গণতন্ত্র-ওয়েবসভা ৫: বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কঃ রাষ্ট্র বনাম জনগণ
প্রবন্ধ-১: বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের অবনতি: পররাষ্ট্রনীতির ব্যক্তিগতকরণের প্রভাব মূল্যায়ন
প্রবন্ধ রচয়িতাঃ ড. সায়মা আহমেদ এবং ড. মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিন খান
ভূমিকা
পাঁচ আগস্ট ২০২৪ এ হাসিনা সরকারের বিদায়ের পর বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক অবনতির কারণ কি? এই নিবন্ধটি বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার দ্বন্দ্বের মৌলিক বিষয়গুলি নিয়ে আলোচনা করবে যা হাসিনা-পরবর্তী সময়ে উন্মোচন হয়েছে। এই আলোচনার মূল লক্ষ্য হলো বর্তমান বাংলাদেশ-ভারতের বৈরী সম্পর্কের কারণগুলি উদ্ঘাটন করা, ভারতীয় রাজনীতিবিদদের অবমাননাকর, আক্রমণাত্মক এবং হুমকিমূলক মন্তব্যের কারণ জানা,এবং ঐতিহাসিক সংঘাতের পুনরুত্থানের কারণগুলি খতিয়ে দেখা। নিবন্ধটিতে প্রধান যে বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে তা হলো হাসিনার অধীনে বাংলাদেশের বিদেশ নীতির ব্যক্তিগতকরণ ভারত সরকারের সাথে বন্ধুত্বের জন্য অসংখ্য সুযোগ সুবিধা তৈরি করেছে এবং বিনিময়ে বাংলাদেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর স্বার্থকে উপেক্ষা করা হয়েছে।
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের সাম্প্রতিক অবনতির ক্ষেত্রে নিম্নলিখিত তিনটি বৈশিষ্ট্য লক্ষণীয়:
বাংলাদেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় বাধা সৃষ্টি করা:
ভারত দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে গণতন্ত্রীকরণ প্রক্রিয়া এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠাকে প্রতিহত করছে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা ফলাফল প্রত্যাখ্যান করা সত্ত্বেও জালিয়াতিপূর্ণ নির্বাচনকে অবাধ ও সুষ্ঠু বলে চিহ্নিত করে বাংলাদেশে হাসিনার নেতৃত্বাধীন স্বৈরশাসনকে ভারত সরকার ধারাবাহিকভাবে বৈধতা দেয়। ২০০৯ সালে হাসিনা ক্ষমতায় আসার পর থেকে বাংলাদেশে প্রকৃত বিরোধী দল নেই। নির্বাচনে কেবল যে কারচুপি হয়েছিল তা নয়, বরং ভোটারদের অংশগ্রহণও ছিল ন্যূনতম। তবুও ভারত সরকার প্রতিবারই নির্বাচনের পর হাসিনাকে অভিনন্দন জানিয়েছিল। এর সবচেয়ে নেতিবাচক দিক হলো দেড় দশক ধরে বাংলাদেশে একজন স্বৈরশাসকের প্রতি ভারতের সমর্থন বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে ভারতের উদ্দেশ্য সম্পর্কে গভীর অবিশ্বাস তৈরি করে।
বাংলাদেশে স্বৈরাচারের প্রতি ভারতের নিঃশর্ত সমর্থন এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের বিকাশের প্রতিরোধের আরেকটি প্রমাণ হল যে সাতশোরও বেশি মানুষের হত্যাকাণ্ডে হাসিনার জড়িত থাকার সংবাদ জানা সত্ত্বেও হাসিনা ও তার বোনকে নয়াদিল্লিতে রাষ্ট্রীয় সম্মান ও সুযোগ-সুবিধা দিয়ে নিরাপত্তাসহ আশ্রয় দেওয়া। শুধু সাধারণ মানুষ হত্যা নয়, হাসিনার বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে বাংলাদেশ থেকে কোটি কোটি ডলার চুরি করারও।
ভুল তথ্য ছড়িয়ে বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা উস্কে দেওয়ার চক্রান্ত:
হাসিনা-পরবর্তী সময়ে, ভারতীয় মিডিয়ায় পরিকল্পিতভাবে বাংলাদেশে সংখ্যালঘু হিন্দু জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে নৃশংস আচরণের ভুয়া খবর প্রচার করতে দেখা যায়। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশি জনগণ এবং সরকারকে অপমান ও কোণঠাসা করার উদ্দেশ্যে এগুলো করা হয় বলে প্রতীয়মান হয়। এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, ভারতীয় মিডিয়া বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িকতাকে উসকে দিয়ে হিন্দু মুসলিম সংঘাত বৃদ্ধি করার অবিরাম চেষ্টা চালিয়ে যায়। কিছু পুরানো এবং জাল ভিডিও ব্যবহার করে দাবি করে যে হাসিনার শাসন ক্ষমতা উচ্ছেদের পর বাংলাদেশে মুসলমান জনগোষ্ঠী বাংলাদেশি হিন্দুদের আক্রমণ করে। যখন আন্তর্জাতিক মিডিয়া নিরস্ত্র বিক্ষোভকারী ছাত্রছাত্রী এবং সাধারণ মানুষদের পুলিশ কর্তৃক হত্যার ফুটেজ কভার করে, ভারতীয় মিডিয়া এ বিষয়ে সম্পূর্ণ নীরব থাকে। হাসিনাকে আশ্রয় দেয়ার পর থেকে তারা প্রচার শুরু করে যে ৯ বাংলাদেশি হিন্দুকে মুসলিম বাংলাদেশিরা ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে হত্যা করেছে এবং হাসিনা-পরবর্তী সময়ে একটি মৌলবাদী শক্তির উত্থান হয়েছে। এই প্রচারগুলো সম্পূর্ণভাবে মিথ্যা তথ্যের ভিত্তিতে করা হয় কারণ আলজাজিরা, নেত্র নিউজ এবং প্রথম আলো ৯ জন বাংলাদেশি হিন্দুদের নিহত হওয়ার বিষয়ে তদন্ত রিপোর্ট বের করে এবং বলে যে তারা সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের ভিত্তিতে নয় বরং রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত বিরোধের কারণে হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। এটা খুব স্পষ্ট যে ভারতীয় মিডিয়া প্রোপাগান্ডার মাধ্যমে বাংলাদেশের জনগণকে এবং অন্তর্বর্তী সরকারকে সংখ্যালঘু হিন্দুদের হত্যাকারী হিসেবে দেখিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে হেয় প্রতিপন্ন করতে চাচ্ছিলো। হাসিনা শাসনের পতনের আগে ও পরে বাংলাদেশে হিন্দু-মুসলিম সংঘর্ষ বা কোনো ধরনের সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার কোনো যোগসূত্র প্রিন্ট বা ইলেক্ট্রনিক মিডিয়াতে পাওয়া যায় না। হাসিনার পতন হয় সম্পূর্ণভাবে স্বৈরাচার বিরোধী এবং বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের মাধ্যমে।
ভারতীয় রাজনৈতিক নেতাদের আক্রমণাত্মক বক্তব্য:
