাইরে, শ্রমিকদের অসন্তোষ - বিক্ষোভ ও আন্দোলনের অন্যতম প্রধান আরেকটি কারণ হচ্ছে, মালিকরা মাঝেমধ্যেই শ্রমিকদের মজুরি, ভাতা ও বোনাস বকেয়া রেখে দেয়, বিশেষ করে প্রায় প্রতি ঈদেই কোন না শিল্প প্রতিষ্ঠানের শ্রমিকদের পাওনা বোনাসের দাবিতে আন্দোলন করতে হয়, এমনকি ঈদের দিনে বকেয়া বেতন-ভাতা-বোনাসের দাবিতে আমরণ অনশন করতে দেখা গিয়েছে শ্রমিকদের। শ্রম আইন ২০০৬ এর ১২৩ (১) ধারায় বলা হয়েছে, “কোন শ্রমিকের যে মজুরিকাল সম্পর্কে তাহার মজুরি প্রদেয় হয় সেই কাল শেষ হওয়ার পরবর্তী সাত কর্মদিবসের মধ্যে তাহার মজুরী পরিশোধ করিতে হইবে।” এবং ধারা ১২২(২ অনুযায়ী, “কোন মজুরীকাল এক মাসের উর্ধে হইবে না”। বলাই বাহুল্য, শ্রম আইনে সাত কর্মদিনের মধ্যে মজুরি প্রদানের নির্দেশনা থাকলেও, এই আইনের প্রয়োগ খুব কমই হয়। কেননা এই মজুরি পরিশোধে বিলম্ব করার জন্যে মালিকের সাজার কোন বিধান এই আইনে রাখা হয়নি। ১৩২(২) অনুযায়ী, মজুরি পরিশোধ করা হয়নি বা পরিশোধে বিলম্ব হচ্ছে এই মর্মে শ্রমিক শ্রম আদালত বরাবরব দরখাস্ত করতে পারবে। শ্রম আদালত যদি প্রমাণ পায়, মালিক আসলেই যথাসময় মজুরি প্রদান করেনি, ১৩২(৩) অনুযায়ী আদালত মালিককে তখন মজুরি প্রদানের নির্দেশ দিবে, কিন্তু শ্রমিকের মজুরি, ভাতা ও বোনাস পরিশোধে মালিকদের গড়িমসির বিরুদ্ধে কোনরকম সাজার ব্যবস্থা নেই।
শ্রম আইন ২০০৬ এ জাতীয় ন্যুনতম মজুরির কথা বলা হয়নি, বরং যে ক্ষেত্রে কোন শিল্পে সরকার নিম্নতম মজুরী হার স্থির করা প্রয়োজন এবং যুক্তিসংগত বলে মনে করবে, কিংবা কোন শিল্পের মালিক কিংবা শ্রমিক পক্ষ অথবা উভয় পক্ষ আবেদন করবে, সে ক্ষেত্রে সরকার মজুরি বোর্ডকে প্রয়োজনীয় তদন্তান্তে নিম্নতম মজুরী হার সুপারিশ করার জন্য নির্দেশ দিবে (ধারা ১৩৯(১))। ধারা ১৪১ অনুযায়ী, “কোন সুপারিশ প্রণয়ন করা কালে মজুরী বোর্ড জীবন যাপন ব্যয়, জীবনযাপনের মান, উৎপাদন খরচ, উৎপাদনশীলতা, উৎপাদিত দ্রব্যের মূল্য, মুদ্রাস্ফীতি, কাজের ধরন, ঝুঁকি ও মান, ব্যবসায়িক সামর্থ, দেশের এবং সংশ্লিষ্ট এলাকার আর্থ-সামাজিক অবস্থা এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক বিষয় বিবেচনা করিয়া দেখিবে।” বলাই বাহুল্য এখন পর্যন্ত কোন মজুরি বোর্ডই এসমস্ত দেখতে ব্যর্থ হয়েছে। তার কারণ মজুরি বোর্ডের গঠনে বর্তমান। মজুরি বোর্ডে সদস্য হিসেবে শ্রমিক প্রতিনিধি একজন ও মালিক প্রতিনিধি একজন থাকেন (সংশ্লিষ্ট শিল্পের), আর থাকেন চেয়ারম্যান ও একজন নিরপেক্ষ সদস্য, যেখানে চেয়ারম্যান ও সদস্যদের সরকার নিয়োগ দিয়ে থাকে। ফলে, মজুরি বোর্ডে একজন শ্রমিক প্রতিনিধির বিপরীতে বাকি সদস্যরাই থাকে মালিক ও সরকার পক্ষীয়, অনেক ক্ষেত্রে শ্রমিক প্রতিনিধিও বস্তুত মালিক ও সরকারেরই পছন্দসই দালাল গোছের একজন। মূল্যস্ফীতি, জীবন যাপনের মান ও ব্যয় - এসব নিয়ে গবেষণা আছে এমন কোন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, অর্থনীতিবিদ, বা গবেষণা সংস্থার কোন গবেষককেও রাখা হয় না। ফলে, শ্রমিক সংগঠনদের দাবি অগ্রাহ্যই থেকে যায়।
এই আইনের ধারা ১৪০(৭)-এ বলা হয়েছে, “এই ধারার অধীন ঘোষিত নিম্নতম মজুরীর হার চূড়ান্ত হইবে এবং তৎসম্পর্কে কোনভাবে কোন আদালতে বা কোন কর্তৃপক্ষের নিকট প্রশ্ন করা বা আপত্তি উত্থাপন করা যাইবে না।” অর্থাৎ সরকারের মনোনীত কয়েকজন ব্যক্তি মিলে যে নিম্নতম মজুরি চুড়ান্ত করবে, তা দিয়ে যদি শ্রমিকদের সংসার না চলে, তারা আদালত বা কোন কর্তৃপক্ষের নিকট প্রশ্নও উত্থাপন করতে পারবে না! শুধু তাই নয়, মূল্যস্ফীতি - মুদ্রাস্ফীতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে যে নিয়মিত এই নিম্নতম মজুরি পর্যালোচনা করা জরুরী, সেটিও এই আইনে স্বীকার করা হয়নি। আর, প্রয়োজনের চাইতে অনেক কম পরিমাণ ঘোষিত ন্যুনতম মজুরিও যে অনেক মালিক দিতে চায় না, সে বিষয়ে সাজার ব্যবস্থা আছে ২৮৯ ধারায়, “(১) কোন মালিক একাদশ অধ্যায়ের অধীন ঘোষিত নিম্নতম মজুরী হারের কম হারে কোন শ্রমিককে মজুরী প্রদান করিলে, তিনি এক বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডে, অথবা পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ডে, অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডনীয় হইবেন৷ (২) যে ক্ষেত্রে আদালত উপ-ধারা (১) এর অধীন কোন দণ্ড আরোপ করে, সেক্ষেত্রে, আদালত উহার রায় প্রদানকালে, উক্তরূপ কোন লঙ্ঘন না হইলে সংশ্লিষ্ট শ্রমিককে যে মজুরী প্রদেয় হইত এবং উক্তরূপ লঙ্ঘন করিয়া মজুরী হিসাবে যে অর্থ প্রদান করা হইয়াছে উহার পার্থক্যের পরিমাণ অর্থ তাহাকে প্রদান করিবার আদেশ দিতে পারিবে৷” এই আইন থাকলেও আজ পর্যন্ত কোন মালিককে সরকার ঘোষিত ন্যুনতম মজুরির চাইতে কম মজুরি দেয়ার অপরাধে কারাবাস করতে দেখা গিয়েছি কি?
