ইতিহাস

যোগেন মণ্ডলের পদত্যাগপত্র

অনুপম সৈকত শান্ত•৫ অক্টোবর, ২০২৬
যোগেন মণ্ডলের পদত্যাগপত্র
পড়ার সময়: 39 মিনিট
4 বার পঠিত
১৯৫০ সালের ৮ই অক্টোবর পাকিস্তানের তৎকালীন আইন ও শ্রমমন্ত্রী যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল কর্তৃক পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খানের কাছে প্রেরিত ঐতিহাসিক পদত্যাগপত্র।

[যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাকালীন শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এবং বাংলার তফসিলি সম্প্রদায়ের প্রথম রাজনৈতিক নেতা ছিলেন। তার জন্ম ১৯০৪ সালের ২৯ জানুয়ারি ব্রিটিশ ভারতের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির বাকেরগঞ্জ জেলার মৈস্তারকান্দিতে। বরিশালের ব্রজমোহন কলেজ থেকে আইএ এবং ১৯২৯ সালে বিএ পাশ করেন। এরপরে ১৯৩৪ সালে আইন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে কলকাতার ছোটো আদালতে শিক্ষানবিশ হিসাবে যোগ দেন। পরে ১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দে বরিশাল সদর আদালতে আইনজীবী কাজ শুরু করেন। সেসময় হতেই তিনি সামাজিকভাবে অনগ্রসর শ্রেণির উন্নতিসাধনে নিজেকে নিযুক্ত করেন। ১৯৩৭ সালের নির্বাচনে নিম্নবর্গের মানুষদের দাবিদাওয়া সামনে রেখে তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন এবং জয়ী হন। সাধারণ নির্বাচনে তিনিই প্রথম তফশিলি জাতির একমাত্র প্রতিনিধি যিনি সারা ভারতে আইনসভার একটি সাধারণ আসন দখল করতে পেরেছিলেন। বাকেরগঞ্জ-ভোলা আসন থেকে জাতীয় কংগ্রেসের সরল কুমার দত্তকে হারিয়ে দিয়েছিলেন। ১৯৩৮ সালে বঙ্গীয় বিধানসভায় তফশিলি সম্প্রদায়ভুক্ত সদস্যদের নিয়ে তিনি 'ইনডিপেনডেন্ট শিডিউলড কাস্ট পার্টি' নামে একটি তফশিলি দল গঠন করেন। ১৯৪৩ খ্রিস্টাব্দে খাজা নাজিমুদ্দিনের মন্ত্রী সভায় তিনি সমবায় ও ঋণদান বিষয়ক মন্ত্রী ছিলেন। ১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দে তিনি ভারতের অন্তর্বর্তী সরকারের আইনমন্ত্রীর দায়িত্বভার পালন করেন। বাংলার সোহরাওয়ার্দির মন্ত্রিসভায় ১৯৪৬ সালের এপ্রিল থেকে অক্টোবর পর্যন্ত কাজ করেছেন। ১৫ আগস্ট, ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাজন হয়। এরপর তিনি পাকিস্তান গণপরিষদের সদস্য ও অস্থায়ী সভাপতি হন। সংবিধান প্রণেতা হিসেবে দেশের আইন ও শ্রম মন্ত্রী হিসেবে নিযুক্ত হন। ১৯৪৯ সালের অক্টোবরে কমনওয়েলথ ও কাশ্মীরবিষয়ক মন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৫০ সালের ৮ অক্টোবর তিনি লিয়াকত আলীর মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করে ভারতে চলে যান। ১৯৬৮ সালের আজকের দিনে, অর্থাৎ ৫ অক্টোবর তারিখে তিনি পশ্চিমবঙ্গে মৃত্যুবরণ করেন।

যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডলের ৫৮ তম মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁর স্মৃতির প্রতি সম্মান জানিয়ে আমরা লিয়াকত আলীকে পাঠানো ঐতিহাসিক পদত্যাগপত্রের অনুবাদ প্রকাশ করছি। (অনুবাদ করার ক্ষেত্রে এআই-এর সহযোগিতা নেয়া হয়েছে।)]

প্রিয় প্রধানমন্ত্রী,
পূর্ববাংলার অনগ্রসর হিন্দু জনসাধারণের জীবনের মানোন্নয়নে আমার সারাজীবনের লক্ষ্য ব্যর্থ হওয়ায় অত্যন্ত ভারাক্রান্ত হৃদয় এবং তীব্র হতাশা নিয়ে আমি আপনার মন্ত্রিসভার সদস্যপদ থেকে পদত্যাগপত্র পেশ করতে বাধ্য হচ্ছি। ইন্দো-পাক উপমহাদেশে এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে আমার এই সিদ্ধান্তের পেছনের কারণগুলো বিস্তারিতভাবে তুলে ধরাটাই সঙ্গত মনে করি। সত্যকে তুলে ধরাই এর একমাত্র উদ্দেশ্য।

১। আমার পদত্যাগের দূরবর্তী ও তাৎক্ষণিক কারণগুলো বর্ণনা করার আগে, মুসলিম লীগের সাথে আমার সহযোগিতার সময়কালের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলীর একটি সংক্ষিপ্ত পটভূমি দেওয়া দরকার। ১৯৪৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাংলার কয়েকজন বিশিষ্ট লীগ নেতা আমার সাথে যোগাযোগ করার পর, আমি বঙ্গীয় আইনসভায় (Bengal Legislative Assembly) তাঁদের সাথে কাজ করতে সম্মত হই। ১৯৪৩ সালের মার্চ মাসে ফজলুল হক মন্ত্রিসভার পতনের পর, ২১ জন তফসিলি জাতির (Scheduled Caste) এম.এল.এ.-র একটি দল নিয়ে আমি খাজা নাজিমুদ্দিনের সাথে সহযোগিতা করতে রাজি হই, যিনি ছিলেন তৎকালীন মুসলিম লীগ সংসদীয় দলের নেতা। ১৯৪৩ সালের এপ্রিলে মন্ত্রিসভা গঠন করেছিলেন। আমাদের এই সহযোগিতা কয়েকটি সুনির্দিষ্ট শর্তের ওপর ভিত্তি করে ছিল—যেমন মন্ত্রিসভায় ৩ জন তফসিলি জাতির মন্ত্রী অন্তর্ভুক্ত করা, তফসিলি জাতিভুক্তদের শিক্ষার জন্য বার্ষিক পাঁচ লাখ টাকা পুনরাবৃত্তিমূলক অনুদান (recurring grant) হিসেবে দেওয়া এবং সরকারি চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে সাম্প্রদায়িক অনুপাত বিধির (communal ratio rules) পূর্ণাঙ্গ প্রয়োগ।

২। এই শর্তগুলো ছাড়াও, মুসলিম লীগের সাথে আমার কাজ করার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল—প্রথমত, বাংলার মুসলমানদের অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং তফসিলি জাতিগুলোর অর্থনৈতিক স্বার্থ মূলত অভিন্ন ছিল। মুসলমানেরা ছিল অধিকাংশই কৃষক ও শ্রমিক, আর তফসিলি জাতির সদস্যরাও তা-ই ছিল। মুসলমানদের একটি অংশ যেমন ছিল জেলে, তফসিলি জাতির একটি অংশও ছিল তেমনই জেলে। দ্বিতীয়ত, তফসিলি জাতি এবং মুসলমান—উভয় সম্প্রদায়ই শিক্ষাগতভাবে পিছিয়ে ছিল। আমি বিশ্বাস করেছিলাম যে, লীগ এবং এর মন্ত্রিসভার সাথে আমার সহযোগিতা বিস্তৃত আকারে আইন প্রণয়ন এবং প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণের পথ সুগম করবে; যা একদিকে যেমন বাংলার অধিকাংশ জনগোষ্ঠীর পারস্পরিক কল্যাণ সাধনে ও কায়েমী স্বার্থ ও বিশেষ অধিকারের ভিত্তি বিনষ্ট করতে সাহায্য করবে, অন্যদিকে সাম্প্রদায়িক শান্তি ও সম্প্রীতির ভাবধারাকে ত্বরান্বিত করবে। এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে যে, খাজা নাজিমুদ্দিন তাঁর মন্ত্রিসভায় ৩ জন তফসিলি জাতিভুক্ত মন্ত্রী নিয়েছিলেন এবং আমার সম্প্রদায়ের সদস্যদের মধ্য থেকে ৩ জনকে পার্লামেন্টারি সেক্রেটারি নিযুক্ত করেছিলেন।

সোহরাওয়ার্দী মন্ত্রিসভা
৩। ১৯৪৬ সালের মার্চ মাসে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনের পর জনাব এইচ. এস. সোহরাওয়ার্দী লীগ সংসদীয় দলের নেতা হন এবং ১৯৪৬ সালের এপ্রিলে লীগ মন্ত্রিসভা গঠন করেন। ফেডারেশনের টিকিটে নির্বাচিত একমাত্র তফসিলি জাতিভুক্ত সদস্য ছিলাম আমি। জনাব সোহরাওয়ার্দীর মন্ত্রিসভায় আমাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। সে বছর ১৬ই আগস্ট কলকাতায় মুসলিম লীগ কর্তৃক 'প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবস' (Direct Action Day) পালন করা হয়। আপনারা জানেন, এর পরিণতি হয়েছিল এক ভয়াবহ গণহত্যায়। হিন্দুরা লীগ মন্ত্রিসভা থেকে আমার পদত্যাগ দাবি করে। আমার জীবন বিপন্ন হয়ে পড়েছিল। প্রায় প্রতিদিনই আমি হুমকির চিঠি পেতে শুরু করি। কিন্তু আমি আমার নীতিতে অবিচল ছিলাম। উপরন্তু, নিজের জীবনের ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও আমাদের 'জাগরণ' পত্রিকার মাধ্যমে তফসিলি জাতির লোকজনকে কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের মধ্যকার রক্তক্ষয়ী দ্বন্দ্ব থেকে দূরে থাকার আকুল আবেদন জানিয়েছিলাম। আমি কৃতজ্ঞতার সাথে স্বীকার না করে পারছি না যে, আমার কায়স্থ হিন্দু প্রতিবেশীদের কারণেই সেদিন ক্রুদ্ধ হিন্দু জনতার আক্রোশ থেকে আমি রক্ষা পেয়েছিলাম। কলকাতার এই গণহত্যার পর ১৯৪৬ সালের অক্টোবরে ঘটে 'নোয়াখালী দাঙ্গা'। সেখানে তফসিলি জাতিসহ অনেক হিন্দুকে হত্যা করা হয় এবং শত শত হিন্দুকে জোরপূর্বক ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত করা হয়। হিন্দু নারীরা ধর্ষিত ও অপহৃত হন। আমার সম্প্রদায়ের সদস্যরাও ধনপ্রাণ হারায়। এই ঘটনার পর পরই আমি ত্রিপুরা (কুমিল্লা) ও ফেনী সফর করি এবং কয়েকটি দাঙ্গা উপদ্রুত এলাকা প্রত্যক্ষ করি। হিন্দুদের অবর্ণনীয় দুঃখ-কষ্ট আমাকে গভীর শোকে অভিভূত করেছিল, তবুও আমি মুসলিম লীগের সাথে সহযোগিতার নীতি অব্যাহত রেখেছিলাম। কলকাতার ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডের পরপরই সোহরাওয়ার্দী মন্ত্রিসভার বিরুদ্ধে একটি অনাস্থা প্রস্তাব আনা হয়। শুধুমাত্র আমার প্রচেষ্টার কারণেই অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান চারজন সদস্য এবং এযাবৎ কংগ্রেসের সাথে থাকা চারজন তফসিলি জাতিভুক্ত এম.এল.এ.-র সমর্থন লাভ সম্ভব হয়েছিল, তা না হলে সেই মন্ত্রিসভার পতন ঘটত।