ভারতীয় মিডিয়ায় বাংলাদেশের বিরুদ্ধে অপপ্রচারের পাশাপাশি, ভারতীয় রাজনীতিবিদরা ঘৃণা ও ভুল তথ্যের ভিত্তিতে বাংলাদেশ সরকার এবং জনগণের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক এবং হুমকিমূলক বক্তব্য দিতে থাকেন হাসিনা পরবর্তী সময়ে। ফলে বাংলাদেশিদের মধ্যে ভারতবিরোধী মনোভাব ও তিক্ততা ক্রমাগত বৃদ্ধি পায় এবং দুদেশের সম্পর্কে নেতিবাচক প্রভাব পরে। ভারতীয় রাজনৈতিক নেতারা উদ্বেগ প্রকাশ করেন যে বাংলাদেশে ইসলামপন্থীরা ক্ষমতা দখল করছে। অনেক বিজেপি নেতা আক্রমণাত্মক মন্তব্য করে দাবি করেন যে জামায়াতে ইসলামি বাংলাদেশে ক্ষমতা দখল করতে প্রস্তুত, এবং আরো বড়ো ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ছড়িয়ে দেন এই বলে যে হাসিনার পতনের পিছনে পাকিস্তানের আইএসআই এর অবদান ছিল। আরো উদ্বেগজনকভাবে দেখা যায় যে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী বাংলাদেশে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা হস্তক্ষেপের দাবি করেন অথবা ভারত সরকার কে বাংলাদেশের সংখ্যালঘু হিন্দুদের রক্ষা করার জন্য ভারত সরকারকে হস্তক্ষেপের আহ্বান জানান। স্পষ্টতই ভিত্তিহীন এই হুমকি বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব এবং স্বাধীনতার উপর সরাসরি আক্রমণ।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির ব্যক্তিগতকরণ
হাসিনা শাসনামলে ভারতের প্রতি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিকে আমি ব্যক্তিগতকরনকৃত পররাষ্ট্রনীতি হিসেবে বর্ণনা করব। এর কারণ হলো, বাংলাদেশের জনগণের প্রয়োজনের তাগিদে নয়, বরং হাসিনার নিজস্ব সুবিধা এবং বৈষয়িক লাভ পূরণের জন্য পররাষ্ট্র নীতি তৈরি করা হয়েছিল। যে কোনো দেশের বৈদেশিক নীতির লক্ষ্য হল জাতীয় নিরাপত্তা, গণতন্ত্র, বাণিজ্য এবং অর্থনৈতিক উন্নয়ন রক্ষা করা। কিন্তু হাসিনার পররাষ্ট্র নীতির উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়ায় তার ব্যক্তিস্বার্থ উদ্ধার করা, অগ্রাধিকার দেয়া নিজের ওর দলীয় লোকদের ব্যবসায়িক চুক্তি সম্প্রসারণ এবং তার স্বৈরাচারী নিপীড়নমূলক শাসনের বৈধতা অর্জন।
আদানি গ্রুপের সাথে চুক্তি:
ঝাড়খণ্ডের গোড্ডা পাওয়ার প্লান্ট থেকে কয়লা-বিদ্যুৎ আমদানির জন্য ভারতের আদানি গ্রুপের সাথে হাসিনা সরকার একটি চুক্তি স্বাক্ষর করে ২০১৭ সালে। বিভিন্ন সংবাদপত্রের প্রতিবেদনে প্রকাশিত হয় যে গোড্ডা বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে বাংলাদেশে প্রায় ১৪৯৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি করা হবে। চুক্তিটি নিয়ে অনেক আলোচনা সমালোচনা তৈরি হয় সেসময় থেকে নিয়ে এখন অবধি।
মূলত তিনটি প্রধান সমস্যা এই চুক্তিতে প্রতীয়মান হয়:
প্রথমত, বাংলাদেশ কর্তৃক বাতিলের কোনো বিধান ছাড়াই চুক্তিটি করা হয় ২৫ বছরের জন্য। বাংলাদেশের জন্য চুক্তিটি অলাভজনক হলে অথবা ক্ষতিকর প্রমাণিত হলে তা থেকে বেরিয়ে আসার কোনো রাস্তা রাখা হয়নি।
দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের রামপাল ও পায়রা বিদ্যুৎ কেন্দ্রে ব্যবহৃত কয়লার তুলনায় আদানি গ্রুপের কয়লার দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি ধরা হয় চুক্তিতে। বিভিন্ন সংবাদপত্রের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে আদানি গ্রুপ প্রতি টন কয়লার জন্য ৯৬ ডলার চার্জ করেছে, যা পায়রা এবং রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য কেনা কয়লার মূল্যের চেয়ে ১৬-২১ ডলার বেশি।
তৃতীয়ত, সৌরশক্তি উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য কোনো বিনিয়োগ না করে কেন হাসিনা রেজিম বেশি দামে কয়লা-বিদ্যুৎ আমদানির জন্য পথ বেছে নিয়েছিল তা বোধগম্য নয়। কয়লা বিদ্যুৎ থেকে যে কার্বন নিঃসরণ হয় তা বায়ুমণ্ডলের জন্যেও সবচেয়ে ক্ষতিকারক হিসেবে গণ্য হয়।
উচ্চমূল্য ছাড়াও আদানির সাথে চুক্তিটি বাংলাদেশের জন্য অলাভজনক কারণ এত দামে কয়লা বিদ্যুৎ কেনার আর্থিক সামর্থ্য বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের নেই। জানা গেছে যে আদানি গ্রুপ থেকে বিদ্যুতের জন্য সাপ্তাহিক বিল হয় ২৩-২৫ মিলিয়ন ডলার, যেখানে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড ১৮ মিলিয়ন ডলার বা তার চেয়েও কম দিতে সক্ষম। ২০২৪ এর নভেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশ প্রায় ৮৫০ মিলিয়ন ডলার প্রদানে ব্যর্থ হয় আদানির কাছে। হাসিনা রেজিমকে কেন এমন চুক্তি করতে হলো যা বাংলাদেশের জন্য আর্থিক ক্ষতির কারণ তাও বোধগম্য নয়। এক্ষেত্রে একমাত্র যুক্তিসংগত ব্যাখ্যা হল যে আদানি মোদি সরকারের যেহেতু ঘনিষ্ঠ মিত্র, তাই হাসিনা যদি আদানিকে বেশি সুবিধা দিয়ে এমন একতরফা চুক্তি করে, তবে মোদী সরকার হাসিনার উপর খুশি হবে। আর এক্ষেত্রে হাসিনা অনায়াসেই বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থকে বিসর্জন দিতে পারে।
ভারতের বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স (বিএসএফ) কর্তৃক বাংলাদেশি হত্যা:
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্যানুযায়ী ২০১৩ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে ভারত ও বাংলাদেশের সীমান্ত অতিক্রম করতে গিয়ে বিএসএফ কর্তৃক নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শিকার হয় ৩৩২ বাংলাদেশি। বিএসএফ এর এসব হত্যাকাণ্ডের পেছনে যুক্তি দেয়া হয় এই বলে যে ভারত তার সীমান্ত সুরক্ষিত রাখতে চায় । আর সেকারণে বিএসএফ গুলি চালাতে বাধ্য হয় বাংলাদেশি অবৈধ অনুপ্রবেশকারী বা অভিবাসীদের থামানোর চেষ্টায়। এরকম পরিস্থিতিতে যেন মানুষ হত্যা যুক্তিসংগত কাজ তাদের দৃষ্টিতে। সীমান্তের এই হত্যাকাণ্ডগুলো এবং যেকোনো ধরনের হত্যাকাণ্ডই মানবাধিকার সনদের লঙ্ঘন। পাশাপাশি ১৯৫১ সালের শরণার্থী কনভেনশন ও আন্তর্জাতিক আইনেরও লঙ্ঘন। ভারত বাংলাদেশি অবৈধ অনুপ্রবেশকারী থেকে সীমান্ত রক্ষা করার জন্য একটি "শুট-টু-কিল" নীতি গ্রহণ করে ২০০০ সালের পর থেকে। কিন্তু বিএসএফ এবং ভারত সরকারের জানা থাকা দরকার যে এই হত্যাকাণ্ডগুলি কোথাও গ্রহণযোগ্য নয় এবং এগুলো বর্ণবাদ এবং জেনোফোবিয়াকে ভিত্তি করে পরিচালিত হচ্ছে। সীমান্তকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে মানুষ হত্যা করা হচ্ছে এমনভাবে যেন মানুষের জীবনের কোনো গুরুত্ব নেই । এসব হত্যাকাণ্ড বৈধতা পেয়ে যাচ্ছে কারণ হত্যার শিকার হচ্ছে বাংলাদেশিরা - যারা ধর্মীয়, জাতিগত এবং সাংস্কৃতিকভাবে ভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর এবং যারা অর্থনৈতিক ও সামরিক সম্পদের দিক থেকেও ভারতের চেয়ে দুর্বল।