২। ট্রেড ইউনিয়নঃ শ্রম আইন ২০০৬ -এ শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার রয়েছে। ত্রয়োদশ অধ্যায়ের (ট্রেড ইউনিয়ন ও শিল্প সম্পর্ক) ৩৩ টি ধারায় (ধারা ১৭৫ থেকে ধারা ২০৮ পর্যন্ত) বস্তুত নানাভাবে ও নানা শর্তে শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন ও ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশন গঠন করা কঠিন করে দেয়া হয়েছে, মালিক বা সরকারের পক্ষে ট্রেড ইউনিয়নকে প্রভাবিত করার সুযোগও দেয়া হয়েছে। যেমনঃ
ধারা ১৮০(১)-তে বলা হয়েছে, “কোন ট্রেড ইউনিয়নের গঠনতন্ত্রে যাহা কিছুই থাকুক না কেন, কোন ব্যক্তি উহার কর্মকর্তা অথবা সদস্য নির্বাচিত হওয়ার বা থাকিবার যোগ্য হইবেন না, যদি- … (খ) যে প্রতিষ্ঠানে ট্রেড ইউনিয়ন গঠন করা হইয়াছে, সে প্রতিষ্ঠানে তিনি শ্রমিক হিসাবে নিয়োজিত বা কর্মরত না থাকেন; তবে শর্ত থাকে যে, রাষ্ট্রায়াত্ত শিল্প সেক্টরের ক্ষেত্রে ইউনিয়নের সদস্যরা ইচ্ছা পোষণ করিলে ইউনিয়নের কার্যনির্বাহী কমিটির মোট কর্মকর্তার শতকরা দশ ভাগকে নির্বাচিত করিতে পারিবে, যাহারা উক্ত প্রতিষ্ঠানে কর্মরত নয়।” এই ধারার শর্তানুযায়ী কারখানায় কর্মরত শ্রমিক ছাড়া কেউ ট্রেড ইউনিয়নের কর্মকর্তা বা সদস্য হতে পারবেন না, অর্থাৎ ট্রেড ইউনিয়ন করতে পারবেন না। অথচ মালিকদের সমিতির ক্ষেত্রে এরূপ কোনো বিধি-নিষেধ নেই। বৈষম্যমূলকভাবে শুধুমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের শ্রমিক ইউনিয়নের কার্যনির্বাহী কমিটিতে এরূপ ব্যক্তির সংখ্যা শতকরা মাত্র ১০-এ সীমিত রাখা হয়েছে। এই ধারার কারণে যে কোনো সময় মালিক কোনো শ্রমিককে ছাঁটাই করলে তিনি আর ইউনিয়ন করতে পারবেন না। এতে শ্রমিকরা আইন জানা, শিক্ষিত, দক্ষ নেতৃত্ব কর্তৃক পরিচালিত হওয়া থেকে বঞ্চিত হবেন। এই ধারাটির মাধ্যমে শ্রমিকদের নিজেদের পছন্দমতো নেতা নির্বাচন ও সংগঠন করার অধিকার খর্ব করা হয়েছে, যা বাংলাদেশ সরকার অনুসমর্থিত আইএলও কনভেনশন ’৮৭ ও ’৯৮ পরিপন্থী। পূর্বেকার ১৯৬৯ সালের আইনে কারখানার শ্রমিক না হয়েও ২৫% অশ্রমিক সরকারি ও ব্যক্তিমালিকানাধীন উভয় খাতের যে কোনো কারখানায় ইউনিয়ন করতে পারত। অথচ স্বাধীন বাংলাদেশে শ্রমিকদের পূর্বে অর্জিত সে অধিকারও হরণ করা হলো।
১৭৯ (৫) ধারায় বলা হয়েছে, একটি প্রতিষ্ঠানে তিনটির বেশি ইউনিয়ন থাকতে পারবে না। এবং ধারা ১৭৯ (১ট) অনুযায়ী ৩৫ জনের বেশি ইউনিয়ন কর্মকর্তা থাকতে পারবেন না। বাংলাদেশ সরকার অনুসমর্থিত আইএলও কনভেনশন ’৮৭ অনুযায়ী, একটি প্রতিষ্ঠানে কয়টি ইউনিয়ন থাকবে বা কতজন কর্মকর্তা হবেন, তা শ্রমিকরাই নির্ধারণ করবে। কিন্তু এক্ষেত্রে শ্রমিকদের সে অধিকার খর্ব করা হয়েছে। এ ছাড়াও ধারা ১৭৯(২)-এ বলা হয়েছে, কোনো কারখানায় ট্রেড ইউনিয়ন করার জন্য ওই কারখানার মোট কর্মরত শ্রমিকের মধ্যে কমপক্ষে ২০%কে সদস্য হতে হবে। আমাদের দেশের অনেক কারখানাতেই এখন শ্রমিকের সংখ্যা এত বেশি যে তাদের মধ্য থেকে শতকরা ২০ জনকে সদস্য করে ট্রেড ইউনিয়ন গঠন করা প্রায় দুঃসাধ্য একটি কাজ। অন্যদিকে, মালিকপক্ষ নানারকম প্রভাব কাজে লাগিয়ে ২০% শ্রমিকের নামকাওয়াস্তে স্বাক্ষর সংগ্রহ করেই দালাল ট্রেড ইউনিয়ন গড়ে তুলতে পারবে!
২০০৬ সালের শ্রম আইনে একই ধরনের বা একই প্রকারের শিল্পে নিয়োজিত বা শিল্প পরিচালনারত প্রতিষ্ঠানগুলোতে গঠিত দুই বা ততোধিক ট্রেড ইউনিয়ন নিয়মানুযায়ী সিদ্ধান্ত নিলে ফেডারেশন গঠন ও রেজিস্ট্রেশন করার জন্য দরখাস্ত করতে পারত। অথচ ২০১৩ সালের সংশোধিত আইনে ২০০(১) ধারায় থাকা ‘দুই বা ততোধিক ট্রেড ইউনিয়ন’-এর পরিবর্তে ‘পাঁচ বা ততোধিক ট্রেড ইউনিয়ন এবং একাধিক প্রশাসনিক বিভাগে ট্রেড ইউনিয়ন সংগঠন’ শব্দগুলো প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। অর্থাৎ এর মাধ্যমে ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশন রেজিস্ট্রেশন করার কাজটি আরো কঠিন করে দেয়া হয়েছে।
এই শ্রম আইনের ধারা ১৯০-এ বলা হয়েছে, “(১) এই ধারার অন্য বিধান সাপেক্ষে, মহাপরিচালক কোন ট্রেড ইউনিয়নের রেজিস্ট্রি বাতিল করিতে পারিবেন, যদি-...(ঙ) উহা কোন অসৎ শ্রম আচরণ করিয়া থাকে;” আবার, ধারা ১৯৬(১)-এ শ্রমিকের পক্ষে অসৎ শ্রম আচরণ শিরোনামে বলা হয়েছে, “মালিকের বিনা অনুমতিতে কোন শ্রমিক তাহার কর্মসময়ে কোন ট্রেড ইউনিয়নের কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত থাকিবেন না; তবে শর্ত থাকে যে, কোন প্রতিষ্ঠানের যৌথ দরকষাকষি প্রতিনিধির সভাপতি বা সাধারণ সম্পাদক-এর ট্রেড ইউনিয়ন কাজকর্মে নিয়োজিত থাকার ব্যাপারে এই উপ-ধারার কোন কিছুই প্রযোজ্য হইবে না। যদি উক্তরূপ কর্মকাণ্ডে এই আইনের অধীন কোন কমিটি, আলাপ-আলোচনা, সালিস মধ্যস্থতা অথবা অন্য কোন কর্মধারা সম্পর্কে হয় এবং মালিককে তৎসম্পর্ক যথাসময়ে অবহিত করা হয়।” এই ধারা দুটির মাধ্যমে কোনো মালিক যদি তাঁর প্রতিষ্ঠানে কর্মরত কোনো ট্রেড ইউনিয়নের রেজিস্ট্রেশন বাতিল করতে চান তাহলে তিনি সহজেই তা করতে পারবেন। শুধু তা-ই নয়, ধারা দুটির মাধ্যমে শ্রমিকদেরকে তাঁর ইচ্ছামতো ট্রেড ইউনিয়ন কর্মকাণ্ড থেকে বিরত বা দূরে রাখতে পারবেন, যা মূলত আইনি লেবাসে ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার খর্ব বা খন্ডিত করার শামিল।