৪। ১৯৪৬ সালের অক্টোবরে, অত্যন্ত অপ্রত্যাশিতভাবে জনাব সোহরাওয়ার্দীর মাধ্যমে ভারতের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারে একটি পদের প্রস্তাব আমার কাছে আসে। অনেক দ্বিধাদ্বন্দ্ব এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য মাত্র এক ঘণ্টা সময় পাওয়ার পর, আমি কেবল এই শর্তেই প্রস্তাবটি গ্রহণ করতে সম্মত হই যে—আমার নেতা ড. বি. আর. আম্বেদকর যদি আমার এই পদক্ষেপে অসন্তোষ প্রকাশ করেন, তবে আমাকে পদত্যাগ করার অনুমতি দিতে হবে। ভাগ্যক্রমে, লন্ডন থেকে পাঠানো একটি টেলিগ্রামে আমি তাঁর অনুমোদন পাই। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আইনমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিতে দিল্লিতে রওনা হওয়ার আগে, আমি তৎকালীন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী জনাব সোহরাওয়ার্দীকে রাজি করিয়েছিলাম যাতে তিনি তাঁর মন্ত্রিসভায় আমার জায়গায় তফসিলি জাতির দু'জনকে মন্ত্রী করেন এবং তফসিলি জাতি ফেডারেশন গ্রুপ থেকে দু'জনকে পার্লামেন্টারি সেক্রেটারি নিয়োগ করেন।

৫। আমি ১৯৪৭ সালের ১লা নভেম্বর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারে যোগ দিই। প্রায় এক মাস পর যখন আমি কলকাতা সফর করি, তখন জনাব সোহরাওয়ার্দী আমাকে পূর্ববঙ্গের কয়েকটি অংশের সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সম্পর্কে অবহিত করেন; বিশেষ করে গোপালগঞ্জ মহকুমায়, যেখানে নমঃশূদ্ররা সংখ্যাগুরু ছিল এবং সেখানে উত্তেজনা অত্যন্ত চরমে পৌঁছেছিল। তিনি আমাকে সেসব এলাকা সফর করতে এবং মুসলিম ও নমঃশূদ্রদের সভায় ভাষণ দেওয়ার অনুরোধ জানান। বাস্তব ঘটনা হলো, ওইসব এলাকার নমঃশূদ্ররা প্রতিশোধ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। আমি প্রায় এক ডজন জনাকীর্ণ সভায় বক্তৃতা দিই। এর ফলে নমঃশূদ্ররা প্রতিশোধের সিদ্ধান্ত পরিত্যাগ করে। এভাবে একটি সম্ভাব্য ও বিপজ্জনক সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা এড়ানো সম্ভব হয়েছিল।

৬। কয়েক মাস পর, ব্রিটিশ সরকার তাঁদের ৩রা জুনের বিবৃতি (১৯৪৭) প্রকাশ করে, যাতে ভারত বিভাগের নির্দিষ্ট কিছু প্রস্তাব অন্তর্ভূক্ত ছিল। সমগ্র দেশ, বিশেষ করে অমুসলিম ভারত এতে চমকে উঠেছিল। সত্যের খাতিরে আমাকে স্বীকার করতেই হবে যে, আমি সবসময়ই মুসলিম লীগের পাকিস্তান দাবিকে কেবল আলোচনার একটি হাতিয়ার হিসেবে বিবেচনা করতাম। যদিও আমি সত্য অন্তরে অনুভব করতাম যে, সামগ্রিক ভারতের প্রেক্ষাপটে উচ্চবর্ণের হিন্দু বর্ণবাদের বিরুদ্ধে মুসলমানদের ক্ষোভের যথার্থ কারণ ছিল; তা সত্ত্বেও আমি এই দৃঢ় মত পোষণ করতাম যে, পাকিস্তান সৃষ্টি কখনোই সাম্প্রদায়িক সমস্যার সমাধান করবে না। বরঞ্চ এটি সাম্প্রদায়িক ঘৃণা ও তিক্ততাকে আরও বাড়িয়ে তুলবে। তাছাড়া, আমি বিশ্বাস করতাম যে এটি পাকিস্তানের মুসলমানদের অবস্থারও কোনো উন্নতি ঘটাবে না। দেশভাগের অবশ্যম্ভাবী পরিণতি হতো উভয় রাষ্ট্রের খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষের দারিদ্র্য, নিরক্ষরতা এবং শোচনীয় অবস্থাকে দীর্ঘায়িত করা, এমনকি চিরস্থায়ী করে তোলা। আমি আরও আশঙ্কা করেছিলাম যে, পাকিস্তান দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম পিছিয়ে পড়া ও অনুন্নত দেশে পরিণত হতে পারে।

লাহোর প্রস্তাব
৭। আমি স্পষ্টভাবে বলতে চাই যে, আমি বুঝতে পারছিলাম পাকিস্তানকে একটি বিশুদ্ধ 'ইসলামিক' রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করা হবে—যেমনটি বর্তমানে শরিয়ত এবং ইসলামের বিধান ও সূত্রের ওপর ভিত্তি করে করা হচ্ছে। তবে আমি আশা করেছিলাম যে, ১৯৪০ সালের ২৩শে মার্চ লাহোরে গৃহীত মুসলিম লীগের প্রস্তাবে যেভাবে চিন্তা করা হয়েছিল, মূল নীতিতে পাকিস্তান সেভাবেই গড়ে উঠবে। সেই প্রস্তাবে অন্যান্য বিষয়ের মধ্যে বলা হয়েছিল:
(১) "ভৌগোলিক দিক থেকে সংলগ্ন এলাকাগুলোকে আঞ্চলিক পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে এমনভাবে চিহ্নিত করতে হবে যে, উত্তর-পশ্চিম ও উত্তর-পূর্ব ভারতের যেসব অঞ্চলে মুসলমানেরা সংখ্যাগরিষ্ঠ, সেগুলোকে একত্র করে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র গঠন করতে হবে, যেখানে এর অঙ্গরাজ্যগুলো হবে স্বায়ত্তশাসিত ও সার্বভৌম।" এবং
(২) "সংখ্যালঘুদের সাথে পরামর্শক্রমে তাদের ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও অন্যান্য অধিকার ও স্বার্থ সুরক্ষার জন্য সংবিধানে পর্যাপ্ত, কার্যকর ও বাধ্যবাধকতামূলক সুরক্ষার সুনির্দিষ্ট বিধান রাখতে হবে।"

এই সূত্রে যা নিহিত ছিল তা হলো:
(ক) উত্তর-পশ্চিম ও পূর্বের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলগুলোকে দুটি স্বাধীন রাষ্ট্রে রূপান্তর করা হবে,

(খ) এই রাষ্ট্রগুলোর অঙ্গরাজ্যগুলো স্বায়ত্তশাসিত ও সার্বভৌম হবে,

(গ) সংখ্যালঘুদের অধিকার ও স্বার্থ উভয়ই নিশ্চিত করা হবে। এবং তা তাদের জীবনের সর্বক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে, এবং

(ঘ) সংখ্যালঘুদের সাথে পরামর্শ করেই এই সম্পর্কিত সাংবিধানিক বিধানসমূহ প্রণয়ন করতে হবে।
১৯৪৭ সালের ১১ই আগস্ট গণপরিষদের সভাপতি হিসেবে কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ যে বক্তব্য দিয়েছিলেন, তাতে আমার এই বিশ্বাস এবং লীগের শীর্ষ নেতৃত্বের প্রতি আস্থা আরও দৃঢ় হয়েছিল। তিনি হিন্দু ও মুসলমানদের প্রতি সমান আচরণের সুদৃঢ় প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন এবং সবাইকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন যে তারা সকলেই পাকিস্তানি। তখন ধর্মীয় ভিত্তিতে জনগণকে পূর্ণাঙ্গ মুসলিম নাগরিক এবং 'জিম্মি' (যাঁরা ইসলামিক রাষ্ট্র ও তার মুসলিম নাগরিকদের চিরস্থায়ী হেফাজতে থাকবে) হিসেবে বিভাজিত করার কোনো প্রশ্নই ছিল না। কায়েদে আজমের ইচ্ছা ও চিন্তাভাবনাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে, সংখ্যালঘুদের ক্ষতি ও মর্যাদাহানি ঘটিয়ে আপনার অজান্তে বা অনুমোদনে প্রতিটি প্রতিশ্রুতি যে প্রকাশ্যে লঙ্ঘন করা হচ্ছে, তা স্পষ্ট।