বিএসএফ কর্তৃক সীমান্ত এলাকায় হত্যাকাণ্ড কয়েক দশক ধরে চলছে এবং মোদী সরকারের সাথে হাসিনা সরকারের বন্ধুত্ব কোনোভাবেই সীমান্তে বাংলাদেশি হত্যা বন্ধ করেনি কারণ তাদের বন্ধুত্ব ব্যক্তিগত স্বার্থকে কেন্দ্র করে, মানুষের সুরক্ষার জন্য নয়। যদিও মোদি সীমান্ত হত্যা বন্ধের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, হাসিনা সে ব্যাপারে কোনো প্রস্তাবনা নিয়ে অগ্রসর হননি এবং সীমান্তে হত্যাকাণ্ড প্রতিরোধ করার জন্য কোনও চুক্তি করতেও উদ্যোগ নেননি। এর পরিণতিতে অনেক তরুণ প্রাণ ঝরে যায় বিগত দশকে। নিরীহ গ্রামবাসীরা শিকার হয় নির্মম হত্যাকাণ্ডের। এখানে উল্লেখ্য হলো ২০১১ সালে ১৪ বছর বয়সী ফেলানী খাতুনের হত্যাকাণ্ড এবং ২০২৪ সালে ১৩ বছর বয়সী স্বর্ণা দাসের হত্যাকাণ্ড।
উপেক্ষিত হয় এক্ষেত্রে ভারতীয়দের সাথে বাংলাদেশের জনগণের অভিন্ন ইতিহাস ও সংস্কৃতি। বাংলাদেশ এখনও ভারতের সাথে ১৯৮ টি ছিটমহল ভাগাভাগি করে এবং যৌথভাবে তাদের পরিচালনা করে। উভয় পক্ষের অনেক গ্রামবাসীরা সীমান্তের হাটে স্থানীয় পণ্য ব্যবসার জন্য জড়ো হয়। আনুমানিক ৩৫ টি এমন হাট রয়েছে। উপরন্তু, রয়েছে সীমান্তের গ্রামবাসীদের ওপারে অনেক আত্মীয়স্বজন যাদের সাথে তারা দেখা করতে পছন্দ করে। যদিও কেউ কেউ চোরাচালান এবং অন্যান্য অবৈধ ব্যবসায় জড়িত থাকে, কিন্তু উভয় দেশ এই কার্যকলাপগুলি নিয়ন্ত্রণ করতেএকসাথে কাজ করতে পারে। এসব সত্ত্বেও ভারত বাংলাদেশের সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া স্থাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
পানি বণ্টন :
হাসিনা সরকারের অধীনে স্বাক্ষরিত হয়েছিল ১৯৯৬ সালের গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তিটি যা ২০২৬ সালে শেষ হতে চলেছে। যদিও গঙ্গা চুক্তিটি বাংলাদেশের জনগণের জন্য সুখ বয়ে আনেনি,তবুও প্রত্যাশা ছিল যে ২০০৯ সালে নবগঠিত হাসিনা সরকার ভারতের সাথে নদীগুলোর সমস্যা সমাধানে সক্ষম হবে। তিস্তা নদীর জন্য একটি ন্যায্য পানি বণ্টন চুক্তি নিয়ে আলোচনা হবে এবং হয়ত খুব শীঘ্রই চুক্তি স্বাক্ষরিত হবে। কিন্তু তা হয়নি। হাসিনা সরকার ভারতের পুতুল হিসাবে কাজ করেছে, আর ভারত কে দিয়েছে যা ইচ্ছা তাই করতে। হাসিনা তিস্তা চুক্তির ব্যাপারে ভারত সরকারের ওপর কখনো কোনো চাপ সৃষ্টি করেনি। আন্তঃসীমান্ত নদীগুলোর ন্যায্য পানির অংশ নিয়ে বাংলাদেশি জনগণের ন্যায্য দাবির পক্ষে সমর্থন করে কোনো বক্তব্য দেয়নি।
বাংলাদেশ এবং ভারত ৫৪ টি আন্তঃসীমান্ত নদী শেয়ার করে, এবং ভারত, উজানের দেশ হিসাবে, নদীগুলোর পানি সরানোর জন্য অসংখ্য বাঁধ নির্মাণ করেছে। হাসিনা সরকার বাধা দেয়নি। ভারত সরকারের সাথে হাসিনার গভীর বন্ধুত্ব ছিল তার স্বৈরাচারী শাসনের বৈধতা লাভের জন্যে। আর তাই নদী র পানি বণ্টন কোনো গুরুত্ব পায়নি। এ সংক্রান্ত চুক্তি এড়ানো সহ ভারত যতটা সম্ভব সুবিধা গ্রহণ তাই গ্রহণ করতে পেরেছে। বাংলাদেশ ও ভারতের একটি যৌথ নদী কমিশন রয়েছে, যেটি ২০১১ শাল থেকে ২০২১ সালের মধ্যে একবারও মিলিত হয়নি। গত ১৩ বছরে ভারত বা বাংলাদেশ কেউই তিস্তা নদী নিয়ে আলোচনার কোনো উদ্যোগ নেয়নি। এগুলি সবই প্রমাণ করে যে হাসিনা সরকার ব্যস্ত ছিল জাতীয় স্বার্থের তুলনায় বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে ব্যক্তিগত সুবিধাকে প্রাধান্য দেয়ায়, আর ভারতকে ক্ষমতার অপব্যবহারের আরও সুযোগ করে দেয়ার।
বাণিজ্য, ট্রানজিট এবং বিনিয়োগ:
বাংলাদেশ ভারতের জন্য চতুর্থ বৃহত্তম রেমিট্যান্সের উৎস এখন। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে বাংলাদেশ থেকে ভারতে ১০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স পাঠানো হয়েছে সাম্প্রতিক সময়ে। এতে স্পষ্ট হয় কত বেশি সংখ্যক ভারতীয় বাংলাদেশে নিযুক্ত। অনেক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে যে প্রায় ২৬ লাখ ভারতীয় বাংলাদেশে উচ্চ পর্যায়ের চাকরিতে নিযুক্ত রয়েছেন। এ বিষয়টি হাসিনা সরকারের সমালোচনার জন্ম দিয়েছে কারণ বাংলাদেশের বেকারত্বের হার অনেক বেশি। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে প্রায় ১৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য হয়, যার মধ্যে বাংলাদেশ শুধুমাত্র ১.৯৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের পণ্য রপ্তানি করে এবং বাকিটা ছিল ভারতের। এতে প্রমাণ পাওয়া যায় যে বাংলাদেশ প্রতি বছর ভারত থেকে যেভাবে আমদানি করছে তাতে বাংলাদেশ ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাজারে পরিণত হয়েছে। এছাড়াও বাংলাদেশ ভারতে চারটি ভিন্ন ট্রানজিট রুট প্রদান করেছে। ভারতীয় বিনিয়োগ এখানে প্রধানত অবকাঠামো, জ্বালানি এবং পরিবহণ খাতে সম্প্রসারিত হয়েছে, যেখানে মোট বিনিয়োগ হয়েছে ৩ বিলিয়ন মার্কিন দলের টো১৯ সালে এবং FDI হিসাবে বিনিয়োগ হয়েছে ১৫.৭ মিলিয়ন ডলার। এসবই ইঙ্গিত করে যে হাসিনা সরকারের সাথে বন্ধুত্বের কারণে ভারত কীভাবে লাভবান হয়েছে।
বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কের ওপর হাসিনা সরকারের পররাষ্ট্রনীতির ব্যক্তিগতকরণের প্রভাব
এমন অসংখ্য প্রমাণ রয়েছে যা দেখায় যে বাংলাদেশে একনায়কতন্ত্র থাকা এবং তাকে সমর্থন দেওয়া ভারতের জন্য উপকারী ছিল কারণ এতে ভারতের জাতীয় স্বার্থ নিশ্চিত হচ্ছিলো এবং ভারত কে কোনো মূল্য দিতে হচ্ছিলো না। অন্যদিকে হাসিনার জন্য দুর্নীতি করা এবং জনগণকে নিপীড়ন করে ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য ভারতের বৈধতা অপরিহার্য ছিল। এই কারণেই হাসিনা তার পররাষ্ট্রনীতিকে ব্যক্তিগতকরন করে শুধুমাত্র তার নিজের উদ্দেশ্য পূরণে ব্যবহার করেছে। পুরো বিষয়টি ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্কের প্রকৃত ফলাফলের উপর অসম্ভব নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। ভারত বাংলাদেশের সাথে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক এবং জনগণের সম্পর্ককে সম্পূর্ণ ভাবে উপেক্ষা করছে। হাসিনা শাসনামলে যে সুযোগ-সুবিধা ছিল মোদির শাসনামল সেই সুযোগ-সুবিধা ফিরে পেতে চাচ্ছে এবং এটাই হাসিনা-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের প্রতি বিরূপ আচরণের কারণ।