এই আইনের ধারা ২১১(৮)-এ বলা হয়েছে, “ যদি কোন প্রতিষ্ঠান নূতন স্থাপিত হয়, অথবা বিদেশী মালিকানাধীন হয়, অথবা বিদেশী সহযোগিতায় স্থাপিত হয়, তাহা হইলে উক্তরূপ প্রতিষ্ঠানে উত্পাদন শুরু হওয়ার পরবর্তী তিন বত্সর পর্যন্ত ধর্মঘট কিংবা লক-আউট নিষিদ্ধ থাকিবে৷ তবে, উক্তরূপ প্রতিষ্ঠানে উত্থিত কোন শিল্প বিরোধ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে এই অধ্যায়ে বর্ণিত অন্যান্য বিধান প্রযোজ্য হইবে৷” এই ধারার ফলে শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন করার আইনি অধিকার সংকুচিত হলো, খন্ডিত হলো। মালিকশ্রেণিকে তিন বছরের জন্য আইনি বাধ্যবাধকতার ঊর্ধ্বে থাকার সুযোগ করে দেয়া হলো। ফলে মালিকপক্ষ তিন বছরের জন্য ইচ্ছামতো কারখানা পরিচালনা করতে পারবেন। আর শ্রমিকরা সংগঠন-সংগ্রাম করার স্বাধীনতাসহ সাংবিধানিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হলো। বঞ্চিত হলো আইএলও সনদে স্বীকৃত মৌলিক মানবাধিকার থেকে। আইনের ঊর্ধ্বে থাকার এই ‘আইনি ছাড়পত্র’ অধিক সময়কাল কাজে লাগাতে মালিকশ্রেণি কর্তৃক তিন বছর পর পর কারখানার নাম পাল্টানোর বা অন্য কোনো ফাঁকফোকর বের করার আশঙ্কা এক্ষেত্রে থেকেই যায়। অর্থাৎ এই আইনে ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার সংকুচিত/খন্ডিত করা হয়েছে; রাজনৈতিক কর্মীদের ট্রেড ইউনিয়ন গড়ে তোলার অধিকার হরণ করা হয়েছে।
এই আইনের ধারা ২৯৯-এ বলা হয়েছে, “কোন ব্যক্তি অরেজিস্ট্রিকৃত অথবা রেজিস্ট্রি বাতিল হইয়াছে এমন কোন ট্রেড ইউনিয়নের, রেজিস্ট্রেশন প্রাপ্তি সংক্রান্ত কোন কর্মকাণ্ড ব্যতীত, অন্য কোন কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করিলে অথবা অন্য কোন ব্যক্তিকে উক্তরূপ কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের জন্য উৎসাহিত বা প্ররোচিত করিলে, অথবা উক্তরূপ কোন ট্রেড ইউনিয়নের তহবিলের জন্য সদস্য চাঁদা ব্যতীত অন্য কোনো চাঁদা আদায় করিলে, তিনি তিন মাস পর্যন্ত কারাদণ্ডে, অথবা দুই হাজার টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ডে, অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডনীয় হইবেন।” এই ধারা দেশের প্রচলিত সংবিধানের মৌলিক অধিকার সংক্রান্ত ধারা ৩৭ (সমাবেশের স্বাধীনতা) ও ৩৮ (সংগঠনের স্বাধীনতা)-এর পরিপন্থী এবং আইএলও কনভেনশন ’৮৭ ও ’৯৮ পরিপন্থী। এই ধারা কার্যকর হলে শ্রমিকদের সাংবিধানিক অধিকার ও আইএলও কনভেনশন অনুযায়ী প্রাপ্ত অধিকার খর্ব হবে এবং ট্রেড ইউনিয়ন করা পূর্বের থেকে অনেক কঠিন ও দুরূহ হয়ে পড়বে।
৩। অংশগ্রহণকারী কমিটিঃ শ্রম আইনের ২০৫ ধারায় শ্রমিকদের অংশগ্রহণমূলক কমিটির (Workers Participatory Committee) বিধান রেখে বলা হয়েছে, “(১) অন্যুন পঞ্চাশ জন শ্রমিক সাধারণতঃ কর্মরত আছেন এরূপ প্রত্যেক প্রতিষ্ঠানের মালিক উক্ত প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শ্রমিকদেরকে প্রত্যক্ষভাবে সম্পৃক্ত করিয়া বিধি দ্বারা নির্ধারিত পন্থায় তাহার প্রতিষ্ঠানে একটি অংশগ্রহণকারী কমিটি গঠন করিবেন৷ (২) উক্ত কমিটি মালিক ও শ্রমিকগণের প্রতিনিধি সমন্বয়ে গঠিত হইবে৷ … (৬ক) যে প্রতিষ্ঠানে ট্রেড ইউনিয়ন নাই, সেই প্রতিষ্ঠানে ট্রেড ইউনিয়ন গঠিত না হওয়া পর্যন্ত অংশগ্রহণ কমিটির শ্রমিক প্রতিনিধিগণ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে শ্রমিকস্বার্থ সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম পরিচালনা করিতে পারিবে।” কোন শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন গড়ে ওঠার আগ পর্যন্ত এরকম অংশগ্রহণকারী কমিটির ব্যবস্থা থাকলে, শ্রমিকদের সমস্যা-সংকট, দাবি দাওয়া উত্থাপনের তথা তাদের আওয়াজ শুনানোর মত সংস্থা সবসময়ই থাকতে পারত, এবং এই অংশগ্রহণকারী কমিটিই ক্রমে ট্রেড ইউনিয়ন গঠনেও ভূমিকা রাখতে পারত। কিন্তু এহেন অংশগ্রহণকারী কমিটি গঠনের কাজটি শ্রমিকের বদলে মালিকের ঘাড়ে দিয়ে এবং শ্রমিক ও মালিকের সমন্বয়ে কমিটি গঠনের বিধান রাখায় বস্তুত মালিকপক্ষই শ্রমিকের ওপরে প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণ বিস্তারের চেষ্টা করবে এবং এই অংশগ্রহণকারী কমিটি কার্যকর কোন ভূমিকাই রাখতে পারবে না। বরং, এরকম কমিটিতে মালিকপক্ষ অবস্থান করার মাধ্যমে শ্রমিকদেরকে অবাধ ট্রেড ইউনিয়ন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতাও তৈরি করতে পারবে।
৪। শ্রম আইনের আওতা বহির্ভূত শ্রমিকঃ ১(৪) ধারায় বলা হয়েছে, কোন প্রতিষ্ঠানসমূহ বা শ্রমিকগণের উপর এই শ্রম আইন প্রযোজ্য হবে না। সেখানে সরকার ও সরকারের অধীনস্ত অফিসে কর্মরত শ্রমিক, গৃহপরিচারক, অলাভজনক বা দাতব্য প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, এতিমখানা, শিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের কর্মরত শ্রমিক, প্রভৃতিকে শ্রম আইনের আওতা বহির্ভূত রাখা হয়েছে। এ ধারা বৈষম্যমূলক এবং অগণতান্ত্রিক। কারণ শ্রমিকের অধিকার এবং শ্রম আইনের আওতা থেকে কোনো শ্রমিককে বাদ দেয়া যায় না।