বাংলা বিভাগ
৮। এই প্রসঙ্গে এও উল্লেখ করা যেতে পারে যে, আমি বাংলা বিভাগের ঘোর বিরোধী ছিলাম। এই উদ্দেশ্যে প্রচারণা চালাতে গিয়ে আমাকে কেবল চারদিক থেকে চরম প্রতিরোধের মুখেই পড়তে হয়নি, বরং অবর্ণনীয় গালিগালাজ, অপমান ও লাঞ্ছনার শিকারও হতে হয়েছিল। অত্যন্ত দুঃখের সাথে আমার সেই দিনগুলোর কথা মনে পড়ে, যখন এই ভারত-পাকিস্তান উপমহাদেশের ৩২ কোটি হিন্দু আমার দিকে পেছন ফিরে দাঁড়িয়েছিল এবং আমাকে হিন্দু ও হিন্দুধর্মের শত্রু হিসেবে আখ্যায়িত করেছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও পাকিস্তানের প্রতি আমার আনুগত্যে আমি অবিচল ও অটল ছিলাম। এটা অত্যন্ত কৃতজ্ঞতার বিষয় যে, পাকিস্তানের ৭০ লাখ তফসিলি জাতির মানুষের কাছে করা আমার আকুল আবেদন তাদের কাছ থেকে এক তাৎক্ষণিক ও উচ্ছ্বসিত সাড়া পেয়েছিল। তারা আমাকে তাদের অকৃত্রিম সমর্থন, সহানুভূতি ও উৎসাহ জুগিয়েছিল।

৯। ১৯৪৭ সালের ১৪ই আগস্ট পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর আপনি পাকিস্তান মন্ত্রিসভা গঠন করেন, যেখানে আমাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয় এবং খাজা নাজিমুদ্দিন পূর্ববঙ্গের জন্য একটি অন্তর্বর্তীকালীন মন্ত্রিসভা গঠন করেন। ১০ই আগস্ট করাচিতে খাজা নাজিমুদ্দিনের সাথে আমি কথা বলেছিলাম এবং পূর্ববঙ্গ মন্ত্রিসভায় ২ জন তফসিলি জাতিভুক্ত মন্ত্রী নেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছিলাম। তিনি পরবর্তীতে তা করবেন বলে প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু এর পর এই বিষয়ে যা ঘটেছিল, তা ছিল আপনার, খাজা নাজিমুদ্দিন এবং পূর্ববঙ্গের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী জনাব নূরুল আমিনের সাথে অত্যন্ত অপ্রীতিকর ও হতাশাজনক আলোচনার ইতিহাস। আমি যখন বুঝতে পারলাম খাজা নাজিমুদ্দিন নানা অজুহাতে বিষয়টি এড়িয়ে যাচ্ছেন, তখন আমি প্রায় অধৈর্য ও ব্যাকুল হয়ে পড়ি। আমি বিষয়টি পাকিস্তান মুসলিম লীগ এবং এর পূর্ববঙ্গ শাখার সভাপতিদের সাথেও আলোচনা করি। অবশেষে, বিষয়টিকে আপনার দৃষ্টিগোচর করি। আপনি আপনার বাসভবনে আমার উপস্থিতিতে খাজা নাজিমুদ্দিনের সাথে বিষয়টি আলোচনা করার সদয় সম্মতি দিয়েছিলেন। খাজা নাজিমুদ্দিন ঢাকায় ফিরে একজন তফসিলি জাতিভুক্ত মন্ত্রী নিতে সম্মত হন। যেহেতু খাজা নাজিমুদ্দিনের আশ্বাসের বিষয়ে আমি আগেই সংশয়ী হয়ে উঠেছিলাম, তাই আমি একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা সম্পর্কে নিশ্চিত হতে চেয়েছিলাম। আমি জোর দিয়েছিলাম যে তাঁকে এক মাসের মধ্যে এই পদক্ষেপ নিতে হবে, অন্যথায় আমি পদত্যাগ করতে স্বাধীন থাকব। আপনি এবং খাজা নাজিমুদ্দিন উভয়ই এই শর্তে রাজি হন। কিন্তু হায়! আপনি হয়তো মন থেকে তা বলেননি। খাজা নাজিমুদ্দিন তাঁর কথা রাখেননি। জনাব নূরুল আমিন পূর্ববঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর, আমি আবারও তাঁর কাছে বিষয়টি উত্থাপন করি। তিনিও এড়িয়ে যাওয়ার সেই পুরনো পরিচিত কৌশল অনুসরণ করেন।

১৯৪৯ সালে আপনার ঢাকা সফরের পূর্বে যখন আমি পুনরায় এই বিষয়ে আপনার দৃষ্টি আকর্ষণ করি, তখন আপনি আমাকে আশ্বাস দিয়েছিলেন যে পূর্ববঙ্গে সংখ্যালঘু মন্ত্রী নিয়োগ করা হবে এবং বিবেচনার জন্য আমার কাছে ২/৩টি নাম চেয়েছিলেন। আপনার ইচ্ছাকে শ্রদ্ধার সাথে মেনে নিয়ে, আমি পূর্ববঙ্গ অ্যাসেম্বলিতে আমাদের 'ফেডারেশন গ্রুপ'-এর একটি নোট পাঠাই এবং তিনটি নাম প্রস্তাব করি। ঢাকা থেকে ফিরে আসার পর কি হয়েছে সে সম্পর্কে আমি যখন খোঁজ নিলাম, তখন আপনাকে অত্যন্ত শীতল দেখায় এবং কেবল মন্তব্য করেন: "নূরুল আমিন দিল্লি থেকে ফিরে আসুক"। কয়েকদিন পর আমি আবার বিষয়টি তাগিদ দিই। কিন্তু আপনি বিষয়টি এড়িয়ে যান। তখন আমি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হতে বাধ্য হই যে, আপনার বা জনাব নূরুল আমিনের কাউরই পূর্ববঙ্গ মন্ত্রিসভায় তফসিলি জাতির কোনো মন্ত্রী নেওয়ার বিন্দুমাত্র ইচ্ছা ছিল না। তাছাড়া, আমি লক্ষ করছিলাম যে জনাব নূরুল আমিন এবং পূর্ববঙ্গের কিছু লীগ নেতা তফসিলি জাতি ফেডারেশনের সদস্যদের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টির চেষ্টা করছিলেন। মনে হচ্ছিল আমার নেতৃত্ব ও ব্যাপক জনপ্রিয়তাকে তারা আশঙ্কাজনক মনে করছিলেন। আমার স্পষ্টভাষী স্বভাব, সতর্কতা এবং সার্বিকভাবে পাকিস্তানের সংখ্যালঘুদের এবং বিশেষ করে তফসিলি জাতির স্বার্থ সুরক্ষায় আমার আন্তরিক প্রচেষ্টা—পূর্ববঙ্গ সরকার ও কয়েকজন লীগ নেতার কাছে বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তবুও অবিচল থেকে আমি পাকিস্তানের সংখ্যালঘুদের স্বার্থ রক্ষায় দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করি।

হিন্দু-বিরোধী নীতি
১০। যখন বাংলা বিভাগের প্রশ্নটি ওঠে, তখন তফসিলি জাতির মানুষ বিভাজনের সম্ভাব্য বিপজ্জনক ফলাফল নিয়ে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিল। তৎকালীন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী জনাব সোহরাওয়ার্দীর কাছে তাঁদের পক্ষ থেকে স্মারকলিপি পেশ করা হয়। তিনি সংবাদমাধ্যমে একটি বিবৃতি দিয়ে ঘোষণা করেন যে, দেশভাগের পর তফসিলি জাতির মানুষ এযাবৎ ভোগ করে আসা কোনো অধিকার বা সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবে না; তারা কেবল বর্তমান অধিকার ও সুযোগ-সুবিধাই ভোগ করবে না, বরং অতিরিক্ত সুবিধাও পাবে। এই আশ্বাস জনাব সোহরাওয়ার্দী কেবল ব্যক্তিগত ক্ষমতায় দেননি, বরং লীগ মন্ত্রিসভার মুখ্যমন্ত্রী হিসেবেও দিয়েছিলেন। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের সাথে বলতে হচ্ছে যে, দেশভাগের পর, বিশেষ করে কায়েদে আজমের মৃত্যুর পর, তফসিলি জাতি কোনো বিষয়েই ন্যায্য বিচার পায়নি। আপনি স্মরণ করতে পারেন যে, সময়ে সময়ে আমি তফসিলি জাতির কষ্ট ও অভিযোগের কথা আপনার দৃষ্টিগোচর করেছি। পূর্ববঙ্গের প্রশাসনিক অদক্ষতার স্বরূপ আমি একাধিকবার আপনার কাছে ব্যাখ্যা করেছি। পুলিশ প্রশাসনের বিরুদ্ধে আমি গুরুতর অভিযোগ এনেছি। তুচ্ছ অজুহাতে পুলিশের বর্বর অত্যাচারের নানা ঘটনা আমি আপনার নজরে এনেছি। পূর্ববঙ্গ সরকার, বিশেষ করে পুলিশ প্রশাসন এবং মুসলিম লীগের একটি অংশ যে হিন্দু-বিরোধী নীতি অনুসরণ করছিল, তা আপনার কাছে প্রকাশ করতে আমি বিন্দুমাত্র কুণ্ঠাবোধ করিনি।

কিছু ঘটনা
১১। প্রথম যে ঘটনাটি আমাকে স্তব্ধ করেছিল তা ঘটেছিল গোপালগঞ্জের কাছে 'দিঘোরকুল' নামক একটি গ্রামে, যেখানে একজন মুসলমানের মিথ্যা অভিযোগের ভিত্তিতে স্থানীয় নমঃশূদ্রদের ওপর নির্মম অত্যাচার চালানো হয়। ঘটনাটি ছিল—নৌকা নিয়ে যাওয়া এক মুসলিম ব্যক্তি মাছ ধরার জন্য জাল ফেলার চেষ্টা করেন। সেখানে আগে থেকেই একই উদ্দেশ্যে উপস্থিত থাকা এক নমঃশূদ্র তাঁর সামনে জাল ফেলতে বাধা দেন। এর জেরে তর্কাতর্কি হয় এবং উক্ত মুসলিম ব্যক্তি ক্ষুব্ধ হয়ে কাছের এক মুসলিম গ্রামে গিয়ে মিথ্যা অভিযোগ করেন যে, তাঁকে এবং তাঁর নৌকায় থাকা এক নারীকে নমঃশূদ্ররা মারধর করেছে। সেই সময় গোপালগঞ্জের এস.ডি.ও. একটি নৌকায় করে খাল দিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি কোনো তদন্ত না করেই অভিযোগটিকে সত্য বলে ধরে নেন এবং নমঃশূদ্রদের শাস্তি দিতে সশস্ত্র পুলিশ পাঠান। সশস্ত্র পুলিশ আসে এবং স্থানীয় মুসলিমরাও তাদের সাথে যোগ দেয়। তারা কেবল নমঃশূদ্রদের কয়েকটি বাড়িতে চড়াও-ই হয়নি, নারী ও পুরুষ উভয়কেই নির্মমভাবে প্রহার করে, তাদের ঘরবাড়ি ভাঙচুর করে এবং মূল্যবান জিনিসপত্র লুট করে নিয়ে যায়। এক অন্তঃসত্ত্বা নারীকে বেধড়ক প্রহারের ফলে ঘটনাস্থলেই তাঁর গর্ভপাত ঘটে। স্থানীয় কর্তৃপক্ষের এই নৃশংস আচরণ বিস্তীর্ণ এলাকায় চরম আতঙ্কের সৃষ্টি করেছিল।