প্রবন্ধ-২: ভারতীয় মিডিয়ার বাংলাদেশ দর্শন : রাষ্ট্রীয় আধিপত্যবাদী চশমার সমস্যা
প্রবন্ধ রচয়িতাঃ অর্ক ভাদুড়ি
বাংলাদেশে এখন ঠিক কী হচ্ছে? সেখানকার সংখ্যালঘুরা কেমন আছেন? গত ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে শেখ হাসিনার সরকার পতনের পর সেদেশের পরিস্থিতি নিয়ে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম যা প্রচার করছে, তা কতটা সঠিক? বাংলাদেশ কি আফগানিস্তানে পরিণত হচ্ছে? সেখানে কি 'জয় বাংলা' স্লোগান নিষিদ্ধ করা হয়েছে? মহান মুক্তিযুদ্ধকে অস্বীকার করা হচ্ছে? এমন হাজারো প্রশ্ন এখন পশ্চিমবঙ্গের মানুষের মুখে মুখে ফিরছে৷ বাংলাদেশ তো কেবলমাত্র আমাদের প্রতিবেশি নয়, আমরা একই ভাষায় কথা বলি, আমাদের আবেগ, অনুভূতি বহুলাংশেই এক। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন পশ্চিমবঙ্গের মানুষ। তাই বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ স্বাভাবিক।
সমস্যা হল, বাংলাদেশ সংক্রান্ত খবরের জন্য অধিকাংশ ভারতীয় বাঙালি নির্ভর করেন ভারতীয় মিডিয়ার উপর। দুর্ভাগ্যজনকভাবে অধিকাংশ ভারতীয় মিডিয়া গত ৫ আগস্ট থেকে বাংলাদেশ নিয়ে যা বলছে, তার অধিকাংশই নির্জলা মিথ্যা। ভারতীয় রাষ্ট্র এই মিথ্যাকে সরাসরি মদত দিচ্ছে। ভারতীয় মিডিয়ার মিথ্যাচার যে সব সীমা পেরিয়ে গিয়েছে, তা স্বীকার করে নিতে বাধ্য হয়েছে খোদ ভারতের পররাষ্ট্রসচিব বিক্রম মিশ্রি৷ ঢাকায় গিয়ে তিনি বলেছেন, রিপাবলিক বাংলার মতো চ্যানেলগুলি যা করছে, তার সঙ্গে ভারত সরকারের কোনও যোগ নেই৷ কিন্তু এই সংবাদমাধ্যমগুলি যে আদতে বিজেপির প্রচারযন্ত্র ছাড়া অন্য কিছু নয়, তা তো কোনও গেপন তথ্য নয়। ফলে এদের পিছনে ভারতীয় অতিদক্ষিণপন্থী শক্তির মদত রয়েছে তো বটেই, তারা চেষ্টা করছে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পরিসরে বাংলাদেশ ইস্যুটিকে বাঁচিয়ে রাখতে৷ সামনেই ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচন৷ অথচ বিজেপির অবস্থা শোচনীয়। ফলে একমাত্র প্রবল ইসলামবিদ্বেষের উপর ভরসা করা বাদে তার আর অন্য কোনও উপায় নেই। দুঃখজনক হল, অন্যান্য অবিজেপি দলগুলি, যারা 'সেকুলার' হিসাবে পরিচিত, তারাও এই ইস্যুতে বিজেপির সুরে কথা বলছে। এর নেপথ্যে রয়েছে বিজেপির কাছে জমি হারানোর ভয়৷
আর্ন্তজাতিক সংবাদমাধ্যম বিবিসি, ওয়াশিংটন পোস্ট, ডয়েচে ভেলের মতো প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ সংক্রান্ত বিষয়ে ভারতীয় মিডিয়ার মিথ্যাচার নিয়ে খবর করেছে। কিন্তু খুব স্বাভাবিকভাবেই সাধারণ ভারতীয়দের কাছে মিডিয়ায় প্রকাশিত খবর ক্রস চেক বা ভেরিফাই করার কোনও সুযোগ থাকে না৷ ফলে তাঁরা বাংলাদেশের প্রকৃত অবস্থা জানতে পারছেন না।
একাত্তরের রক্তস্নাত মুক্তিযুদ্ধের গর্ভে বাংলাদেশের জন্ম৷ সেই আশ্চর্য সংগ্রামে সংহতির হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন ভারতের জনগণ৷ ভারতীয় রাষ্ট্রও তার ভূ-রাজনৈতিক প্রয়োজনে, পাকিস্তানকে দ্বিখণ্ডিত করার উদ্দেশে সর্বাত্মক সহায়তা করেছিল৷ কিন্তু তারপরের দশকগুলিতে কী এমন ঘটল যার ফলে বাংলাদেশে এখন সুতীব্র ভারতবিদ্বেষ? গত ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার পতনের পর কেন ভারতীয় মেইনস্ট্রিম মিডিয়ায় বাংলাদেশ নিয়ে এই একটানা মিথ্যাচার? সীমান্ত হত্যা, পানি/জল সংকট, অভ্যন্তরীন রাজনীতিতে সরাসরি হস্তক্ষেপের অভিযোগ, নতজানু বিদেশনীতির মতো বিষয়গুলিই বা কতখানি গুরুত্বপূর্ণ দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে? ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্কের অবনতিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকাই বা কেমন? বাংলাদেশে গড়ে ওঠা ভারতবিদ্বেষকে কি গোটা দক্ষিণ এশিয়ার সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ঝোঁকের অংশ হিসাবে দেখা সম্ভব? ভারত কি দক্ষিণ এশিয়ার ইজরায়েল হয়ে উঠতে চায়? বাংলাদেশ কি অধিকাংশ ভারতবাসীর কাছে 'অপর' (other)? এই অপরায়নের মাধ্যমে ভারতীয় অতিদক্ষিণপন্থা কীভাবে শক্তিশালী হচ্ছে? একাত্তর পরবর্তী বাংলাদেশকে কি চেনেন অধিকাংশ ভারতীয়, এমনকি যাঁরা 'প্রগতিশীল' তাঁরাও? জাসদ, সিরাজ শিকদার, বাকশাল, জিয়া, এরশাদ, নব্বই এবং তৎপরবর্তী বাংলাদেশকে চিনতে কি কোনও ঐতিহাসিক অনীহা আছে ভারতীয় বাঙালির? এই অনীহার সূচনাবিন্দু কোথায়- ১৯৪৭? ১৭৯৩? নাকি অন্য কিছু? রাষ্ট্রের কথা যদি বাদ দিই, দুই দেশের জনগণের নিজেদের মধ্যেকার বেড়াগুলি দূর করা যায় কীভাবে? এই প্রশ্নগুলির উত্তর একটি নিবন্ধে খুঁজে পাওয়া সম্ভব নয়। তবে নিরন্তর খোঁজটুকু জারি রাখা বোধহয় জরুরি৷ ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান এই খোঁজের দরজাটি আমাদের (ভারতীয় বাঙালি) সামনে অনেকখানি উন্মোচিত করেঋে।
ভারতীয় মিডিয়ার মিথ্যাচার যে ঠিক কোন মাত্রায় প্রভাব সৃষ্টি করছে তা বাংলাদেশে বসে বোঝা একটু কঠিন৷ একটি বহুল প্রচারিত টিভি চ্যানেল খবর করেছিল, বাংলাদেশে একদিনে ৪০ হাজার হিন্দুকে গণধর্ষণ করা হয়েছে। এই খবর প্রভাব পড়েছে মারাত্মক। কলকাতা সহ গোটা পশ্চিমবঙ্গের প্রতিটি জেলায়, প্রতি শহর ও গ্রামে এখনও, ৫ আগস্টের কয়েকমাস পরেও প্রধান আলোচিত বিষয় বাংলাদেশ। দেওয়ালে দেওয়ালে বাংলাদেশ নিয়ে পোস্টার। প্রায় প্রতিদিনই হিন্দুত্ববাদীদের একাধিক কর্মসূচি। ইজরায়েলের মিডিয়ার সঙ্গে তুলনা করলেও গত কয়েকমাসের ভারতীয় মিডিয়ার ভূমিকা আরও লজ্জাজনক। একজন সংবাদকর্মী হিসাবে জানি, বিভিন্ন মিডিয়ায় বিশেষ বাংলাদেশ বিট তৈরি করা হয়েছে। কিছু সাংবাদিক কেবলমাত্র বাংলাদেশ নিয়েই খবর লিখছেন রোজ। কোনও তথ্যসূত্রের বালাই নেই, কোনও কোট নেই, একটির পর একটি কল্পিত সংবাদ। একথা কখনওই বলছি না যে বাংলাদেশে সব ঠিক আছে। অর্ন্তবর্তীকালীন সরকারের বিরুদ্ধে বহু কথা বলা জরুরি। কিন্তু ভারতীয় মিডিয়া দিনকে রাত করে দিচ্ছে। একজন ভারতীয় হিসাবে এর বিরোধিতা করাটাই আমরা কিছুজন প্রধান কর্তব্য বলে মনে করছি।