৫। কর্মঘন্টাঃ শ্রম আইন ২০০৬ এর ধারা ১০০-তে বলা হয়েছে, “কোন প্রাপ্তবয়স্ক শ্রমিক কোন প্রতিষ্ঠানে সাধারণত দৈনিক ৮ ঘণ্টার অধিক সময় কাজ করিবেন না বা তাঁহাকে দিয়া কাজ করানো যাইবে না; তবে শর্ত থাকে যে, ধারা ১০৮-এর বিধান (অধিককাল কর্মের জন্য অতিরিক্ত ভাতা) সাপেক্ষে, উক্তরূপ কোন শ্রমিক দৈনিক ১০ ঘণ্টা পর্যন্তও কাজ করিতে পারিবেন।” এবং ধারা ১০২-তে বলা হয়েছে, “(১) কোন প্রাপ্তবয়স্ক শ্রমিক কোন প্রতিষ্ঠানে সাধারণতঃ সপ্তাহে আটচল্লিশ ঘণ্টার অধিক সময় কাজ করিবেন না বা তাহাকে দিয়ে কাজ করানো যাইবে না। (২) ধারা ১০৮ এর বিধান সাপেক্ষে, কোন প্রাপ্তবয়স্ক শ্রমিক কোন প্রতিষ্ঠানে সপ্তাহে আটচল্লিশ ঘণ্টার অধিক সময়ও কাজ করতে পারিবেনঃ তবে শর্ত থাকে যে, কোন সপ্তাহে উক্তরূপ কোন শ্রমিকের মোট কর্ম-সময় ষাট ঘণ্টার অধিক হইবে না, এবং কোন বৎসরে উহা গড়ে প্রতি সপ্তাহে ছাপ্পান্ন ঘণ্টার অধিক হইবে না …”। অর্থাৎ এভাবে মালিকপক্ষ কর্তৃক শ্রমিকদেরকে অতিরিক্ত খাটানোর সুযোগ করে দেয়া হয়েছে। ১০৮ ধারায় অতিরিক্ত সময় কাজের জন্য দ্বিগুণ হারে ভাতার কথা বলা হলেও, শ্রমিকের সম্মতির শর্ত কোথাও স্পষ্ট করা হয়নি। তাছাড়া ইতিপূর্বে খাওয়া ও প্রার্থনা বিরতিসহ কর্মঘণ্টা হিসাব করা হলেও এই আইনে খাওয়া ও বিশ্রামের জন্য বিরতি ব্যতীত সময়কে কর্মঘণ্টা বলা হয়েছে। আমরা জানি, আমাদের দেশে বিভিন্ন শিল্প কারখানায় ৮ ঘন্টার জায়গায় শ্রমিকদের ১২-১৬ ঘণ্টা কাজ করতে হয় (যেমনঃ গার্মেন্টস সেক্টরে)। আইন বহির্ভূতভাবে দিনে ১০ ঘন্টার অধিক ও সপ্তাহে ৬০ ঘন্টার পরিশ্রম করালে, মালিকের কোন সাজার বিধান নেই। স্বল্পমজুরির শ্রমিকরা সংসার চালাতে অনেকসময়ই দ্বিগুন ভাতার আকর্ষণে বাড়তি কর্মঘন্টা পরিশ্রম করেন, কিন্তু দেখা যায় অনেক মালিকই সময়মত ভাতা পরিশোধ করতে গড়িমসি করেন। এই আইন সেই নিশ্চয়তাও দিতে পারে না।
৬। ছাঁটাই ও বরখাস্ত, ইত্যাদি ব্যতীত মালিক কর্তৃক শ্রমিকের চাকুরীর অবসানঃ শ্রম আইন ২০০৬ এর ২৬(১) ধারায় বরখাস্ত ব্যতীত অন্য কারণে শ্রমিকের চাকুরীর অবসানের ক্ষেত্রে বলা হয়েছে যে, মালিক মাসিক মজুরীর ভিত্তিতে নিয়োজিত শ্রমিকের ক্ষেত্রে, একশত বিশ দিনের, অন্য শ্রমিকের ক্ষেত্রে, ষাট দিনের লিখিত নোটিশ প্রদান করে কোন স্থায়ী শ্রমিকের চাকুরীর অবসান করতে পারবেন৷ অস্থায়ী শ্রমিকের ক্ষেত্রে লিখিত নোটিশ প্রদানের সময় যথাক্রমে ত্রিশ ও চৌদ্দ দিনের। ২৬(২) ধারায় বলা হয়েছে, বিনা নোটিশে শ্রমিকের চাকুরী অবসান ঘটানোর ক্ষেত্রে নোটিশ মেয়াদের জন্য মজুরী প্রদান করতে হবে। অন্যদিকে, ২০(১) ধারায় বলা হয়েছে, “কোন শ্রমিককে প্রয়োজন অতিরিক্ততার কারণে কোন প্রতিষ্ঠান হইতে ছাঁটাই করা যাইবে।” এবং, সেই শ্রমিক যদি এক বছরের বেশি চাকরিতে নিযুক্ত থাকেন, তবেই তাকে এক মাসের নোটিশ অথবা নোটিশের মেয়াদের জন্যে মজুরি প্রদান করতে হবে। বলাই বাহুল্য, চার মাসের নোটিশ দিয়ে শ্রমিকের চাকুরীর অবসান ঘটানোর চাইতে এক মাসের নোটিশে ছাঁটাই করে দেয়া মালিকের জন্যে লাভজনক। কিন্তু এভাবে একমাসে নোটিশে শ্রমিক কর্মহীন পথে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে। ২১ ধারায় মালিক ছাঁটাইকৃত শ্রমিককে এক বছরের মধ্যে ইচ্ছে করলে পুনঃনিয়োগও করতে পারবে। এভাবে স্থায়ী শ্রমিকদেরও আসলে অস্থায়ী বানানোর আয়োজন করে দিয়েছে আমাদের শ্রম আইন। বছরের যে সময়ে অর্ডার কম থাকবে, কেবল প্রয়জন অতিরিক্ততার কারণ দেখিয়েই শ্রমিককে ছাঁটাই করতে পারবে, এবং কাজের চাপ বা অর্ডার বাড়লে ছাঁটাইকৃত শ্রমিকদের পুনঃনিয়োগ দিলে, মাঝের কয়েক মাস মজুরি না দিলেও চলছে। এছাড়া, যেসব শ্রমিক বিভিন্ন দাবি দাওয়ায় শ্রমিক আন্দোলন করে বা ট্রেড ইউনিয়ন করে তাদেরকেও মালিকপক্ষ চাইলে এভাবে একমাসের নোটিশে ছাঁটাই করে দিতে পারবে!
৭। অসদাচরণ এবং দণ্ড-প্রাপ্তির ক্ষেত্রে শাস্তিঃ শ্রম আইনের ২৩(১) ধারায় বলা হয়েছে, “... কোন শ্রমিককে বিনা নোটিশে বা নোটিশের পরিবর্তে বিনা মজুরীতে চাকুরী হইতে বরখাস্ত করা যাইবে, যদি তিনি- (ক) কোন ফৌজদারী অপরাধের জন্য দণ্ডপ্রাপ্ত হন অথবা ধারা (খ) ২৪ এর অধীন অসদাচরণের অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হন।” ২৩(৩) ও ২৩(৪) ধারায় বলা হয়েছে, মালিকের ব্যবসা বা সম্পত্তি সম্পর্কে চুরি, আত্মসাৎ, প্রতারণা বা অসাধুতা কিংবা প্রতিষ্ঠানে উচ্ছৃঙ্খল বা দাঙ্গা-হাঙ্গামামূলক আচরণ, অথবা শৃঙ্খলা হানিকর কোন কর্ম করার অপরাধে কোন শ্রমিককে বরখাস্ত করা হলে তিনি কোন ক্ষতিপূরণ পাবেন না। ফলে ১০-১৫ বছর চাকরি করেও একজন শ্রমিককে প্রায় শূন্যহাতে চলে যেতে হবে। এটা মালিকের হাতে একটা ভয়ংকর অস্ত্র। অসদাচরণের যে সংজ্ঞা দেয়া হয়েছে, তাতে মালিক কারখানা বা কারখানার বাইরের যে কোনো শ্রমিক অসন্তোষ, আন্দোলন-সংগ্রামকে উচ্ছৃংখল ও দাঙ্গা-হাঙ্গামামূলক আচরণ বা শৃঙ্খলা হানিকর কর্ম হিসেবে আখ্যায়িত করে শ্রমিকের ওপর দোষ চাপাতে পারবেন। এভাবে বিনা নোটিশে ও বিনা মজুরিতে মালিক একজন শ্রমিককে কেবল বরখাস্তই করতে পারছে না, মালিককে কোন রকম ক্ষতিপূরণও দিতে হচ্ছে না!