১২। পুলিশি নির্যাতনের দ্বিতীয় ঘটনাটি ঘটে ১৯৪৯ সালের শুরুর দিকে বরিশাল জেলার গৌরনদী থানার অধীনে। এখানে একটি ইউনিয়ন বোর্ডের সদস্যদের দুটি গ্রুপের মধ্যে ঝগড়া হয়। একটি গ্রুপ, যারা পুলিশের ভালো নজরে ছিল, তারা প্রতিপক্ষকে 'কমিউনিস্ট' আখ্যা দিয়ে তাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে। থানা আক্রমণের হুমকি আছে—এমন খবরের ভিত্তিতে গৌরনদীর ও.সি. সদর দপ্তর থেকে সশস্ত্র বাহিনী তলব করেন। সশস্ত্র বাহিনীর সাহায্যে পুলিশ তখন এলাকার বিপুল সংখ্যক বাড়িতে তল্লাশি চালায়, এমনকী যাঁরা কখনো রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিলেন না—কমিউনিস্ট পার্টি তো দূরের কথা—সেইসব অনুপস্থিত বাড়ির মালিকদের ঘর থেকেও মূল্যবান সম্পত্তি লুট করে নিয়ে যায়। বিস্তীর্ণ এলাকা থেকে বহু লোককে গ্রেপ্তার করা হয়। অনেক হাই স্কুলের শিক্ষক ও ছাত্রদের কমিউনিস্ট সন্দেহে অহেতুক হয়রানি করা হয়। এই এলাকাটি আমার নিজ গ্রামের খুব কাছে হওয়ায় আমাকে ঘটনার কথা জানানো হয়। আমি তদন্তের জন্য জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এবং এস.পি.-কে চিঠি লিখি। স্থানীয় লোকজনের একটি অংশও এস.ডি.ও.-র কাছে তদন্তের প্রার্থনা জানায়। কিন্তু কোনো তদন্ত করা হয়নি। এমনকি জেলা কর্তৃপক্ষ আমার চিঠির প্রাপ্তিস্বীকার পর্যন্ত করেনি। এরপর আমি স্বয়ং আপনারসহ পাকিস্তানের সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষের নজরে বিষয়টি আনি, কিন্তু কোনো লাভ হয়নি।

সেনাবাহিনীর জন্য নারী
১৩। সিলেট জেলার হবিগঞ্জে নিরপরাধ হিন্দু, বিশেষ করে তফসিলি জাতির ওপর পুলিশ ও সেনাবাহিনী কর্তৃক যে অত্যাচার চালানো হয়েছিল, তার বিবরণ দেওয়া প্রয়োজন। নিরপরাধ নারী-পুরুষকে নির্মমভাবে নির্যাতন করা হয়, কয়েকজন নারীকে ধর্ষণ করা হয়, পুলিশ ও স্থানীয় মুসলিমরা তাদের বাড়িতে চড়াও হয়ে মালামাল লুট করে। এলাকায় মিলিটারি পিক বসানো হয়। সেনাবাহিনী কেবল এই মানুষদের ওপর অত্যাচার চালিয়ে হিন্দু বাড়ি থেকে জোরপূর্বক মালামাল নিয়েই ক্ষান্ত হয়নি, বরং সামরিক ক্যাম্পে জোয়ানদের পাশবিক ক্ষুধা মেটাতে রাতের বেলা হিন্দু নারীদের পাঠাতে বাধ্য করেছিল। এই ঘটনাটিও আমি আপনার দৃষ্টিগোচর করেছিলাম। আপনি আমাকে এ বিষয়ে রিপোর্টের আশ্বাস দিয়েছিলেন, কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো কোনো রিপোর্টই আর পাওয়া যায়নি।

১৪। এরপর রাজশাহী জেলার নাচোল-এ ঘটনাটি ঘটে, যেখানে কমিউনিস্ট দমনের নামে কেবল পুলিশই নয়, পুলিশের সহায়তায় স্থানীয় মুসলিমরাও হিন্দুদের ওপর অত্যাচার চালায় এবং তাদের সম্পত্তি লুটপাট করে। এরপর সাঁওতালরা সীমান্ত পেরিয়ে পশ্চিমবঙ্গে চলে যায়। মুসলিম ও পুলিশের চালানো অবর্ণনীয় নৃশংসতার গল্প তারা সেখানে গিয়ে বর্ণনা করে।

১৫। চরম নির্দয় ও ঠাণ্ডা মাথার নৃশংসতার একটি দৃষ্টান্ত হলো ১৯৪৯ সালের ২০শে ডিসেম্বর খুলনা জেলার মোল্লারহাট থানার অধীন 'কলশিরা' গ্রামে ঘটে যাওয়া ঘটনাটি। ঘটনাটি ঘটেছিল—কয়েকজন কথিত কমিউনিস্টের খোঁজে গভীর রাতে চারজন কনস্টেবল কালশিরা গ্রামের জয়দেব ব্রহ্মের বাড়িতে হানা দেয়। পুলিশের টের পেয়ে জনা ছয়েক যুবক, যাদের মধ্যে কয়েকজন হয়তো কমিউনিস্ট হতে পারত, ঘর থেকে পালিয়ে যায়। পুলিশ কনস্টেবলরা ঘরে ঢুকে জয়দেব ব্রহ্মের স্ত্রীকে মারধর করে। স্ত্রীর চিৎকার শুনে তাঁর স্বামী এবং ঘরে থাকা পালিয়ে যাওয়া কয়েকজন সহযোগী ফিরে আসেন। মরিয়া হয়ে তাঁরা ঘরে ঢুকে দেখেন মাত্র একটি বন্দুকসহ ৪ জন কনস্টেবল রয়েছে। এটি হয়তো সেই যুবকদের উৎসাহিত করেছিল, তাঁরা এক সশস্ত্র কনস্টেবলকে আঘাত করলে তিনি ঘটনাস্থলেই মারা যান। যুবকেরা এরপর অন্য এক কনস্টেবলকে আক্রমণ করলে বাকি দুজন পালিয়ে গিয়ে চিৎকার জুড়ে দেয়, যা শুনে আশেপাশের কিছু লোক তাদের উদ্ধার করতে আসে। ঘটনাটি সূর্যোদয়ের আগে অন্ধকারে ঘটায় গ্রামবাসীরা আসার আগেই হামলাকারীরা লাশ নিয়ে পালিয়ে যায়।

পরদিন বিকেলে খুলনার এস.পি. একদল সৈন্য ও সশস্ত্র পুলিশ নিয়ে ঘটনাস্থলে হাজির হন। ইতোমধ্যে মূল হামলাকারীরা পালিয়ে যায় এবং বুদ্ধিমান প্রতিবেশীরাও চম্পট দেয়। কিন্তু অধিকাংশ গ্রামবাসী যেহেতু সম্পূর্ণ নির্দোষ ছিল এবং ঘটনার পরিণতি বুঝতে ব্যর্থ হয়েছিল, তাই তারা নিজ নিজ বাড়িতেই থেকে যায়। পরবর্তীতে এস.পি., সেনাবাহিনী ও সশস্ত্র পুলিশ সমগ্র গ্রামের নিরপরাধ মানুষদের নির্মমভাবে পেটাতে শুরু করে এবং প্রতিবেশী মুসলিমদের তাদের মালামাল লুটে নিতে উৎসাহিত করে। বহু লোককে হত্যা করা হয় এবং নারী ও পুরুষদের জোরপূর্বক ধর্মান্তরিত করা হয়। পারিবারিক দেব-দেবী ভাঙচুর করা হয় এবং উপাসনালয়সমূহ অপবিত্র ও ধ্বংস করা হয়। পুলিশ, সেনাবাহিনী ও স্থানীয় মুসলিমদের হাতে একাধিক নারী ধর্ষিত হন। এভাবে দেড় মাইল দৈর্ঘ্য ও বিশাল জনসংখ্যার কেবল কলশিরা গ্রামেই নয়, বরঞ্চ আশেপাশের বেশ কয়েকটি নমঃশূদ্র গ্রামেও যেন এক নরক নেমে এসেছিল। কলশিরা গ্রামটিকে কর্তৃপক্ষ কখনো কমিউনিস্ট কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র হিসেবে সন্দেহ করেনি। ঝালরডাঙ্গা নামে আরেকটি গ্রাম, যা কালশিরা থেকে ৩ মাইল দূরে অবস্থিত, সেটি কমিউনিস্ট কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল। ওইদিন পুলিশ কথিত কমিউনিস্টদের খোঁজে সেই গ্রামে বড় ধরনের অভিযান চালায়, যাদের কয়েকজন পালিয়ে গিয়ে কালশিরা গ্রামের ওই বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিল—যা তারা নিরাপদ স্থান মনে করেছিল।

১৬। আমি ১৯৫০ সালের ২৮শে ফেব্রুয়ারি কালশিরা এবং আশেপাশের দুই-একটি গ্রাম পরিদর্শন করি। খুলনার এস.পি. এবং জেলার কয়েকজন বিশিষ্ট লীগ নেতা আমার সাথে ছিলেন। কালশিরা গ্রামে এসে আমি জায়গাটিকে একদম জনমানবহীন ও ধ্বংসস্তূপে পরিণত হতে দেখি। এস.পি.-র উপস্থিতিতেই আমাকে জানানো হয়েছিল যে, এই গ্রামে ৩৫০টি বসতবাড়ি ছিল, যার মধ্যে মাত্র ৩টি বাদ দিয়ে বাকি সবই গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। নমঃশূদ্রদের দেশি নৌকা এবং গবাদি পশু সবই ছিনিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। আমি এই তথ্যগুলো পূর্ববঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী, প্রধান সচিব, আইজিপি এবং আপনার কাছে রিপোর্ট করেছিলাম।