ছাত্র–জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ভারতীয় গণমাধ্যমে বাংলাদেশ নিয়ে ভুয়ো খবর প্রচারের তালিকায় ভারতের অন্তত ৪৯টি গণমাধ্যমের নাম উঠে এসেছে বাংলাদেশের তথ্য যাচাই সংস্থা রিউমর স্ক্যানারের এক প্রতিবেদনে। যদিও এই প্রতিবেদন অসম্পূর্ণ। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১২ আগস্ট থেকে ৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত এই গণমাধ্যমগুলিতে অন্তত ১৩টি বড়মাপের মিথ্যা খবর প্রচারিত হয়েছে। রিউমর স্ক্যানারকে স্বীকৃতি দিয়েছে ইন্টারন্যাশনাল ফ্যাক্ট চেকিং নেটওয়ার্ক। ভারতীয় চ্যানেল রিপাবলিক বাংলা সর্বাধিক ৫টি বড় গুজব প্রচার করেছে বলে জানিয়েছে রিউমর স্ক্যানার। এরপর রয়েছে হিন্দুস্তান টাইমস, জি নিউজ ও লাইভ মিন্ট; যারা প্রত্যেকে অন্তত তিনটি গুজব বা ফেক নিউজ প্রকাশ করেছে। এ ছাড়া রিপাবলিক ইন্ডিয়া, ইন্ডিয়া টুডে, এবিপি আনন্দ ও আজতক অন্তত দুটি করে গুজব প্রচার করেছে। বলা বাহুল্য ডিসেম্বর এবং জানুয়ারি মাসে ছড়ানো ফেক নিউজের সংখ্যা আরও অনেক বেশি৷ বাস্তব হল, এই পরিসংখ্যানের অন্তত ২০ গুন বেশি মিথ্যা ছড়িয়েছে, এবং এখনও ছড়িয়ে চলেছে ভারতীয় মিডিয়া।
বাংলাদেশ নিয়ে ফেক নিউজ ছড়ানো বাকি ৪১টি গণমাধ্যমের মধ্যে রয়েছে এশিয়ান নিউজ ইন্টারন্যাশনাল (এএনআই), এনডিটিভি, ইকোনমিক টাইমস, দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, ফার্স্টপোস্ট, অপি ইন্ডিয়া, ফ্রি প্রেস জার্নাল, মিরর নাউ, ইন্ডিয়া ডটকম, দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়া, আরটি ইন্ডিয়া, সংবাদ প্রতিদিন, জি২৪, দ্য প্রিন্ট, দ্য স্টেটসম্যান, উইয়ন, ওয়ান ইন্ডিয়া, সিএনএন নিউজ ১৮, দ্য ওয়্যার, ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস, এই মুহূর্তে, মাতৃভূমি, নিউজ ৯, ক্যালকাটা নিউজ, হেডলাইনস ত্রিপুরা ন্যাশনাল, টাইমস নাউ নিউজ, দ্য ওয়াল, নিউজ ২৪, পুবের কলম, ট্রিবিউন ইন্ডিয়া, এনই ইন্ডিয়া ব্রডকাস্ট, বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, টিভি ৯, লোকমাত টাইমস, পিটিসি নিউজ, নিউজ এক্স, দ্য টাটভা, স্বরাজ্য, নিউজ বাইটস, ভাইবস অব ইন্ডিয়া ও বর্তমান পত্রিকা। এই সব মিডিয়ায় প্রকাশিত বহু ফেক নিউজ খণ্ডন করে বিবৃতি দিয়েছে বাংলাদেশের অর্ন্তবর্তীকালীন সরকার। স্বাভাবিকভাবেই সেই খণ্ডনের কোনও খবর ভারতীয় মিডিয়া প্রচার করেনি। এই ধরনের প্রচারযুদ্ধ, এতখানি মিথ্যা প্রচার কি দক্ষিণ এশিয়ায় আগে কখনও হয়েছে?
ঠিক কী রকম মিথ্যা খবর প্রচার করছে ভারতীয় মিডিয়া? দুটো উদাহরণ দেওয়া যাক৷ ভারতীয় মিডিয়ায় দাবি করা হয়েছিল, বাংলাদেশে জয় বাংলা স্লোগান নিষিদ্ধ করা হয়েছে৷ আসল সত্য হল, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ৪৯ বছর জয় বাংলা জাতীয় স্লোগান ছিলই না৷ জয় বাংলাকে ২০২০ সালে জাতীয় স্লোগান করা হয়। সেই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করা হচ্ছে। ২০২২ সালে সর্বত্র বাধ্যতামূলকভাবে জয় বাংলা স্লোগান দেওয়ার আইন প্রণনয় করা হয়। এই আইন বদলে যাচ্ছে। ঠিক যেমন ভারতের সিনেমাহলে বাধ্যতামূলকভাবে জাতীয় সঙ্গীত গাওয়ার আইন বদল জরুরি বলে করেন অনেকেই৷ বাংলাদেশে জয় বাংলা স্লোগান দিতে কোনও বাধা নেই। জয় বাংলা স্লোগান নিষিদ্ধ করাও হয়নি৷
ভারতীয় মিডিয়ায় দাবি করা হয়েছে, বিজয় দিবসের কুচকাওয়াজ বাতিল করেছে বাংলাদেশের অর্ন্তবর্তীকালীন সরকার। অর্থাৎ শেখ হাসিনা পরবর্তী বাংলাদেশ পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক বিজয় অস্বীকার করতে চায়।
এটিও নির্জলা মিথ্যাচার৷ আসল সত্য হল, বিজয় দিবসকে উৎসবমুখর করতে সারা দেশে বিজয় মেলার আয়োজন করা হচ্ছে বলে জানিয়েছিলেন অন্তর্বর্তী সরকারের মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক উপদেষ্টা ফারুক ই আজম। ঠিক তাই করাও হয়েছে। বিজয় দিবসের প্রাক্কালে অর্ন্তবর্তীকালীন সরকারের মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক উপদেষ্টা বলেন, 'বিজয় দিবস আমাদের জাতির জন্য অনন্য দিন। ৯ মাস যুদ্ধ করে জাতি এই বিজয় অর্জন করেছে। সারা দেশের মানুষ যুদ্ধে সম্পৃক্ত ছিল। একসময় গ্রামে ও সারাদেশেই এই বিজয় উৎসব হতো। ধীরে এই উৎসব নিস্ক্রিয় ছিল। এবার সারা দেশে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে বিজয় মেলা হবে।'
কেন এমন সিদ্ধান্ত? তার ব্যাখ্যা দিয়ে অর্ন্তবর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা বলেন, "আগে যে প্রচলিত কুচকাওয়াজ হতো, এতে জনগণের সম্পৃক্ততা থাকত না, সেখানে স্কাউট ও স্বেচ্ছাসেবকরা থাকত। তার সঙ্গে অন্যান্য বাহিনী থাকত। এতে সরাসরি জনগণের সম্পৃক্ততা ছিল না। এবার শিশু, নারী, পুরুষ সব শ্রেণির জনগণকে সম্পৃক্ত করা হবে।"
একথা ঠিক যে বিজয় দিবস উপলক্ষে এবার কুচকাওয়াজ হয়নি৷ কিন্তু তার কারণ কী? তার জবাবও দিয়েছেন অর্ন্তবর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা। তিনি বলেছেন, 'জাতীয় প্যারেড স্কয়ারে এবার কুচকাওয়াজ হচ্ছে না। কারণ সেনাবাহিনী এখন সারাদেশে ব্যস্ত। এটার জন্য একটা প্রস্তুতির বিষয় আছে। তাই এবার প্যারেড স্কয়ারে কুচকাওয়াজ হচ্ছে না। এটার জন্য পূর্ব প্রস্তুতি প্রয়োজন।'উপদেষ্টা বলেন, আগে প্রশাসন করত কুচকাওয়াজ, এখন প্রশাসন মেলার আয়োজন করবে। সেখানে স্ব স্ব এলাকায় মুক্তিযোদ্ধাসহ স্থানীয় সব পর্যায়ের জনগণ অংশ নেবেন। ঠিক এভাবেই উদযাপন করা হয়েছে বিজয় দিবস৷ এই দিনটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি ও প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনুস জাতীয় স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেছেন। ১৪ ডিসেম্বর প্রধান উপদেষ্টা ও রাষ্ট্রপতি জাতীয় বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে গিয়েছেন। সেখানে অনুষ্ঠান হয়েছে সম্পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায়। তারপর তাঁরা রায়েরবাজার বধ্যভূমিতেও গিয়ে শ্রদ্ধা জানান। অথচ ভারতীয় মিডিয়ায় এই নিয়ে কোনও খবর নেই।