২০০৬ সালের আইনের ১২৩(২) ধারায় ছিল, “যে ক্ষেত্রে কোন শ্রমিকের চাকুরী তাহার অবসর গ্রহণের কারণে অবসর হয় অথবা মালিক কর্তৃক তাহার ছাঁটাই, ডিসচার্জ, অপসারণ, বরখাস্ত অথবা অন্য কোন কারণে উহার অবসান করা হয় সেক্ষেত্রে উক্ত শ্রমিককে প্রদেয় সকল মজুরী তাহার চাকুরী অবসানের তারিখ হইতে পরবর্তী সাত কর্মদিবসের মধ্যে পরিশোধ করিতে হইবে।” কিন্তু ২০১৩ সালের সংশোধনীতে এ আইনের ১২৩(২) ধারায় বলা হয়েছে, “… তাহার চাকুরী অবসানের তারিখ হইতে ত্রিশ কর্মদিবসের মধ্যে পরিশোধ করিতে হইবে।” প্রদেয় সকল মজুরি পরিশোধের সময়সীমা সাত দিন থেকে বাড়িয়ে ত্রিশ দিন করায় শ্রমিকদের হয়রানি ও ভোগান্তি আরো বেড়েছে।
৮। শ্রমিক কর্তৃক চাকুরীর অবসানঃ পূর্বেকার আইনে ছিল, একজন শ্রমিক তাঁর চাকরির অবসান করতে চাইলে, মাসিক মজুরিতে নিযুক্ত শ্রমিকের ক্ষেত্রে এক মাসের নোটিশ, অন্য শ্রমিকের ক্ষেত্রে চৌদ্দ দিনের নোটিশ, লিখিতভাবে মালিককে প্রদান করতে হতো। যিনি তাঁর চাকরি অবসান করেন তিনি ধারা ১৯-এর (১) উপধারায় বর্ণিত কোনো ক্ষতিপূরণ পাওয়ার অধিকারী হবেন না। কিন্তু তিনি এই আইনের অধীনে বা প্রচলিত অন্য কোনো আইনে অন্য কোনো সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা থাকলে তা অবশ্যই পাবেন। এই ১৯(১) ধারার বিরুদ্ধে পাকিস্তান আমলেও শ্রমিকরা আন্দোলন করেছিল।
শ্রম আইন ২০০৬ এর ধারা ২৭(১)-এ স্বেচ্ছায় শ্রমিক কর্তৃক চাকরি অবসানের জন্য ৬০ দিন আগে নোটিশ দেয়ার কথা বলা হয়েছে। অথচ সরকারি চাকরি ছাড়ার ক্ষেত্রেও ৬০ দিন আগে নোটিশ দেয়ার কোনো বিধান নেই। উপরন্তু এই আইনের ধারা ২৭(৩) অনুযায়ী নোটিশ না দিলে নোটিশ মেয়াদের জন্য সমপরিমাণ অর্থ মালিককে ফেরত দেয়ার কথা বলা হয়েছে, যা পূর্বেকার আইনে ছিল না। এই আইনে স্বেচ্ছায় চাকরি ছাড়া স্থায়ী শ্রমিক বাদে অন্যান্য শ্রমিককে অত্র আইনে বা প্রচলিত অন্য কোনো আইনের অন্য কোনো সুযোগ-সুবিধা ভোগ করা থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। স্থায়ী শ্রমিকদের ক্ষেত্রেও দৃশ্যত নামমাত্র ক্ষতিপূরণ দেয়ার কথা বলা হয়েছে [ধারা ২৭(৪)]।
৯। প্রসূতি কল্যাণ সুবিধাঃ এই শ্রম আইনের ধারা ৪৫ ও ৪৬ অনুযায়ী, নারী শ্রমিক সন্তান প্রসবের আগে ৮ সপ্তাহ এবং পরে ৮ সপ্তাহ সর্বমোট ১৬ সপ্তাহ সবেতন মাতৃত্বকালীন ছুটি বা প্রসূতি কল্যাণ সুবিধা ভোগ করবেন, যদি তিনি প্রসবের পূর্বে কমপক্ষে ৬ মাস কাজ করে থাকেন। এ আইন বৈষম্যমূলক। কেননা আমাদের দেশে সরকারি চাকরিতে ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে মাতৃত্বকালীন ছুটি ৬ মাস রয়েছে। এছাড়া, পাকিস্তান আমলে আইনে ‘মা’ তাঁর সুবিধাজনক সময়ে বুকের দুধ খাওয়ানোর জন্য সন্তান জন্মের পর অপেক্ষাকৃত বেশি দিন ছুটি নিতে পারতেন, বর্তমান আইনে সে সুবিধেও রাখা হয়নি। বস্তুত, বাস্তবতা আরো ভিন্ন, চাকরি যাওয়ার ভয়ে অনেক গর্ভবতী শ্রমিক গর্ভাবস্থার কথা আড়াল করে কাজ করে যান। অনেক নারীকে প্রসবের ৮ সপ্তাহেরও আগে কাজে যোগদানে বাধ্য করার মাধ্যমে মাকে স্বাস্থ্য ঝুকিতেও ফেলে দেয়া হয়। সাভারের রানা প্লাজায় দুইজন নারী শ্রমিকের সন্তান প্রসব এবং সন্তানসহ নির্মম মৃত্যুর ঘটনা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিগুলোতে মাতৃত্বকালীন ছুটি দেয়ার চিত্র। আবার এই আইনের ধারা ২৮৬-তে নারী শ্রমিকদের মাতৃত্বকালীন সুবিধা না দেয়ার জন্য শাস্তি রাখা হয়েছে তিন মাসের দণ্ড বা মাত্র পঁচিশ হাজার টাকা জরিমানা। ফলে, প্রসূতি নারী শ্রমিকের ৪ মাসের মাতৃত্বকালীন ছুটি কমিয়ে এক বা দুই মাসও যদি তাকে দিয়ে কাজ করানো সম্ভব, তাতে মালিকের যে উৎপাদন বাড়ে ও মুনাফা হয়, তার কাছে এই ২৫ হাজার টাকা এতই নগণ্য যে, এই অর্থদণ্ডের ভয় দেখিয়ে মালিকের নারী শ্রমিককে মাতৃত্বকালীন ছুটি কম দেয়া কমানো সম্ভব নয়।
১০। অপরাধ ও দণ্ডঃ শ্রম আইন ২০০৬ এর ধারা ২৯৪, ২৯৫, ২৯৬ অনুযায়ী কোনো শ্রমিক বেআইনি ধর্মঘটে গেলে, বেআইনি ধর্মঘটে প্ররোচিত করলে, ঢিমে তালের কাজে অংশগ্রহণ বা প্ররোচিত করলে ছয় মাস পর্যন্ত কারাদণ্ডে অথবা পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত অর্থ দণ্ডে অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। এর মাধ্যমে শ্রমিক ধর্মঘটকে বেআইনি দেখিয়ে বা শ্রমিকদের বিক্ষোভ-আন্দোলনকে ঢিমে তালের কাজে অংশগ্রহণ ও প্ররোচনা হিসেবে কেবল ছাটাই-বরখাস্তই নয়, জেল-জরিমানা করারও ব্যবস্থা করা হয়েছে! মালিকের ক্ষেত্রেও বেআইনি লক-আউটের জন্যে একই সাজা, অর্থাৎ ৬ মাস পর্যন্ত কারাদণ্ড অথবা পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড অথবা উভয়দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে! শ্রমিকের বেআইনি ধর্মঘট আর মালিকের বেআইনি লক-আউটকে সম-অপরাধ হিসেবে হাজির করতে সমান সাজার বিধান রাখা হয়েছে, কিন্তু একজন দরিদ্র শ্রমিকের জন্যে ও একজন ধনী মালিকের জন্যে ৫ হাজার টাকা অর্থদণ্ড কি সমান দণ্ড? এছাড়া, ধারা ২৮৩ অনুযায়ী, ধারা ৩৩-এর অধীনে বেআইনি লে-অফ, ছাঁটাই, ডিসচার্জ, বরখাস্ত, অপসারণ অথবা কোনো কারণে চাকরির অবসান ইত্যাদির জন্য মালিক কর্তৃক শ্রম আদালতের কোনো আদেশ মানতে অস্বীকৃতি জানানো বা ব্যর্থ হওয়ার জন্য শাস্তি রাখা হয়েছে মাত্র তিন মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড বা পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ডে অথবা উভয় দণ্ডের।
২৯০ ধারা অনুযায়ী দুর্ঘটনার নোটিশ দিতে ব্যর্থ হলে দুর্ঘটনার কারণে সাংঘাতিক শারীরিক জখম হয় তাহলে মাত্র এক হাজার টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড হবে আর জীবনহানি ঘটলে ৬ মাস পর্যন্ত কারাদণ্ড অথবা ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত অর্থ দণ্ড বা উভয় দণ্ড হবে।