১৭। এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যেতে পারে যে, এই ঘটনার খবর পশ্চিমবঙ্গের পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয় এবং সেখানকার হিন্দুদের মনে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। কালশিরার বেশ কিছু নির্যাতিত পুরুষ ও নারী, গৃহহীন ও নিঃস্ব হয়ে কলকাতায় চলে যান এবং তাঁদের ওপর ঘটে যাওয়া দুঃখ-কষ্টের কাহিনী বর্ণনা করেন, যার ফলে জানুয়ারির শেষভাগে পশ্চিমবঙ্গে কিছু সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ঘটে।

ফেব্রুয়ারির দাঙ্গার কারণ
১৮। এটা অবশ্যই খেয়াল রাখা দরকার যে, কালশিরার ঘটনার প্রতিক্রিয়া হিসেবে পশ্চিমবঙ্গে ঘটে যাওয়া কয়েকটি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার খবর পূর্ববঙ্গের সংবাদমাধ্যমে অত্যন্ত অতিরঞ্জিতভাবে প্রকাশ করা হয়েছিল। ১৯৫০ সালের ফেব্রুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহে যখন পূর্ববঙ্গ বিধানসভার বাজেট অধিবেশন শুরু হয়, তখন কংগ্রেস সদস্যরা কালশিরা ও নাচোলে সৃষ্ট পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনার জন্য দুটি মুলতবি প্রস্তাব (adjournment motion) আনার অনুমতি চান। কিন্তু প্রস্তাব দুটি খারিজ করে দেওয়া হয়। এর প্রতিবাদে কংগ্রেস সদস্যরা বিধানসভা থেকে ওয়াকআউট করেন। হিন্দু সদস্যদের এই পদক্ষেপ কেবল মন্ত্রীদেরই নয়, প্রদেশের মুসলিম নেতা ও কর্মকর্তাদেরও অত্যন্ত ক্রুদ্ধ ও উত্তেজিত করে তোলে। ১৯৫০ সালের ফেব্রুয়ারিতে ঢাকা ও পূর্ববঙ্গের দাঙ্গার অন্যতম প্রধান কারণ ছিল সম্ভবত এটিই।

১৯। এটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ যে, ১৯৫০ সালের ১০ই ফেব্রুয়ারি সকাল ১০টার দিকে এক নারীকে গায়ে লাল রং মেখে সাধারণের সামনে আনা হয়—এটি বোঝাতে যে কলকাতার দাঙ্গায় তাঁর স্তন কেটে ফেলা হয়েছে—এবং তাঁকে ঢাকার পূর্ববঙ্গ সচিবালয়ের চারপাশে ঘুরিয়ে দেখানো হয়। সাথে সাথে সচিবালয়ের সরকারি কর্মচারীরা কাজ বন্ধ করে মিছিল নিয়ে বেরিয়ে পড়ে এবং হিন্দুদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধের স্লোগান দিতে থাকে। এক মাইলেরও বেশি পথ অতিক্রম করার সাথে সাথে মিছিলটি বড় হতে থাকে। দুপুর ১২টার দিকে ভিক্টোরিয়া পার্কে একটি সমাবেশের মাধ্যমে এটি শেষ হয়, যেখানে কর্মকর্তা সহ একাধিক বক্তা হিন্দুদের বিরুদ্ধে সহিংস বক্তব্য প্রদান করেন। মজার ব্যাপার হলো, সচিবালয়ের কর্মচারীরা যখন বাইরে মিছিলে ব্যস্ত, ঠিক তখনই পূর্ববঙ্গ সরকারের মুখ্য সচিব একই ভবনে তাঁর পশ্চিমবঙ্গীয় সমকক্ষের সাথে বৈঠক করছিলেন—উভয় বাংলায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বন্ধের উপায় ও পন্থা খোঁজার জন্য!

কর্মকর্তারা লুটেরাদের সাহায্য করেছেন
২০। দুপুর ১টার দিকে পুরো শহরজুড়ে একযোগে দাঙ্গা শুরু হয়। শহরের সব অংশে হিন্দু দোকানপাট ও ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগ, লুটপাট এবং যেখানেই হিন্দু পাওয়া গেছে তাদের হত্যা করার কাজ পুরোদমে শুরু হয়। এমনকি মুসলিমদের কাছ থেকেও আমি এমন প্রমাণ পেয়েছি যে, উচ্চপদস্থ পুলিশ কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতেই অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট চালানো হয়েছে। হিন্দুদের সোনার দোকানগুলো পুলিশ অফিসারদের সামনেই লুট করা হয়েছে। তারা কেবল লুটপাট থামানোর চেষ্টাই করেনি, বরং পরামর্শ ও দিকনির্দেশনা দিয়ে লুটেরাদের সাহায্যও করেছে। দুর্ভাগ্যবশত, আমি একই দিনে অর্থাৎ ১৯৫০ সালের ১০ই ফেব্রুয়ারি বিকেল ৫টায় ঢাকায় পৌঁছাই। আমার চরম হতাশার বিষয় হলো, খুব কাছ থেকে এসব প্রত্যক্ষ ও অনুধাবন করার সুযোগ আমার হয়েছিল। আমি যা দেখেছি এবং প্রথম হাতের তথ্য থেকে যা জেনেছি, তা ছিল এক কথায় অবিশ্বাস্য এবং হৃদয়বিদারক।

দাঙ্গার পটভূমি
২১। ঢাকা দাঙ্গার কারণ ছিল প্রধানত পাঁচটি:
(১) কালশিরা ও নাচোল সংক্রান্ত দুটি মুলতবি প্রস্তাব খারিজ হয়ে যাওয়ার পরে প্রতিবাদ হিসেবে অ্যাসেম্বলির হিন্দু সদস্যরা ওয়াকআউট করার মতো সাহসী পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য তাদেরকে উপযুক্ত শিক্ষা দেওয়া।
(২) সংসদীয় দলে সোহরাওয়ার্দী গ্রুপ এবং নাজিমুদ্দিন গ্রুপের মধ্যকার মতভেদ ও টানাপোড়েন চরম আকার ধারণ করেছিল।
(৩) হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের নেতাদের দ্বারা পূর্ব ও পশ্চিম বাংলা পুনঃএকত্রীকরণের আন্দোলন শুরু হওয়ার আশঙ্কায় পূর্ববঙ্গ সরকার ও মুসলিম লীগ ভীত হয়ে পড়েছিল। তারা এই ধরনের যেকোনো পদক্ষেপ রুখে দিতে চেয়েছিল। তারা ভেবেছিল যে পূর্ববঙ্গে বড় ধরনের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হলে পশ্চিমবঙ্গে নিশ্চিতভাবে তার প্রতিক্রিয়া হবে, যেখানে মুসলিমরা নিহত হতে পারে। তারা বিশ্বাস করত যে পূর্ব ও পশ্চিম বাংলা উভয় স্থানে এই দাঙ্গার ফলাফলে বাংলা পুনঃএকত্রীকরণের যেকোনো আন্দোলন বন্ধ করা সম্ভব হবে।
(৪) পূর্ববঙ্গে বাঙালি মুসলিম এবং অ-বাঙালি মুসলিমদের মধ্যে বৈরী ভাব দানা বাঁধছিল। পূর্ববঙ্গের হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে ঘৃণা সৃষ্টি করেই কেবল এটি প্রতিরোধ করা সম্ভব ছিল। ভাষা প্রশ্নটিও এর সাথে জড়িত ছিল। এবং
(৫) পূর্ব বাংলার অর্থনীতিতে অ-অবমূল্যায়ন (non-devaluation) এবং ভারত-পাকিস্তান বাণিজ্য অচলাবস্থার প্রভাব সবচেয়ে তীব্রভাবে পড়তে শুরু করেছিল শহর ও গ্রাম উভয় অঞ্চলেই। আর আসন্ন এই অর্থনৈতিক বিপর্যয় থেকে সাধারণ মুসলিম জনগণের দৃষ্টি অন্যদিকে ঘোরাতে মুসলিম লীগের সদস্য ও কর্মকর্তারা হিন্দুদের বিরুদ্ধে একপ্রকার 'জিহাদ' বা ধর্মযুদ্ধের প্ররোচনা দিতে চেয়েছিল।

স্তব্ধকারী বিবরণ—প্রায় ১০,০০০ নিহত
২২। ঢাকায় আমার ৯ দিন অবস্থানের সময়, আমি শহর ও শহরতলির অধিকাংশ দাঙ্গা উপদ্রুত এলাকা পরিদর্শন করেছি। আমি তেজগাঁও থানার অধীন মিরপুরও পরিদর্শন করি। ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ এবং ঢাকা ও চট্টগ্রামের মধ্যবর্তী রেললাইনে ট্রেনের ভেতর শত শত নিরপরাধ হিন্দুকে হত্যার খবর আমাকে সবচেয়ে কঠিন আঘাত হেনেছিল। ঢাকা দাঙ্গার দ্বিতীয় দিনে আমি পূর্ববঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর সাথে দেখা করি এবং জেলা শহর ও গ্রামীণ এলাকায় দাঙ্গা ছড়ানো রোধে সব ধরনের সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিতে জেলা কর্তৃপক্ষকে তাৎক্ষণিক নির্দেশ দেওয়ার অনুরোধ জানাই।