এরকম অজস্র উদাহরণ দেওয়া যায়। ভারতীয় মিডিয়ায় ফেক নিউজ ও গুজবের মধ্যে রয়েছে শেখ হাসিনার পদত্যাগের পর তাঁর নামে ভুয়া খোলাচিঠি, মুসলিম ব্যক্তির নিখোঁজ পুত্রের সন্ধানে মানববন্ধন করার ভিডিওকে হিন্দু ব্যক্তির দাবি করে প্রচার, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের আইসিইউতে ভর্তি হওয়ার ভুয়ো খবর, বাংলাদেশে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠনগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার ভিত্তিহীন দাবি এবং ট্রাম্পের বিজয়ের পর ড. ইউনূসের ফ্রান্সে পালিয়ে যাওয়ার ভুয়ো দাবি।
এই তালিকার অন্ত নেই৷ ভারতের গণমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়া বড় বড় ভুয়ো খবর ও গুজবের মধ্যে আরও রয়েছে পাকিস্তানি জাহাজের মাধ্যমে অস্ত্র আনার মিথ্যা দাবি, চট্টগ্রামে নিহত আইনজীবী সাইফুল ইসলামকে চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের আইনজীবী হিসেবে প্রচার, বাংলাদেশে ভারতীয় চ্যানেল বন্ধ হওয়ার গুজব, বাংলাদেশে ভ্রমণ নিয়ে গ্রেট ব্রিটেনের জারি করা একটি ভ্রমণ সতর্কতা নিয়ে সম্পূর্ণ বিভ্রান্তিকর খবর প্রকাশ। ভারতীয় কিছু মিডিয়ায় দাবি করা হয়, বাংলাদেশ বিমানবাহিনী চীনের প্রযুক্তিগত সহায়তায় ভারতের চিকেন নেকের কাছে এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম বিমানঘাঁটি নির্মাণ করবে। এই দাবিটিও পুরোপুরি মিথ্যা।
এর বাইরেও প্রতিদিন অজস্র ফেক নিউজ প্রচার করা হচ্ছে। ভারতের প্রতিমা বিসর্জনের ভিডিও প্রচার করে বাংলাদেশে মুসলিমদের হামলায় হিন্দু মন্দিরে প্রতিমা ভাঙচুরের দাবি, শ্যামলী পরিবহনের বাসে হামলার মিথ্যা খবর প্রচার, চিন্ময় কৃষ্ণের আইনজীবীর ওপর হামলার মিথ্যা দাবি, চিন্ময় দাসের গ্রেপ্তারকে কেন্দ্র করে হাসপাতালের চিকিৎসাধীন এক ব্যক্তির ছবি নিয়ে গুজব ছড়ানো। ভারতীয় মিডিয়ায় দাবি করা হয়, ওই ব্যক্তি রমেন রায়, তিনি চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের আইনজীবী। যা সম্পূর্ণ মিথ্যা।
কিন্তু ভারতীয় মিডিয়া এই মিথ্যাচার কেন করছে? সংক্ষপে বলতে গেলে, গোটা দক্ষিণ এশিয়াতেই ভারতীয় আধিপত্য প্রশ্নের মুখে পড়ছে গত কয়েক বছরে। মালদ্বীপে 'ইন্ডিয়া আউট' স্লোগান দিয়ে একটি রাজনৈতিক দল ভোটে জয়ী হয়েছে। নেপালেও ভারত ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত পুষ্পকুমার দহল (প্রচণ্ড) ক্ষমতা থেকে সরে গিয়েছেন৷ শ্রীলঙ্কায় ক্ষমতায় এসেছে দীর্ঘদিন ভারত বিরোধী রাজনীতি করা 'কমিউনিস্ট ' দল জেভিপি। বাংলাদেশেও 'ভারতের বন্ধু' হাসিনা ক্ষমতা থেকে বিতাড়িত। ফলে ভারতীয় মিডিয়া অনেকটাই যেন 'কলোনি হারিয়ে ফেলার' যন্ত্রণায় ভুগছে। এই মনোবৈকল্য থেকে যত তাড়াতাড়ি ভারতীয় গণমাধ্যম বেরিয়ে আসতে পারবে, ততই মঙ্গল।
ভারতে আরেকটি প্রচারের বিষয় হল বাংলাদেশ থেকে শেখ হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার পর থেকে সংখ্যালঘুরা ভীষণ খারাপ অবস্থায় আছেন। বলা হচ্ছে শাঁখা সিঁদুর পরে পথে বেরতে পারছেন না হিন্দু মহিলারা। বাংলাদেশী হিন্দুদের একাধিক সংগঠন রীতিমতো বিবৃতি দিয়ে এই দাবি খণ্ডন করেছেন৷ তবে বিষয়টি কিঞ্চিৎ জটিল৷ বাস্তব সত্য হল, বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের উপর নির্যাতন হয়। সব সরকারের আমলেই হয়৷ এমন নয় যে শেখ হাসিনার সময় সংখ্যালঘুরা খুব ভালো ছিলেন৷ বরং বিভিন্ন তথ্য বলছে, আওয়ামী লীগের আমলে তাঁরা ভয়াবহ নিপীড়নের শিকার হয়েছিলেন৷ একইভাবে বিএনপি-জামাত জোট সরকারের আমলে, এরশাদের আমলেও তাঁরা মোটেই ভালো ছিলেন না। সমস্যা হল, ভারতীয় মিডিয়া কেবলমাত্র তখনই বাংলাদেশের সংখ্যালঘু নির্যাতন দেখতে পায়, যখন আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকে না৷ আওয়ামী লীগের আমলে সংখ্যালঘু নির্যাতন নিয়ে ভারতীয় মিডিয়া কোনও কথা বলে না৷
শেখ হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার পর বাংলাদেশের সংখ্যালঘুরা কেমন আছেন? সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তার জন্য কী করেছে নতুন সরকার? সরকারের বয়ান বলছে, বাংলাদেশে গত ৫ আগস্ট থেকে ২২ অক্টোবর পর্যন্ত সংখ্যালঘুদের উপর আক্রমণের ৮৮টি মামলায় ৭০ জন গ্রেপ্তার হয়েছেন। এরপরের ঘটনাগুলোর বিষয়েও মামলা হয়েছে। সেই তালিকাও পুলিশ করছে। এ কারণে মামলা ও গ্রেপ্তারের সংখ্যা আরও বাড়বে। বাংলাদেশ সরকারের প্রেস সচিব শফিকুল আলম মিডিয়ার প্রতিনিধিদের বলেন, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের কাছ পাওয়া তথ্য অনুযায়ী মামলা হয়েছে ৬২টি এবং সেই সব মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে ৩৫ জনকে। এছাড়াও পুজো মণ্ডপ ও উপাসনালয়ে হামলায় পুলিশের কাছে সরাসরি রিপোর্ট অনুযায়ী মামলা হয়েছে ২৬টি এবং তাতে গ্রেপ্তার হয়েছেন ৩৫ জন।
অর্ন্তবর্তীকালীন সরকার মুখে যাই বলুক, বাস্তব সত্য হল বাংলাদেশের সংখ্যালঘুরা আতঙ্কের মধ্যে আছেন৷ বিগত সরকারের আমলেও তাঁরা আতঙ্কেই থাকতেন৷ এই আতঙ্ক দূরীকরণে অর্ন্তবর্তীকালীন সরকার সত্যিই আন্তরিক কিনা তার উত্তর দেবে সময়। মনে রাখা দরকার শুধু যে হিন্দু বা বৌদ্ধরা আক্রান্ত হচ্ছেন তা নয়। বাংলাদেশে বহু মাজার ভাঙা হচ্ছে। 'তৌহিদি জনতা'র নামে চলা এই তাণ্ডবের ইতিহাস অনেক পুরনো৷ আওয়ামী লীগের আমলেও ছবিটা একইরকম ছিল৷ বরং আরও খারাপ ছিল৷ একটু তথ্য পরিসংখ্যান দিয়ে বিষয়টি দেখা যাক।