মালিকের দায়িত্বহীনতা ও নির্মাণসংক্রান্ত নিয়মনীতি না মেনে বিদ্যমান নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ আইন লঙ্ঘনের কারণে কারখানাসমূহে যেসব দুর্ঘটনা (যেমন- ২০১২ সালে তাজরিন গার্মেন্টসে আগুনে পুড়ে ১২৫ জন শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনা, ২০১৩ সালে সাভারের রানা প্লাজা ধসে ১,১৩৭ জন শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনা- যা আসলে হত্যাযজ্ঞের সমতুল্য) ঘটেছে, তার জন্য মালিক বা সংশ্লিষ্টদের শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে মাত্র চার বছরের কারাদণ্ড অথবা এক লক্ষ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ড (ধারা ৩০৯)। অর্থাৎ শ্রম আইন ২০০৬-এ শ্রমিকদের জন্য কঠোর শাস্তি ও মালিকদের জন্য কম শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে।
এই আইনের ধারা ২৮৪ অনুযায়ী কোন শিশু বা কিশোরকে চাকুরীতে নিযুক্ত করার অথবা চাকুরী করবার অনুমতি দেয়ার জন্যে শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে মাত্র পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড। অর্থাৎ একজন মালিক শিশু বা কিশোরকে বেআইনীভাবে মাসের পর মাস কাজ করানোর পরে ধরা পড়লে তাকে মাত্র ৫ হাজার টাকা অর্থদণ্ড দিয়েই পার পেয়ে যেতে পারবেন।
এছাড়াও বিভিন্ন শিল্প কারখানায়, বিশেষ করে গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিগুলোতে নারী শ্রমিকদের সাথে পুরুষ সহকর্মী, কর্মকর্তা, মালিকপক্ষ নানারকম অশালীন আচরণ, যৌন নিপীড়ন, এমনকি ধর্ষণের মত ঘটনা অহরহ ঘটলেও এই অপরাধের জন্য কোন রকম সাজার ব্যবস্থা রাখা হয়নি। সাজা তো পরের কথা - এরকম কোন সমস্যায় একজন নারী যে কোথাও অভিযোগ দায়ের করবে, তার জন্যে শিল্প প্রতিষ্ঠানে বা সরকারের পরিচালক - পরিদর্শকের কার্যালয়ে কোন নারী নিপীড়ন বিরোধী সেল এর ব্যবস্থা রাখা হয়নি! শ্রম আইনের অপরাধ ও দণ্ড নামক অধ্যায়ের পরে, সর্বশেষ “বিবিধ” অধ্যায়ের ৩৩২ ধারায় অবশ্য বলা হয়েছে, “কোন প্রতিষ্ঠানের কোন কাজে কোন মহিলা নিযুক্ত থাকিলে, তিনি যে পদমর্যাদারই হোন না কেন, তার প্রতি উক্ত প্রতিষ্ঠানের অন্য কেহ এমন কোন আচরণ করিতে পারিবেন না যাহা অশ্লীল কিংবা অভদ্রজনোচিত বলিয়া গণ্য হইতে পারে, কিংবা যাহা উক্ত মহিলার শালীনতা ও সম্ভ্রমের পরিপন্থী৷” অর্থাৎ নারী শ্রমিকের প্রতি অন্য কেউ অশ্লীল, অভদ্রজনোচিত কিংবা তার শালীনতা ও সম্ভ্রমের পরিপন্থী আচরণ করতে বারণ করা হলেও, সেই বারণ উপেক্ষা করে এমন আচরণ কেউ করে ফেললে কি হবে, সে বিষয়ে কোন সাজা বা দণ্ডের ব্যবস্থা, কিংবা অভিযোগ দায়েরের ব্যবস্থা শ্রম আইনে রাখা হয়নি। এসবই নারী শ্রমিকের প্রতি উল্লিখিত আচরণ উসকে দিতে ভূমিকা রাখছে।
১১। শ্রমিকের অবসর গ্রহণঃ এই আইনের ধারা ২৮ অনুযায়ী, শ্রমিকের চাকরি থেকে অবসরগ্রহণের বয়স ৬০ বছর করা হয়েছে (বর্তমানে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানেও ওই বয়স ৬০ বছর)। পেনশনসহ অবসরজনিত সুবিধা না রেখে এই আইন কার্যকর হওয়ার ফলে অবসরে যাওয়া শ্রমিক পরিবার চরম অর্থনৈতিক সংকটসহ সামাজিকভাবে চরম নিরাপত্তাহীনতায় পতিত হবেন। ট্রেড ইউনিয়নগুলো সিনিয়র-অভিজ্ঞ শ্রমিক নেতৃবৃন্দকে হারাবেন, হবেন ক্ষতিগ্রস্ত। প্রচলিত প্রথা হচ্ছে, যত দিন শারীরিক সামর্থ্য থাকবে, তত দিন শ্রমিকরা কাজ করবে। উল্লেখ্য, শ্রমিকের চাকরিজীবনের অবসান ঘটাতে বয়সের মানদণ্ড আরোপ না করার জন্য ২০০৫ সালে উচ্চ আদালতে একটি রায় (৪২ ডিএলআর) হয়েছিল। এই আইনের মাধ্যমে সংকুচিত হবে শ্রমিকদের চাকরির ক্ষেত্র।
১২। বাসস্থান হতে উচ্ছেদঃ ধারা ৩২ অনুযায়ী, কোনো শ্রমিকের যে কোনো প্রকারে চাকরি অবসান হলে বা চাকরিচ্যুত হলে মালিক কর্তৃক শ্রমিককে বরাদ্দকৃত বাসস্থান থেকে পুলিশ দিয়ে জোরপূর্বক উচ্ছেদ করতে পারবে। অথচ শ্রমিককে মালিকপক্ষের অন্যায়-অত্যাচারের থাবা থেকে পুলিশের মাধ্যমে রক্ষা পাওয়ার বা প্রতিকার লাভের কোনো বিধান রাখা হয়নি। এভাবেই এই আইনে শ্রমিকের জন্য আইনের বাধ্যবাধকতা পূর্বের থেকে কঠিন ও কঠোর করা হয়েছে, অথচ মালিকের জন্য করা হয়েছে শিথিল ও নমনীয়।
১৩। গ্রাচুইটিঃ ২(১০) ধারায় বেসরকারি শ্রমিক ১০ বছর পর্যন্ত চাকরি করলে একটা এবং ১০ বছরের অধিক চাকরির জন্য দেড়টা গ্র্যাচুইটি পাওয়ার কথা বলা হয়েছে। অথচ বর্তমানে সরকারি/ রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের প্রতিষ্ঠানে বছরে দুইটা গ্র্যাচুইটির বিধান আছে। এবং তা ব্যক্তিমালিকানাধীন কিছু কিছু কল-কারখানার শ্রমিকরাও ভোগ করছেন। শ্রমিকের চাকরির স্থায়িত্ব রক্ষায় কার্যকর কোনো ব্যবস্থা না রেখে অর্থাৎ ছাঁটাই, ডিসচার্জ, টারমিনেশন, ইস্তফা সংশ্লিষ্ট ধারাসমূহে প্রয়োজনীয় সংশোধনী না আনায় এর মধ্য দিয়ে শ্রমিকের প্রাপ্য কমিয়ে দেয়া হলো। তাছাড়া সমকাজে সমমজুরির পরিবর্তে সরকারি ও বেসরকারি ক্ষেত্রের শ্রমিকদের মধ্যে বৈষম্যও সৃষ্টি করা হলো। ২(১০) ধারায় গ্রাচুইটি’র সংজ্ঞায় ২০০৬ সালের আইনে ছিল, “ইহা এই আইনের অধীনে শ্রমিকের বিভিন্নভাবে চাকুরীর অবসানজনিত কারণে মালিক কর্তৃক প্রদেয় ক্ষতিপূরণ বা নোটিশের পরিবর্তে প্রদেয় মজুরী বা ভাতার অতিরিক্ত হইবে।” ২০১৮ সালের সংশোধনীতে এই অংশটুকু মুছে ফেলা হয়। ফলে শ্রমিকের চাকুরীর অবসানজনিত ক্ষতিপূরণ বলে আদতে কিছু থাকছে না, প্রতি শ্রমিক তার প্রাপ্য গ্রাচুইটিই শুধু পাবে (সাধারণত ক্ষতিপূরণের চাইতে গ্রাচুইটিতে প্রদেয় অর্থপরিমাণ বেশি হয়)!