১৯৫০ সালের ২০শে ফেব্রুয়ারি আমি বরিশাল শহরে পৌঁছাই এবং বরিশালের ঘটনা শুনে স্তব্ধ হয়ে যাই। জেলা শহরে বিপুল সংখ্যক হিন্দু ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে এবং বহু সংখ্যক হিন্দুকে হত্যা করা হয়েছে। আমি জেলার প্রায় সব দাঙ্গা উপদ্রুত এলাকা পরিদর্শন করেছি। কাশিপুর, মাধবপাশা এবং লাখুটিয়ার মতো জায়গায় মুসলিম দাঙ্গাবাজদের তাণ্ডব দেখে আমি স্রেফ হতবাক হয়ে গিয়েছিলাম, যা জেলা শহর থেকে মাত্র ছয় মাইলের ব্যাসার্ধের মধ্যে ছিল এবং পাকা রাস্তার সাথে যুক্ত ছিল। মাধবপাশা জমিদারের বাড়িতে প্রায় ২০০ জন নিহত এবং ৪০ জন আহত হন। মুলাদী নামে একটি স্থান এক ভয়াবহ নরক প্রত্যক্ষ করেছিল। কেবল মুলাদী বন্দর বাজারেই নিহতের সংখ্যা তিনশরও বেশি হবে—যা স্থানীয় মুসলিম কর্মকর্তা সহ অনেকে আমাকে জানিয়েছিলেন। আমি মুলাদী গ্রামও পরিদর্শন করি, যেখানে নদীর তীরে অনেক জায়গায় লাশের কঙ্কাল দেখতে পাই। নদীর ধারে কুকুর ও শকুনকে মানুষের লাশ খেতে দেখেছি। আমি সেখানে তথ্য পেয়েছি যে, সমস্ত প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষকে পাইকারি হারে হত্যার পর, সমস্ত তরুণীকে দুষ্কৃতকারীদের মূল নেতাদের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়েছিল। রাজাপুর থানার অধীন কৈবর্তখালী নামক একটি স্থানে ৬৩ জন নিহত হন। উক্ত থানা ভবন থেকে সামান্য দূরে থাকা হিন্দু ঘরবাড়ি লুটপাট, অগ্নিসংযোগ এবং বাসিন্দাদের হত্যা করা হয়। বাবুগঞ্জ বাজারের সমস্ত হিন্দু দোকান লুটপাটের পর পুড়িয়ে দেওয়া হয় এবং প্রচুর সংখ্যক হিন্দুকে হত্যা করা হয়। প্রাপ্ত বিস্তারিত তথ্যের ভিত্তিতে, কেবল বরিশাল জেলাতেই নিহতের সংখ্যা রক্ষণশীল হিসাবে ২,৫০০ জন বলে ধারণা করা হয়েছিল। ঢাকা ও পূর্ববঙ্গের দাঙ্গায় মোট নিহতের সংখ্যা আনুমানিক ১০,০০০ জনের কাছাকাছি ছিল। যেসব নারী ও শিশু তাঁদের নিকটাত্মীয়সহ সর্বস্ব হারিয়েছিলেন, তাঁদের বিলাপ আমার হৃদয় গলিয়ে দিয়েছিল। আমি কেবল নিজেকে প্রশ্ন করেছিলাম, "ইসলামের নামে পাকিস্তানে এগুলো কী ঘটছে!"

দিল্লি চুক্তি বাস্তবায়নে সদিচ্ছার অভাব
২৩। মার্চের শেষের দিকে বাংলা থেকে হিন্দুদের ব্যাপক হারে দেশত্যাগ শুরু হয়। মনে হচ্ছিল অল্প সময়ের মধ্যে সমস্ত হিন্দু ভারতে পাড়ি জমাবে। ভারতে যুদ্ধের দাবি ওঠে। পরিস্থিতি অত্যন্ত সঙ্কটজনক হয়ে পড়ে। এক জাতীয় দুর্যোগ যেন অবধারিত হয়ে উঠেছিল। তবে ৮ই এপ্রিলের 'দিল্লি চুক্তি' (Liaquat-Nehru Pact)-র মাধ্যমে সেই সম্ভাব্য বিপর্যয় এড়ানো সম্ভব হয়। প্যানিক বা আতঙ্কে থাকা হিন্দুদের হারিয়ে যাওয়া মনোবল পুনরুজ্জীবিত করার উদ্দেশ্যে, আমি পূর্ববঙ্গে একটি বিস্তৃত সফর পরিচালনা করি। আমি ঢাকা, বরিশাল, ফরিদপুর, খুলনা ও যশোর জেলার একাধিক স্থান পরিদর্শন করি। আমি ডজন ডজন জনাকীর্ণ সভায় ভাষণ দিই এবং হিন্দুদের সাহস সঞ্চার করে তাঁদের পূর্বপুরুষের ভিটেমাটি না ছাড়ার অনুরোধ জানাই। আমার এই আশা ছিল যে পূর্ববঙ্গ সরকার এবং মুসলিম লীগ নেতারা দিল্লি চুক্তির শর্তাবলী বাস্তবায়ন করবেন। কিন্তু সময় গড়াচ্ছের সাথে সাথে আমি উপলব্ধি করতে শুরু করি যে পূর্ববঙ্গ সরকার বা মুসলিম লীগ নেতা—কেউই দিল্লি চুক্তি বাস্তবায়নের বিষয়ে প্রকৃতপক্ষে আন্তরিক ছিলেন না। পূর্ববঙ্গ সরকার কেবল দিল্লি চুক্তিতে ভাবা কাঠামোগুলো স্থাপন করতেই নারাজ ছিল না, বরং এই উদ্দেশ্যে কার্যকর পদক্ষেপ নিতেও ইচ্ছুক ছিল না। যেসব হিন্দু দিল্লি চুক্তির পরপরই নিজ গ্রামে ফিরে এসেছিলেন, তাঁদের ঘরবাড়ি ও জমিজমায় দখল দেওয়া হয়নি, যা ইতিমধ্যে মুসলিমরা দখল করে নিয়েছিল।

মাওলানা আকরাম খাঁ-র উসকানি
২৪। লীগ নেতাদের উদ্দেশ্য সম্পর্কে আমার সন্দেহ আরও নিশ্চিত হয় যখন আমি প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সভাপতি মাওলানা আকরাম খাঁ-র 'মোহাম্মাদী' নামক একটি মাসিক পত্রিকার 'বৈশাখ' সংখ্যায় সম্পাদকীয় মন্তব্য পড়ি। ঢাকা রেডিও স্টেশন থেকে পাকিস্তানের সংখ্যালঘু বিষয়ক মন্ত্রী ড. এ. এম. মালিকের প্রথম রেডিও সম্প্রচারের ওপর মন্তব্য করতে গিয়ে—যেখানে ড. এ. এম. মালিক বলেছিলেন, "এমনকি হযরত মুহাম্মদ (সঃ) আরবে ইহুদিদের ধর্মীয় স্বাধীনতা দিয়েছিলেন"; মাওলানা আকরাম খাঁ বলেন, "ড. মালিক আরবের ইহুদিদের কথা তাঁর বক্তব্যে না আনলেই ভালো করতেন। এটা সত্যি যে আরবের ইহুদিদের হযরত মুহাম্মদ (সঃ) ধর্মীয় স্বাধীনতা দিয়েছিলেন; কিন্তু সেটা ছিল ইতিহাসের প্রথম অধ্যায়। শেষ অধ্যায়ে নবী মুহাম্মদ (সঃ)-এর সুস্পষ্ট নির্দেশ রয়েছে, যা হলো: 'আরব থেকে সমস্ত ইহুদিদের তাড়িয়ে দাও'।" মুসলিম সম্প্রদায়ের রাজনৈতিক, সামাজিক ও আধ্যাত্মিক জীবনে অত্যন্ত উচ্চ পদে সমাসীন একজন ব্যক্তির এই সম্পাদকীয় মন্তব্য সত্ত্বেও, আমি কিছু আশা পোষণ করেছিলাম যে নূরুল আমিন মন্ত্রিসভা হয়তো ততটা অআন্তরিক নাও হতে পারে। কিন্তু আমার সেই আশা পুরোপুরি চুরমার হয়ে যায় যখন জনাব নূরুল আমিন দিল্লি চুক্তির আলোকে সংখ্যালঘুদের প্রতিনিধিত্ব করার জন্য ডি. এন. বারারীকে (D.N. Barari) মন্ত্রী হিসেবে নির্বাচন করেন। দিল্লি চুক্তিতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে সংখ্যালঘুদের মনে আস্থা ফিরিয়ে আনতে পূর্ববঙ্গ ও পশ্চিমবঙ্গ সরকারের মন্ত্রিসভায় তাঁদের একজন প্রতিনিধি নেওয়া হবে।


নূরুল আমিন সরকারের অসাধুতা
২৫। একটি বিবৃতিতে আমি প্রকাশ্যে মতামত ব্যক্ত করেছিলাম যে, সংখ্যালঘুদের প্রতিনিধি হিসেবে ডি. এন. বারারীকে মন্ত্রী পদে নিয়োগ দেওয়াটা কোনো আস্থা ফেরাতে সাহায্য করেইনি; বরং এর বিপরীতে, নূরুল আমিনের সরকারের সদিচ্ছা সম্পর্কে সংখ্যালঘুদের মনে যদি সামান্যতম আশা বা ভুল ধারণা থেকে থাকে, তাও ধূলিসাৎ করে দিয়েছে। আমার নিজের প্রতিক্রিয়া ছিল যে জনাব নূরুল আমিনের সরকার কেবল অআন্তরিকই নয়, বরং তারা দিল্লি চুক্তির প্রধান উদ্দেশ্যগুলোকেই ব্যর্থ করে দিতে চেয়েছিল। আমি আবারও স্পষ্ট করে বলছি যে, ডি. এন. বারারী নিজেকে ছাড়া আর কাউকেই প্রতিনিধিত্ব করেন না। তিনি কংগ্রেসের অর্থ ও সংগঠনের শক্তিতে কংগ্রেসের টিকিটে বঙ্গীয় আইনসভায় নির্বাচিত হয়েছিলেন। তিনি তফসিলি জাতি ফেডারেশনের প্রার্থীদের বিরোধিতা করেছিলেন। নির্বাচনের কিছুদিন পর তিনি কংগ্রেসের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে আমাদের ফেডারেশনে যোগ দেন। এরপর যখন তাঁকে মন্ত্রী নিয়োগ করা হয়, তখন তিনি আর আমাদের ফেডারেশনের সদস্যও ছিলেন না। আমি জানি, পূর্ববঙ্গের হিন্দু সম্প্রদায় আমার সাথে একমত যে অতীত ইতিহাস, চরিত্র বা মানসিক যোগ্যতা—কোনো দিক দিয়েই বারারী দিল্লি চুক্তিতে উল্লিখিত একজন মন্ত্রীর পদের যোগ্য নন।