২০১১ সালে বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ৮.৫৪ শতাংশ লোক হিন্দু ছিলেন৷ কিন্তু ২০২১ সালের ছবিটা কেমন? তিন বছর আগে দেখা গেল, বাংলাদেশে হিন্দু জনসংখ্যা দশ বছরে কমে দাঁড়িয়েছে ৭.৯৫ শতাংশে। অর্থাৎ ঘোর আওয়ামী লীগ আমলে, শেখ হাসিনার আমলেই হিন্দু জনসংখ্যা কমেছে উদ্বেগজনকহারে। অথচ ভারতীয় মিডিয়া মুখে কুলুপ এঁটে রেখেছিল।
আবুল বারাকাতের হিসেব অনুযায়ী এই মেয়াদে, অর্থাৎ ২০১১-২১ কালপর্বে প্রতিদিন ৭৫০ জন হিন্দু দেশ ছেড়েছেন। চমকে দেওয়ার মতো তথ্য।
হিন্দু মহাজোটের দেওয়া হিসেবে ২০২২ সালে ১৫৪ জন হিন্দুর মৃত্যু হয়েছে নানা হিংসার ঘটনায়। একইভাবে ২০২০ সালে ১৪৯ জন এবং ২০১৯ সালে ১০৮ জন মারা গেছেন। আইন ও সালিশ কেন্দ্র ২০১৩-২০২১ এর মধ্যে ৩৬৭৯ টি বিচ্ছিন্ন হামলার ঘটনা নথিভুক্ত করেছেন। এর মধ্যে ১৫৫৯ টি ভাঙচুর, ১৬৭৮ টি মূর্তিভাঙার ঘটনা রয়েছে। এসবে অন্তত ১১ জনের মৃত্যু হয়েছে, ৫৫০ বাড়ি ৪৫০ দোকান ভাঙা হয়েছে।
১৬৭০টির বেশি মন্দির ভাঙার তথ্য নথিভুক্ত করেছে আইন ও সালিশ। ৮৬২ জন আহত হয়েছেন। বহু নারী নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে। আশ্চর্যজনক হল, শেখ হাসিনার আমলে ঘটা এই সব সাম্প্রদায়িক হিংসা নিয়ে ভারতীয় মিডিয়া বা বিজেপির মতো অতি ডানপন্থী দল সরব হয়নি৷
২০২১ সালের কথা আমাদের আলাদা করে উল্লেখ করা উচিত। ২০২১ সালের ১৩ থেকে ২২ অক্টোবরের মধ্যে কুমিল্লা, নোয়াখালি, চাঁদপুর, বান্দারবন, নরসিংদী, চট্টগ্রাম, গাজিপুরে বহু হিন্দু মন্দিরে, হিন্দুদের বাড়িঘরে দোকানে ভাঙচুর চালানো হয়। সব মিলে ৯ জনের মৃত্যু হয়। তার মধ্যে হিন্দু ছিলেন ৪ জন। ২২ টি জেলায় বিশেষ নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করতে হয়েছিল। ১৩ অক্টোবর চাঁদপুরে পুলিশ দুর্গাপুজার শোভাযাত্রায় গুলি চালায়, ৪ জনের মৃত্যু হয়। ১৪ অক্টোবরে বান্দারবনে হিন্দু মন্দির আক্রমণ করে এক আওয়ামি নেতা। নোয়াখালির বেগমগঞ্জে এক হিন্দুর দেহ পাওয়া যায়। সেই সময় বহু অপরাধীকেই ছাড় দেওয়া হয়েছে। চিহ্নিত করা হয়নি। হিন্দুরা সুরক্ষিত ছিলেন না। অথচ ভারতীয় গণমাধ্যম চুপ ছিল।
শেখ হাসিনার আমলে ২০১২ সালে রামুর বৌদ্ধপল্লীতে হামলা হয়, ২০১৩ সালে পাবনায় হিন্দুপল্লিতে হামলা হয়, ২০১৬ সালে ব্রাক্ষণবেরিয়ার নাসিরনগরে হামলা হয়, ২০১৭ সালে রংপুরের গঙ্গাচূড়ায় হিন্দু বসতিতে হামলা হয়, ২০১৯ ভোলায় হিন্দু বসতিতে হামলা হয়, ২০২১ সালের ১৭ মার্চ সুনামগঞ্জে হামলা হয়। এরকম অজস্র উদাহরণ রয়েছে। কিন্তু শেখ হাসিনার পতনের পর যে ভারতীয় গণমাধ্যম বাংলাদেশে হিন্দু নির্যাতন নিয়ে সরব, তাঁরা আওয়ামী লীগের আমলে হওয়া সংখ্যালঘু নিপীড়ন নিয়ে কোনও কথাই বলেননি।
তাহলে কি ইউনুস সরকারের আমলে সংখ্যালঘুরা খুব ভালো আছেন? একেবারেই এমন দাবি করার সুযোগ নেই৷ তাঁরা ঠিক ততটাই খারাপ আছেন, যতটা ছিলেন চার মাস আগে, শেখ হাসিনার আমলে। ইউনুস সরকারের আমলে সংখ্যালঘুরা অনিরাপদ তো বটেই। প্রকাশ্য রাজপথে আদিবাসীরা আক্রান্ত হচ্ছেন৷ ইসলামপন্থীদের বাড়বাড়ন্ত হচ্ছে। মাজার ভাঙচুর হচ্ছে। অথচ সরকার ঠুঁটো জগন্নাথ৷ ইউনুস সরকারের পুলিশের গুলি ইতিমধ্যেই প্রাণ কেড়েছে মজুরির দাবিতে পথে নামা শ্রমিকের। জনগণের উপর ভ্যাটের বোঝা চাপানো হয়েছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আহতদের চিকিৎসায় গাফিলতি চরমে। বাংলাদেশের মানুষ নিঃসন্দেহে এসবের প্রতিবাদ করবেন, সরকারকে বাধ্য করবেন গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্খাকে মর্যাদা দিতে।
বাংলাদেশ একটি ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। নতুন করে ইতিহাসকে দেখতে চেষ্টা করছে তরুণ প্রজন্ম৷ শেখ মুজিবের মূর্তিভাঙার প্রসঙ্গটিকেও এই আলোকেই দেখা জরুরি। শেখ মুজিব বাংলাদেশের ইতিহাসের এক বিরাট চরিত্র। তিনি শুরুতেই গ্রেফতার হয়ে গেলেও তাঁর নামেই নয়মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল৷ কিন্তু ১৯৭১ সাল বা তার পূর্ববর্তী মুজিব এবং একাত্তর পরবর্তী (১৯৭২-৭৫) মুজিব এক নন। ক্ষমতায় আসার পর মুজিব পরিণত হয়েছিলেন স্বৈরাচারী দানবে। তিনি তৈরি করেছিলেন একদলীয় বাকশাল, যার থেকে ভয়াবহ স্বৈরাচারী ব্যবস্থা ভারতীয় উপমহাদেশে আর হয়নি৷ মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের রক্তের দাগ শুকোনোর আগেই '৭৪ সালে তিনি লাহোরে গিয়ে আলিঙ্গন করেছিলেন ভুট্টোকে, যোগ দিয়েছিলেন ইসলামি দেশগুলির সম্মেলন। ১৯৭২-৭৫ সালে হাজার হাজার কমিউনিস্ট ও বামপন্থীদের হত্যা করেছিল মুজিবের রক্ষীবাহিনী। বীর মুক্তিযোদ্ধা, কমিউনিস্ট বিপ্লবী সিরাজ শিকদার তাঁদের অন্যতম। মুজিবের এই দিকটি চেপে রাখা হয়েছে দীর্ঘকাল। তাঁর পুর্নমূল্যায়ন জরুরি৷ মূর্তি ভাঙা কুৎসিত হটকারিতা। কিন্তু ইতিহাসকে ফিরে দেখা জরুরি।
শেখ হাসিনার নেতৃত্বে একটি স্বৈরাচারী সরকার বাংলাদেশের ক্ষমতায় ছিল। সম্পূর্ণ গণসম্মতিহীন এই সরকার ২০১৪, ২০১৮, ২০২৪ সালের নির্বাচনকে প্রহসনে পরিণত করেছিল। শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে প্রবল গণরোষকে দমনপীড়নের মাধ্যমে ১৫ বছর আটকে রাখা গেলেও ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান সব বাঁধ ভেঙে দেয়। শেখ হাসিনার পতন ঘটে। তারপর বাংলাদেশের রাজনীতিতে যে প্রত্যাশিত শূন্যতার সৃষ্টি হয়, তা ভরাট করার জন্য বেশ কিছু রাজনৈতিক দল পারস্পরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতায় লিপ্ত। সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দল বিএনপির সঙ্গে তীব্র বিরোধ চলছে তাদের একসময়ের জোটসঙ্গী জামাতে ইসলামির। মনে রাখা দরকার একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করা এই জামাতের সঙ্গে বিএনপির মতো আওয়ামী লীগও হাত মিলিয়েছিল। ১৯৯৬ সালে জামাত এবং আওয়ামী লীগ একযোগে আন্দোলন করেছিল। এক মঞ্চে বসে সাংবাদিক বৈঠক করেছিলেন শেখ হাসিনা এবং গোলাম আজম। যদিও জামাতের রাজনৈতিক শক্তি সীমিত।বিএনপি এবং জামাত ছাড়াও তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ শক্তির উত্থান ঘটছে অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে৷ অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্ররা নতুন রাজনৈতিক দল তৈরি করতে চলেছে। আপাতত জাতীয় নাগরিক কমিটি নামে একটি মঞ্চ নির্মাণ করেছে তারা। এছাড়াও বাম ও ডানপন্থী বহু দল ময়দানে আছে। আছে সেনাবাহিনীও। দুঃখের বিষয় বাংলাদেশের একাত্তর পরবর্তী রাজনীতি এবং সাম্প্রতিক রাজনৈতিক সমীকরণ নিয়ে ভারতীয় মিডিয়া সম্পূর্ণ (সচেতন বা অচেতনভাবে) অজ্ঞ৷ এখনও তারা 'বিএনপি-জামাত' লিখে চলেছে। কোনও ভারতীয় মিডিয়ায় বিএনপি বনাম জামাতের টানাপোড়েনের কথা নেই। বিএনপিকেও মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধশক্তি হিসাবে দেখাচ্ছে অধিকাংশ ভারতীয় মিডিয়া।