১৪। অগ্নিকান্ড সম্পর্কে সতর্কতা অবলম্বনঃ শ্রম আইনের ৬২ ধারায় অগ্নিকান্ডের ক্ষেত্রে সতর্কতা, যেমন বিকল্প সিড়ি সহ বহির্গমনের উপায়, প্রতি তলায় অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রপাতি, ভেতর ও বাইরে থেকে তাৎক্ষণিক খোলা যায় এমন দরজা, অগ্নিকান্ডের সাথে সাথে শ্রবণযোগ্য হুশিয়ারি সংকেত, প্রশিক্ষণ ও ছয় মাস পর পর অগ্নিনির্বাপন মহড়ার কথা থাকলেও (যদিও ১৯৬৫ সনের কারখানা আইনের ধারা ২২(১) এবং ১৯৭৯ সনের কারখানা বিধিমালা ধারা ৫১, ৫২ এর তুলনায় অনেক শিথিল ও কম বা ফাঁক রাখা হয়েছে), এই আইন মানার বাধ্যবাধকতা মালিকের ওপরে তৈরি করা যায়নি। পুরো বিষয়টি ছেড়ে দেয়া হয়েছে পরিদর্শকের ওপরে, এবং শ্রমঘন অঞ্চলে অপ্রতুল পরিদর্শকের পক্ষে সকল কারখানায় পরিদর্শন করা প্রায় অসম্ভব বিষয়। শ্রমিকদের কারখানার নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয়াবলীতে সম্পর্কে অবহিত করা, কোন জায়গায় সমস্যা বা অপ্রতুলতা দেখা দিলে সাথে পরিদর্শক কার্যালয়ে হট লাইনে অভিযোগ করার ব্যবস্থা থাকলে, দেখভাল বা তদারকির কাজটা করা যেত। আমরা জানি, এ দেশে শ্রমিকের জীবন সবচেয়ে সস্তা, আগুন ও ভবন ধ্বসে হাজার হাজার শ্রমিক নিহত ও অসংখ্য শ্রমিক আহত হয়েছেন, অনেকে পঙ্গু হয়ে কর্মক্ষমতা হারিয়েছেন। এমতাবস্থায় যেখানে দায়ী খুনি মালিকের কঠোর শান্তির বিধান রাখার দরকার ছিল, দরকার ছিল নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে কেবল আইনেই সীমাবদ্ধ না রেখে প্রয়োগের জন্যে যথাযথ বিধানাবলী, এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা তদারকিতে ব্যর্থতার জন্যে দায়িত্বপ্রাপ্তদের ও সরকারি পরিদর্শকদেরও জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ। মালিকের গাফিলতিতে শ্রমিকের জীবন পর্যন্ত সংশয় হলে কোন সাজার ব্যবস্থা নেই, অথচ শ্রম আইনে মালিকের ক্ষতি বা বিনষ্টির জন্য শ্রমিকের মজুরি কর্তনের বিধান রাখা হয়েছে ( ধারা ১২৭)।
১৫। দুর্ঘটনাজনিত কারণে জখমের জন্য ক্ষতিপূরণঃ শ্রম আইন ২০০৬ এর ১৫০ ধারার (১) নাম্বার উপধারায় “চাকুরী চলাকালে উহা হইতে উদ্ভূত দুর্ঘটনার ফলে যদি কোন শ্রমিক শরীরে জখমপ্রাপ্ত হন তাহা হইলে মালিক তাহাকে এই অধ্যায়ের বিধান অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য থাকিবেন” বলা হলেও, ঠিক তার পরেই জানানো হয়েছে, কোন কোন ক্ষেত্রে মালিক এই ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য থাকবে না। তার মধ্যে আছে, জখমের কারণে তিনদিনের বেশি যদি শ্রমিকটি সম্পূর্ণ বা আংশিক কর্মক্ষমতা না হারান, তাহলে তিনি কোন ক্ষতিপূরণ পাবেন না। এছাড়া, জখমের ফলে শ্রমিকটি মৃত্যুবরণ না করে যদি তিনদিনের বেশি দিনের জন্যে সম্পূর্ণ বা আংশিক কর্মক্ষমতাও হারান, তারপরেও ক্ষতিপূরণ না দেয়ার উপায় রাখা হয়েছে, দুর্ঘটনার সময়ে শ্রমিকের মাদক দ্রব্য সেবন বা মদ্য পানের প্রভাবাধীন থাকা বা নিরাপত্তা বিধি ইচ্ছাকৃতভাবে না মানা - এমন সব কারণ দেখিয়ে!
১৬। ক্ষতিপূরণ বন্টনঃ ১৫৫ (১) উপ-ধারায় ক্ষতিপূরণ বণ্টনের ক্ষেত্রে বলা হয়েছে, “জখমের ফলে মৃত শ্রমিক সম্পর্কে প্রদেয় ক্ষতিপূরণ শ্রম আদালত ভিন্ন অন্য কোন পন্থায় পরিশোধ করা যাইবে না।” এ ধারার মাধ্যমে শ্রম আদালতের সাথে সাথে ক্ষতিপূরণ পরিশোধে অন্য উপায় না রাখায় ক্ষতিপূরণ পাওয়ার ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতা ও জটিলতা সৃষ্টি হয়।
১৭। অংশগ্রহণ তহবিল ও কলাণ তহবিলঃ ধারা ২৩৪-এর (১খ) উপধারায় বলা হয়েছে, “এর মালিক প্রত্যেক বৎসর শেষ হইবার অন্যূন নয় মাসের মধ্যে, পূর্ববর্তী বৎসরের নিট মুনাফার ৫ শতাংশ (৫%) অর্থ ৮০:১০:১০ অনুপাতে যথাক্রমে অংশগ্রহণ তহবিল, কল্যাণ তহবিল এবং বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশন আইন, ২০০৬ এর ধারা ১৬ এর অধীন স্থাপিত শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশন তহবিলে প্রদান করিবে।” পূর্বেকার আইনে মুনাফার ৫% সকল শ্রমিকের প্রাপ্য ছিল। কিন্তু মালিকরা তা কখনো দিতে চাইতেন না। সংশোধনীর ফলে মুনাফার অংশ পাওয়া শ্রমিকদের জন্য আরো কঠিন হয়ে দাঁড়াল। শ্রমিকরা, বিশেষ করে গার্মেন্টস শ্রমিকরা মুনাফার অংশ পাবেন না এবং ভবিষ্যতে রফতানিমুখী শিল্পের তালিকা যত বাড়বে, শ্রমিকের প্রাপ্য অধিকার তত কমবে। শ্রমিকের ন্যায়সংগত প্রাপ্য মুনাফার অংশ তাঁকে সরাসরি দেয়াই সংগত। শ্রমিকের টাকায় অংশগ্রহণ তহবিল ও কল্যাণ তহবিল করা ‘মাছের তেলে মাছ ভাজা’র নামান্তর।
১৮। সার্ভিস বুক একজন শ্রমিকের শ্রমজীবনের অভিজ্ঞতার স্মারক। নতুন আইনের ধারা ৬ অনুযায়ী প্রত্যেক শ্রমিকের জন্য সার্ভিস বুক রাখতে বলা হয়েছে, কিন্তু তা থাকবে মালিকের কাছে। যদিও এই আইনের ৬(৭) উপধারায় বলা হয়েছে, “(৭) কোন শ্রমিকের চাকুরীর অবসানকালে মালিক তাহার সার্ভিস বই ফেরত দিবেন।” কিন্তু শ্রমিক তার কারখানা পরিবর্তন করলে, বা শ্রমিককে ছাঁটাই বা বরখাস্ত করলে, সার্ভিস বই মালিক যদি ফেরত না দেয় তবে তা উদ্ধার করার বা পাবার কোনো উপায় বলা হয়নি এই আইনে। ফলে, অনেক মালিকপক্ষই শ্রমিকের চাকরির অবসানকালে শ্রমিককে তার প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দিতে গড়িমসি করে, বিশেষ করে যেখানে শ্রমিকের শ্রম আদালতের শরণাপন্ন হওয়া সম্ভাবনা আছে। ফলে ওই শ্রমিক ইতিমধ্যে যে কয় বছর চাকরি করেছেন সেজন্য তার প্রাপ্ত সুবিধাদি ভোগ করা থেকে বঞ্চিত করাও সহজ হয়।