২৬। আমি এই পদের জন্য জনাব নূরুল আমিনকে তিনটি নাম সুপারিশ করেছিলাম। আমার সুপারিশকৃত প্রথম ব্যক্তি ছিলেন ঢাকা হাইকোর্টের একজন এম.এ., এলএল.বি. ডিগ্রিধারী আইনজীবী। তিনি বাংলা বিধানসভায় প্রথম ফজলুল হক মন্ত্রিসভায় ৪ বছরেরও বেশি সময় মন্ত্রী ছিলেন। তিনি প্রায় ৬ বছর কলকাতার 'কোল মাইনস স্টোয়িং বোর্ড'-এর চেয়ারম্যান ছিলেন এবং তফসিলি জাতি ফেডারেশনের সিনিয়র সহ-সভাপতি ছিলেন। আমার দ্বিতীয় মনোনীত ব্যক্তি ছিলেন একজন বি.এ., এলএল.বি.। তিনি পূর্ববর্তী শাসনব্যবস্থায় ৭ বছর লেজিসলেটিভ কাউন্সিলের সদস্য ছিলেন। আমি জানতে চাই, এই দুই যোগ্য ব্যক্তিকে গ্রহণ না করে এবং আমার জোরালো ও যৌক্তিক আপত্তি থাকা সত্ত্বেও অন্য একজনকে মন্ত্রী বানানোর পেছনে জনাব নূরুল আমিনের কী যুক্তিসঙ্গত কারণ থাকতে পারে? কোনো দ্বিমত ছাড়াই আমি বলতে পারি যে, দিল্লি চুক্তির দোহাই দিয়ে বারারীকে মন্ত্রী হিসেবে বেছে নেওয়ার এই ঘটনাটিই প্রমাণ করে—পূর্ববঙ্গ সরকার দিল্লি চুক্তির শর্তাবলী নিয়ে বিন্দুমাত্র আন্তরিক ছিল না। যে চুক্তির মূল উদ্দেশ্যই ছিল পূর্ববঙ্গে হিন্দুদের জীবন, সম্পত্তি, সম্মান ও ধর্মের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে তাঁদের বসবাস বজায় রাখার পরিবেশ তৈরি করা।

হিন্দুদের তাড়ানোর সরকারি পরিকল্পনা
২৭। এই প্রসঙ্গে আমি আমার সেই দৃঢ় বিশ্বাসের কথা আবারও বলতে চাই যে, পূর্ববঙ্গ সরকার এখনও প্রদেশ থেকে হিন্দুদের তাড়িয়ে দেওয়ার এক সুপরিকল্পিত নীতি অনুসরণ করে চলেছে। একাধিকবার আপনার সাথে আলোচনায় আমি আমার এই মত প্রকাশ করেছি। আমাকে বলতেই হচ্ছে যে, পাকিস্তান থেকে হিন্দুদের তাড়িয়ে দেওয়ার এই নীতি পশ্চিম পাকিস্তানে পুরোপুরি সফল হয়েছে এবং পূর্ব পাকিস্তানেও তা শেষের পথে। ডি. এন. বারারীকে মন্ত্রী বানানো এবং এই বিষয়ে আমার সুনির্দিষ্ট সুপারিশকে পূর্ববঙ্গ সরকারের চরম অবহেলার সাথে প্রত্যাখ্যান করা—এসবই তথাকথিত 'ইসলামিক রাষ্ট্র'-এর নীতির সাথে পুরোপুরি মিলে যায়। পাকিস্তান কখনোই হিন্দুদের পূর্ণ সন্তুষ্টি বা নিরাপত্তার অনুভূতি দিতে পারেনি। তারা এখন হিন্দু বুদ্ধিজীবী ও শিক্ষিত সমাজ থেকে নিষ্কৃতি পেতে চায়, যাতে পাকিস্তানের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক জীবনে তাঁরা কোনো প্রভাব ফেলতে না পারেন।

যৌথ নির্বাচন ব্যবস্থা এড়ানোর কৌশল
২৮। নির্বাচন পদ্ধতি নিয়ে কেন এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি, তা আমার বোধগম্য নয়। সংখ্যালঘু সাব-কমিটি গঠন করার পর তিন বছর পার হয়ে গেছে। কমিটি এ পর্যন্ত তিনবার বৈঠকে বসেছে। গত বছরের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত কমিটির বৈঠকে 'যৌথ নির্বাচন' নাকি 'পৃথক নির্বাচন' ব্যবস্থা থাকবে—তা নিয়ে আলোচনা হয়। তখন পাকিস্তানের সকল স্বীকৃত সংখ্যালঘু প্রতিনিধিরা অনগ্রসর সংখ্যালঘুদের জন্য আসন সংরক্ষণসহ যৌথ নির্বাচন ব্যবস্থার (Joint Electorates) পক্ষে মতামত দেন। আমরাও তফসিলি জাতির পক্ষ থেকে তাঁদের জন্য আসন সংরক্ষণসহ যৌথ নির্বাচনের দাবি জানিয়েছিলাম। গত আগস্টের বৈঠকে এই বিষয়টি নিয়ে আবার আলোচনার কথা ছিল। কিন্তু কোনো আলোচনা ছাড়াই বৈঠকটি অনিশ্চিতকালের জন্য স্থগিত করে দেওয়া হয়। পাকিস্তানের শাসকদের পক্ষ থেকে এত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কেন এই ধরনের এড়িয়ে যাওয়ার কৌশল নেওয়া হচ্ছে, তার আসল উদ্দেশ্য বোঝা কঠিন কিছু নয়।

হিন্দুদের অন্ধকার ও হতাশাজনক ভবিষ্যৎ
২৯। দিল্লি চুক্তির ফলে পূর্ববঙ্গে হিন্দুদের বর্তমান পরিস্থিতি ও ভবিষ্যৎ নিয়ে বলতে গেলে বলব—বর্তমান পরিস্থিতি কেবল অসন্তোষজনকই নয়, একেবারেই আশাহীন; আর ভবিষ্যৎ পুরোপুরি অন্ধকার ও হতাশাজনক। পূর্ববঙ্গে হিন্দুদের মনে বিন্দুমাত্র আস্থা ফিরে আসেনি। পূর্ববঙ্গ সরকার এবং মুসলিম লীগ উভয়ই এই চুক্তিকে এক টুকরো কাগজ ছাড়া আর কিছুই মনে করে না। অনেক সংখ্যক বাস্তুচ্যুত হিন্দু—যাঁদের অধিকাংশই তফসিলি জাতির কৃষক—পূর্ববঙ্গে ফিরে আসছেন মানে এই নয় যে তাঁদের আস্থা ফিরে এসেছে। এর একমাত্র অর্থ হলো পশ্চিমবঙ্গ বা ভারতের অন্য কোথাও তাঁদের থাকা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা সম্ভব হয়নি। শরণার্থী জীবনের দুঃখ-কষ্টই তাঁদের বাধ্য করছে নিজেদের ভিটেমাটিতে ফিরে আসতে। তাছাড়া তাঁদের অনেকেই আসছেন স্থাবর সম্পত্তি বিক্রি বা বন্দোবস্ত করতে এবং অস্থাবর জিনিসপত্র নিয়ে যেতে। সম্প্রতি পূর্ববঙ্গে যে বড় কোনো সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়নি, তার পেছনে এই দিল্লি চুক্তির কোনো ভূমিকা নেই। কোনো চুক্তি না থাকলেও এই ধরনের দাঙ্গা একটানা চলতে পারত না।

৩০। স্বীকার করতেই হবে যে, দিল্লি চুক্তি নিজেই সব সমাধান ছিল না। এর উদ্দেশ্য ছিল এমন একটা পরিবেশ তৈরি করা যাতে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে বিদ্যমান নানা বিরোধ ও দ্বন্দ্বের কার্যকর সমাধান হতে পারে। কিন্তু চুক্তি হওয়ার এই ছয় মাসের মধ্যে কোনো বিরোধ বা দ্বন্দ্বের প্রকৃত সমাধান হয়নি। বরং দেশে ও বিদেশে পাকিস্তানের হিন্দু-বিরোধী ও ভারত-বিরোধী অপপ্রচার পুরোদমে চলছে। পুরো পাকিস্তানজুড়ে মুসলিম লীগ কর্তৃক 'কাশ্মীর দিবস' পালন করাটা পাকিস্তানের এই ভারত-বিরোধী সাম্প্রদায়িক অপপ্রচারের স্পষ্ট প্রমাণ। সম্প্রতি পাকিস্তানের পাঞ্জাবের গভর্নরের দেওয়া বক্তব্য—যাতে তিনি বলেছেন যে ভারতের মুসলিমদের নিরাপত্তার জন্য পাকিস্তানের একটি শক্তিশালী সেনাবাহিনী প্রয়োজন—ভারতের প্রতি পাকিস্তানের আসল মনোভাব উন্মোচন করে দিয়েছে। এতে দুই দেশের মধ্যে কেবল উত্তেজনাই বৃদ্ধি পাবে।

আজ পূর্ববঙ্গে কী ঘটছে?
৩১। আজ পূর্ববঙ্গের অবস্থা কী? দেশভাগের পর থেকে প্রায় ৫০ লাখ হিন্দু দেশত্যাগ করেছেন। গত বছরের ফেব্রুয়ারি মাসের ঢাকা দাঙ্গা ছাড়াও এত বিপুল সংখ্যক হিন্দুর দেশত্যাগের পেছনে অনেকগুলো কারণ রয়েছে। মুসলিমদের দ্বারা হিন্দু আইনজীবী, ডাক্তার, দোকানদার, ব্যবসায়ী ও বণিকদের অর্থনৈতিক বয়কট হিন্দুদের জীবিকার তাগিদে পশ্চিমবঙ্গে চলে যেতে বাধ্য করেছে। আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই ঢালাওভাবে হিন্দুদের বাড়িঘর দখল করা এবং বাড়ির মালিকদের কোনো ভাড়া না দেওয়া—তাঁদের ভারতে আশ্রয় নিতে বাধ্য করেছে। হিন্দু জমিদারদের খাজনা দেওয়া অনেক আগেই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। তাছাড়া 'আনসার' বাহিনী—যাদের বিরুদ্ধে আমি সব জায়গা থেকেই অভিযোগ পেয়েছি—তারা হিন্দুদের সুরক্ষা ও নিরাপত্তার জন্য এক স্থায়ী হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। শিক্ষাব্যবস্থায় হস্তক্ষেপ এবং শিক্ষা কর্তৃপক্ষের জোরপূর্বক 'ইসলামীকরণের' চেষ্টা মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও কলেজের শিক্ষকদের তাঁদের বহুদিনের চেনা পরিবেশ থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে। তাঁরা পূর্ববঙ্গ ছেড়ে চলে গেছেন। ফলে অধিকাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে।