অর্ন্তবর্তীকালীন সরকার দুর্বল। গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী নৈরাজ্য সামাল দিতে অক্ষম৷ এটিই স্বাভাবিক। যখন কোনও বড় বিপ্লব বা অভ্যুত্থান ঘটে, তখন পুরনো কাঠামো ভেঙে পড়ে, নতুন কাঠামো গড়ে উঠতে সময় লাগে। মাঝের ঘোলাটে সময়ে রাজত্ব করে নৈরাজ্য। রুশ বিপ্লব, ফরাসী বিপ্লব, মুক্তিযুদ্ধের মতো সব বড়সড় রাজনৈতিক পালাবাদলেই এমন ঘটেছে৷ বলশেভিকরা ক্ষমতাদখলের বেশ কয়েক বছর পরেও গৃহযুদ্ধ চলমান ছিল, ফরাসী দেশ দেখেছে ক্ষমতার রঙ্গমঞ্চে একের পর এক পালাবদল, গিলোটিনে রক্তস্রোত, মুক্তিযুদ্ধের পরও প্রবল নৈরাজ্য, হাজারে হাজারে রাজনৈতিক খুন, চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষের সাক্ষী থেকেছে বাংলাদেশ। ফলে এই নৈরাজ্য স্বাভাবিক৷ নির্বাচিত সরকার ছাড়া এই নৈরাজ্য থেকে মুক্তির পথ নেই৷ কবে নির্বাচন আসবে, আপাতত সেদিকেই তাকিয়ে আছে বাংলাদেশ। নির্বাচিত সরকারের পক্ষেই সম্ভব ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নেওয়া।
গত ৫ আগস্টে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার পতন ও ভারতে পলায়নের পর থেকে বাংলাদেশ-ভারতের সম্পর্ক ভয়ানক অবনতি ঘটেছে। দুই রাষ্ট্রের মাঝে বৈরিতা বেড়েই চলেছে, ভারতীয় মিডিয়া ক্রমাগত বাংলাদেশ সম্পর্কে অপতথ্য দিয়ে যাচ্ছে, যার ফলশ্রুতিতে দুই দেশের জনগণের মাঝেও বিদ্বেষ দিনে দিনে বৃদ্ধি পাচ্ছে। ভারতে ও বাংলাদেশে যথাক্রমে বাংলাদেশ বিদ্বেষ ও ভারত বিদ্বেষ বাড়ছে, যা দুইদেশের সাম্প্রদায়িক রাজনীতিকে হৃষ্টপুষ্ট করছে। বিশেষ করে ভারতের হিন্দুত্ববাদী বিজেপি'র বাংলাদেশ বিদ্বেষের রাজনীতির সাথে তাল মেলাতে গিয়ে কংগ্রেস ও তৃণমূল কংগ্রেসস এর মত রাজনৈতিক দলগুলোর শীর্ষ নেতৃত্বও ভোটের রাজনীতিতে বাংলাদেশ বিরোধী বক্তব্য প্রদান করছেন। বর্তমান এই প্রেক্ষাপটে এসে দুই দেশের কুটনীতিক সম্পর্কে এবং দুই দেশের জনগণের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশ ও ভারতের মাঝে রাষ্ট্রীয় সম্পর্ক কখনোই সমস্যামুক্ত ছিল না। পানির ন্যায্য হিস্যা থেকে বাংলাদেশ বঞ্চিত থেকেছে, ফলে সমস্ত জলাধারগুলো শুকিয়ে মরেছে, আর বর্ষায় পানির ঢলে বাংলাদেশ প্লাবিত হয়েছে। সীমান্তে ভারত কাটাতার দিয়েই ক্ষান্ত হয়নি, দুদিন পরপর সীমান্তে ভারতীয় বিএসএফ বাহিনী গুলি করে বাংলাদেশের নিরীহ-নিরস্ত্র মানুষকে মেরেছে। বাংলাদেশের ভারতের সাথে বাণিজ্য ঘাটতিও বিশাল। আদানি-আম্বানি গ্রুপের বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী বিনিয়োগ চুক্তি থেকে শুরু করে ট্রানজিটের নামে এদেশের ভেতর দিয়ে দেয়া করিডোর সুবিধা। সবমিলেই দুই দেশের সম্পর্ক অসম, বা ভারতের আধিপত্যে বাংলাদেশের অবস্থা সঙ্গীন। তার ওপরে, ভারত আমাদের আভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করেছে, এবং ভারতের সমর্থন পেয়েই আওয়ামী লীগ এরকম ফ্যাসিস্ট দানবে পরিণত হতে পেরেছে। আওয়ামী লীগ আমলে বাংলাদেশ-ভারতের সম্পর্ক ভীষণ বন্ধুত্বপূর্ণ মনে হলেও বস্তুত সেটি ছিল দাসখতের সম্পর্ক বা প্রভু-দাসের সম্পর্ক। গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী নতুন বাংলাদেশ সেই দাসখতের সম্পর্ক থেকে বের হয়ে আসার জন্যে চেষ্টা করছে। ফলে, রাষ্ট্র পর্যায়ে সম্পর্ক উন্নয়নে ভারতকে আগে পদক্ষেপ নিতে হবে, সবার আগে বর্তমান বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগকে বাংলাদেশে পুনর্বাসনের দিবাস্বপ্ন বন্ধ করতে হবে, বাংলাদেশের ছাত্র-জনতাকে প্রাপ্য সম্মান দিতে হবে। সমতা ও সমমর্যাদার ভিত্তিতেই কেবল এই সুসম্পর্ক গড়ে ওঠা সম্ভব।
অন্যদিকে, দুইদেশের জনগণের মধ্যে যে বৈরিতা ও বিদ্বেষ তৈরি হচ্ছে, সেটা সবসময়ে একইরকম ছিল না। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের এক কোটিরও বেশি মানুষকে ভারতীয় জনগণ আশ্রয় দিয়েছিলো, তাদের দায়িত্ব তুলে নিয়েছিলো। গত জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের সময়কালেও ভারতের জনগণ বাংলাদেশের ছাত্র জনতার সমর্থনে রাজপথে নেমে এসেছিলো। সুন্দরবনে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের বিরুদ্ধে যেমন ভারতীয় জনগণ প্রতিবাদ জানিয়েছিলো, তেমনি ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে নদীর উপরে বাঁধ, ড্যাম স্থাপনের বিরুদ্ধে স্থানীয়রা ও ভারতের পরিবেশবাদীরাও আন্দোলন করেছে। ফলে, দুই দেশের মাঝে সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্প বাড়লেও, দুই দেশের শুভবুদ্ধিসম্পন্ন ও সংগ্রামী মানুষের মাঝে সংযোগ গড়ে ওঠার ইতিহাসও আমাদের সামনে রয়েছে। এবারেও ভারতীয় মিডিয়ার ক্রমাগত অপপ্রচারের বিরুদ্ধে সেখানকার অনেকেই সোচ্চার-সরব হয়েছেন。
এরকম প্রেক্ষাপটেই আমরা এই ওয়েবসভা আয়োজন করতে যাচ্ছি, যেখানে বাংলাদেশ ও ভারত- দুই দেশ থেকেই অংশগ্রহণ থাকবে। আমাদের ওয়েবসভার শিরোনাম: "বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কঃ রাষ্ট্র বনাম জনগণ"।
প্রবন্ধ উপস্থাপনঃ
তানজীমউদ্দিন খান, অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
অর্ক ভাদুড়ি, সাংবাদিক
আলোচক
নূরুল কবীর, সম্পাদক, নিউ এজ
কবীর সুমন, সঙ্গীতকার
বীথি ঘোষ, শিক্ষক ও সাংস্কৃতিক সংগঠক
স্নিগ্ধেন্দু ভট্টাচার্য, লেখক ও সাংবাদিক
সঞ্চালক
ফাহমিদুল হক, লেখক ও গবেষক