১৯। শ্রম পরিচালক ও পরিদর্শকঃ শ্রম আইনের অধীনে শ্রমিকের নানামুখী যেসব অধিকারের কথা রয়েছে, সেসব আইনের প্রয়োগ নেই। বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠানে ও কারখানায় মালিকরা শ্রমিকদের সময়মত বেতনা-ভাতা ও বোনাস পরিশোধ করে না, অনেকেই সরকার ঘোষিত ন্যুনতম মজুরির চাইতে কম মজুরিতে শ্রমিকদের নিয়োগ দেয়, অনেক শিল্প প্রতিষ্ঠানেই কর্ম পরিবেশ অনিরাপদ, অধিকাংশ কারখানায় শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকার নেই বা যেকোন দাবি দাওয়া মালিকপক্ষ অন্যায়ভাবে দমন করার চেস্টা করে - প্রভৃতি অসংখ্য সমস্যা সংকট দূরে সরকারের পক্ষ থেকে নিয়মিত তদারকি জরুরি। শ্রম আইনের ৩১৭(১) ধারায় বলা হয়েছে, “এই আইনের উদ্দেশ্যে সরকার, সরকারী গেজেটে প্রজ্ঞাপন দ্বারা, একজন শ্রম পরিচালক নিযুক্ত করিবে এবং প্রয়োজনীয় সংখ্যক অতিরিক্ত শ্রম পরিচালক, যুগ্ম-শ্রম পরিচালক, উপ শ্রম পরিচালক, সহকারী শ্রম পরিচালক এবং শ্রম কর্মকর্তা নিযুক্ত করিতে পারিবে৷” এবং ৩১৮(১) ধারায় বলা হয়েছে, “এই আইনের উদ্দেশ্যে সরকার, সরকারী গেজেটে প্রজ্ঞাপন দ্বারা, একজন প্রধান পরিদর্শক নিযুক্ত করিবে এবং প্রয়োজনীয় সংখ্যক উপ-প্রধান পরিদর্শক, সহকারী প্রধান পরিদর্শক, পরিদর্শক অথবা সহকারী পরিদর্শক নিযুক্ত করিতে পারিবে৷” ৩১৭(২) ও ৩১৮(২) ধারা অনুযায়ী অতিরিক্ত শ্রম পরিচালক, যুগ্ম-শ্রম পরিচালক, উপ শ্রম পরিচালক, সহকারী শ্রম পরিচালক বা শ্রম কর্মকর্তা এবং উপ-প্রধান পরিদর্শক, সহকারী প্রধান পরিদর্শক, পরিদর্শক অথবা সহকারী পরিদর্শক নিযুক্ত করার সময়ই সরকার প্রজ্ঞাপনে তাদের প্রত্যেকের কর্মক্ষেত্র বা এলাকা বা এখতিয়ারাধীন প্রতিষ্ঠান নির্ধারণ করে দিবে। কিন্তু আইনের কোথাও কতজন শ্রমিকের কতটি শিল্প প্রতিষ্ঠানের দেখভাল বা তদারকির জন্যে কত লোকবল দরকার, সেই নির্দেশনা নেই। ফলে, অধিকংশ ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত লোকবলের অভাবে শিল্প প্রতিষ্ঠান ও কারখানাগুলো কোনরকম দেখভাল ও তদারকির মাঝেই থাকে না।
এরকম আরও অনেক ধারাতেই পদে পদে শ্রমিকের অধিকার সংকুচিত করা হয়েছে, মালিককে বাড়তি সুবিধা প্রদান করা হয়েছে। বাংলাদেশের শ্রম আইন, ২০০৬ এর কি কোনো ইতিবাচক দিক নেই? উত্তরে বলতে হয়, আছে। মালিকদের স্বার্থরক্ষার ব্যবস্থার তুলনায় অনেক কম হলেও শ্রমিকদের অধিকারের পক্ষে ও শ্রমিকের সুরক্ষায় বেশ কিছু ইতিবাচক বিধান রয়েছে। কিন্তু সেসব আইনের প্রয়োগ নেই, পর্যাপ্ত নজরদারি কর্তৃপক্ষের অভাবে এসব ইতিবাচক বিধান কেবল কাগজে কলমেই থেকে গিয়েছে। ফলে, শ্রমিকরা শ্রম আইন ২০০৬ এর সুফল খুব কমই ভোগ করতে পারছেন। সামগ্রিকভাবে পর্যালোচনা করে নির্দ্বিধায় বলা যায়, আমাদের দেশের প্রচলিত শ্রম আইন শ্রমিকদের নয়, বস্তুত মালিকশ্রেণির রক্ষাকবচ; মালিকশ্রেণির দ্বারা, মালিকের জন্য প্রণীত। এই আইন আমাদের দেশের টেকসই শিল্পায়নের সহায়ক নয়, বরং বৃহৎ পুঁজি ও সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রসমূহের স্বার্থ রক্ষাকারী বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, এডিবির ‘শ্রমিকস্বার্থ বিরোধী, প্রকৃত ও কার্যকর শিল্পায়নের ভিত্তি ধ্বংসকারী’ প্রেসক্রিপশনের প্রতিফলন মাত্র।
প্রস্তাবনা
(১) বাংলাদেশের সংবিধান ও শ্রম আইন সংস্কারের জন্যে সারা দেশের বিভিন্ন শিল্পের শ্রমিক এবং অপ্রাতিষ্ঠানিক শ্রমিক প্রতিনিধিদের সাথে এবং দেশে ক্রিয়াশীল বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের সাথে ব্যাপক আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে তাদের দাবি-দাওয়াকে গুরুত্বের সাথে বিবেচনায় নিতে হবে। খসড়া লিখনের আগে যেমন এই আলোচনা করতে হবে, তেমনি খসড়া লেখার পরে সেই খসড়ার ওপর শ্রমিক শ্রেণির মতামত সংগ্রহ ও গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করতে হবে।
(২) সংবিধানের মৌলিক অধিকার ভাগে শ্রমিক অধিকার শীর্ষক অনুচ্ছেদে প্রতিটি নাগরিকের কর্মসংস্থান ও বেকার ভাতার অধিকার, শ্রমিকের পরিবার সহ মর্যাদাপূর্ণ জীবন ধারণের জন্যে প্রয়োজনীয় জাতীয় ন্যূনতম মজুরির অধিকার, কর্মস্থলের নিরাপত্তা প্রভৃতির অধিকারের স্বীকৃতি থাকতে হবে। শিশু শ্রম নির্মূলের সাংবিধানিক দায়িত্ব রাষ্ট্রকে প্রদান করতে হবে। যেকোন কর্মে নিয়োগ, পদোন্নতি এবং মজুরির ক্ষেত্রে লিঙ্গ, জাতি, ধর্ম ভেদে বৈষম্য দূর করতে হবে।
(৩) বর্তমান শ্রম আইনের সকল অগণতান্ত্রিক, শ্রমিক ও শিল্প স্বার্থ বিরোধী ধারা বাতিল ও সংশোধন করতে হবে, শ্রমিকের অধিকার নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ধারা সংযোজন করতে হবে।
(৪) বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠান ও কল কারখানার শ্রমিকের অধিকার নিশ্চিত করার লক্ষে সমন্বিত ও বিশেষ বিশেষ শিল্প ভিত্তিক আলাদা বিধান দরকার।
(৫) একইভাবে রিকশা শ্রমিক, হকার, গৃহশ্রমিক, পরিচ্ছন্নতা কর্মী, হোটেল - রেস্টুরেন্ট - দোকান - শোরুম - শপিংমলের কর্মচারী সহ বিভিন্ন অপ্রাতিষ্ঠানিক বা অসংগঠিত শ্রমিকের সুরক্ষা ও অধিকার নিশ্চিত করার জন্যেও তাদেরকে শ্রম আইনের আওতার ভেতর আনতে হবে এবং বিশেষ আইন ও বিধি যুক্ত করতে হবে।
(৬) বাংলাদেশের সংবিধানে এবং শ্রম আইনে যেকোন শ্রমিক আন্দোলনে পুলিশ, ও অন্যান্য বাহিনী বা যৌথ বাহিনী কর্তৃক শ্রমিক নিপীড়ন ও হত্যা নিষিদ্ধ করে বিধান যুক্ত করতে হবে। শিল্প পুলিশ নামক মালিক শ্রেণীর ঠেঙ্গারে বাহিনীকে বিলুপ্ত করতে হবে।
প্রবন্ধ উপস্থাপন
শামীম ইমাম, সাধারণ সম্পাদক, জাতীয় শ্রমিক ফেডারেশন বাংলাদেশ
আলোচক
সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ, নির্বাহী পরিচালক, বিলস ও শ্রম সংস্কার কমিশন প্রধান
শারমিন সুলতানা মৌসুমী, আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট ও শ্রম আদালত, মানবাধিকার কর্মী
চৌধুরী আশিকুল আলম, সভাপতি, বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন সংঘ
সঞ্চালক
আখতার সোবহান মাসরুর, সদস্য, গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ নেটওয়ার্ক