আমি তথ্য পেয়েছি যে কিছুদিন আগে শিক্ষা কর্তৃপক্ষ মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে এক সার্কুলার জারি করে—যেখানে ক্লাস শুরুর আগে সকল ধর্মের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের জন্য পবিত্র কুরআন তেলাওয়াতে অংশগ্রহণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। আরেকটি সার্কুলারে স্কুলের প্রধান শিক্ষকদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে তাঁরা যেন তাঁদের স্কুলের বিভিন্ন ভবন বা ব্লকগুলোর নাম জিন্নাহ, ইকবাল, লিয়াকত আলী, নাজিমুদ্দিনের মতো ১২ জন বিশিষ্ট মুসলিম ব্যক্তিত্বের নামে রাখেন। অতি সম্প্রতি ঢাকায় অনুষ্ঠিত এক শিক্ষা সম্মেলনে সভাপতি প্রকাশ করেছেন যে, পূর্ববঙ্গের ১,৫০০টি হাই স্কুলের মধ্যে মাত্র ৫০০টি চালু আছে। চিকিৎসকদের দেশত্যাগের কারণে রোগীদের সঠিক চিকিৎসার কোনো উপায় নেই বললেই চলে। যেসব পুরোহিত হিন্দু পরিবারে পূজার্চনা করতেন, তাঁদের প্রায় সবাই চলে গেছেন। গুরুত্বপূর্ণ উপাসনালয়গুলো পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। এর ফলে পূর্ববঙ্গের হিন্দুদের নিজ ধর্ম পালন এবং বিয়ের মতো সামাজিক অনুষ্ঠান করার কোনো উপায় নেই, যেখানে পুরোহিতের উপস্থিতি অপরিহার্য। যেসব কারিগর দেব-দেবীর প্রতিমা তৈরি করতেন, তাঁরাও চলে গেছেন। পুলিশ ও সার্কেল অফিসারদের প্রত্যক্ষ সহযোগিতা ও মৌনসম্মতিতে বলপ্রয়োগের মাধ্যমে ইউনিয়ন বোর্ডের হিন্দু প্রেসিডেন্টদের সরিয়ে মুসলিমদের বসানো হয়েছে। স্কুলের হিন্দু প্রধান শিক্ষক ও সচিবদের সরিয়ে মুসলিমদের আনা হয়েছে। অল্প কয়েকজন হিন্দু সরকারি কর্মচারীর জীবন অত্যন্ত করুণ করে তোলা হয়েছে—তাঁদের জুনিয়র মুসলিমদের পদোন্নতি দিয়ে এদের ডিঙিয়ে যাওয়া হয়েছে অথবা বিনা কারণে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। অতি সম্প্রতি চট্টগ্রামের এক হিন্দু পাবলিক প্রসিকিউটরকে (সরকারি আইনজীবী) একতরফাভাবে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে; যা শ্রীমতি নেলী সেনগুপ্তের এক বিবৃতিতে পরিষ্কার হয়ে গেছে—যাঁকে অন্তত মুসলিম-বিরোধী পক্ষপাত বা দ্বেষের দোষে দোষী করা যাবে না।

হিন্দুদের কার্যত আইনবহির্ভূত ঘোষণা করা হয়েছে
৩২। ডাকাতি, চুরি এমনকী খুনের ঘটনা আগের মতোই চলছে। থানাগুলো হিন্দুরা অভিযোগ করতে গেলে তার অর্ধেকও খাতায় তোলে না। হিন্দু মেয়েদের অপহরণ ও ধর্ষণের ঘটনা যে কিছুটা কমেছে, তার একমাত্র কারণ হলো পূর্ববঙ্গে ১২ থেকে ৩০ বছর বয়সী কোনো উচ্চবর্ণের হিন্দু মেয়ে এখন আর অবশিষ্ট নেই। অনগ্রসর শ্রেণীর যে অল্প কিছু মেয়ে তাঁদের বাবা-মার সাথে গ্রামাঞ্চলে বাস করছেন, তাঁরাও মুসলিম গুন্ডাদের হাত থেকে রেহাই পাচ্ছেন না। আমি মুসলিমদের দ্বারা তফসিলি জাতির মেয়েদের ধর্ষণের একাধিক ঘটনার তথ্য পেয়েছি। বাজারে হিন্দুরা যেসব পাট ও অন্যান্য কৃষিপণ্য বিক্রি করেন, মুসলিম ক্রেতারা সচরাচর তার পুরো দাম দেয় না। সত্যি বলতে কি, হিন্দুদের ক্ষেত্রে পাকিস্তানে আইন, বিচার বা ইনসাফ বলতে কিছুরই কোনো অস্তিত্ব নেই।
পশ্চিম পাকিস্তানে জোরপূর্বক ধর্মান্তর

৩৩। পূর্ব পাকিস্তানের কথা বাদ রেখে এবার পশ্চিম পাকিস্তান, বিশেষ করে সিন্ধু প্রদেশের কথায় আসি। দেশভাগের পর পশ্চিম পাঞ্জাবে প্রায় এক লাখের মতো তফসিলি জাতির মানুষ ছিলেন। উল্লেখ্য যে, তাঁদের এক বিরাট অংশকে জোর করে ইসলামে ধর্মান্তরিত করা হয়েছে। মুসলিমদের দ্বারা অপহৃত এক ডজন তফসিলি মেয়ের মধ্যে কর্তৃপক্ষের কাছে বারবার আবেদন জানানো সত্ত্বেও এ পর্যন্ত মাত্র ৪ জনকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। অপহরণকারী ও অপহৃত মেয়েদের নাম-ঠিকানাসহ বিস্তারিত তথ্য সরকারকে দেওয়া হয়েছিল। অপহৃত মেয়েদের উদ্ধারের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তার সাম্প্রতিক শেষ উত্তর ছিল—"তাঁর কাজ হলো হিন্দু মেয়েদের উদ্ধার করা, আর 'অচ্ছুৎ' (তফসিলি জাতি)-রা তো হিন্দু নয়!"

সিন্ধু এবং পাকিস্তানের রাজধানী করাচিতে যে অল্প সংখ্যক হিন্দু এখনও বসবাস করছেন, তাঁদের অবস্থা চরম শোচনীয়। সিন্ধু ও করাচির ৩৬৩টি হিন্দু মন্দির ও গুরুদ্বারের একটি তালিকা আমার কাছে আছে (যা মোটেও পূর্ণাঙ্গ তালিকা নয়), যেগুলো এখনও মুসলিমদের দখলে রয়েছে। এর মধ্যে কিছু মন্দিরকে জুতার দোকান, কসাইখানা ও হোটেলে পরিণত করা হয়েছে। কোনো হিন্দুই তাঁদের সম্পত্তি ফেরত পাননি। কোনো রকম নোটিশ ছাড়াই তাঁদের জমিজমার দখল কেড়ে নিয়ে শরণার্থী ও স্থানীয় মুসলিমদের মধ্যে বণ্টন করে দেওয়া হয়েছে। আমি ব্যক্তিগতভাবে জানি, কাস্টোডিয়ান (হেফাজতকারী) বেশ কিছুদিন আগেই ২০০ থেকে ৩০০ জন হিন্দুকে 'অ-বাস্তুচ্যুত' (Non-evacuee) হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন। কিন্তু আজ পর্যন্ত তাঁদের একজনের সম্পত্তিও ফেরত দেওয়া হয়নি। এমনকি করাচি 'পিঞ্জরাপোল'-এর দখলও ট্রাস্টিদের ফেরত দেওয়া হয়নি, যদিও সেটি বেশ কিছুদিন আগেই 'অ-বাস্তুচ্যুত' সম্পত্তি হিসেবে ঘোষিত হয়েছিল। করাচিতে আমি অপহৃত হিন্দু ও বিশেষ করে তফসিলি মেয়েদের বহু হতভাগ্য বাবা ও স্বামীর কাছ থেকে আবেদনপত্র পেয়েছি। আমি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলাম। কিন্তু কোনো লাভই হয়নি। চরম দুঃখের সাথে জানাচ্ছি যে, সিন্ধু প্রদেশে এখনও বসবাসকারী এক বিরাট সংখ্যক তফসিলি জাতির মানুষকে জোরপূর্বক ইসলামে ধর্মান্তরিত করা হয়েছে।

হিন্দুদের জন্য পাকিস্তান এক 'অভিশপ্ত' স্থান
৩৪। সামগ্রিকভাবে হিন্দুদের ক্ষেত্রে পাকিস্তানের চিত্রটি যদি সংক্ষেপে এই হয়, তবে আমি এটি বললে ভুল হবে না যে—পাকিস্তানি হিন্দুদের নিজ ভূমিতেই মূলত 'নাগরিকত্বহীন' (Stateless) বানিয়ে দেওয়া হয়েছে। তারা হিন্দু ধর্মে বিশ্বাস করে—এ ছাড়া তাদের আর কোনো অপরাধ নেই। মুসলিম লীগ নেতারা বারবার ঘোষণা দিচ্ছেন যে পাকিস্তান একটি 'ইসলামিক রাষ্ট্র' হবে এবং হচ্ছে। জাগতিক সকল সমস্যার একমাত্র মহৌষধ হিসেবে ইসলামকে তুলে ধরা হচ্ছে। পুঁজিপাত ও সমাজতন্ত্রের দ্বন্দ্বে আপনারা ইসলামিক সমতা ও ভ্রাতৃত্বের এক জাঁকজমকপূর্ণ গণতান্ত্রিক ভাবমূর্তি উপস্থাপন করছেন। কিন্তু শরিয়তের সেই মহৎ কাঠামোতে কেবল মুসলিমরাই শাসক, আর হিন্দু ও অন্যান্য সংখ্যালঘুরা হলো 'জিম্মি'—যাঁরা একটি নির্দিষ্ট মূল্যের বিনিময়ে সুরক্ষা পাওয়ার অধিকারী; আর প্রধানমন্ত্রী সাহেব, আপনি অন্য যে কারও চেয়ে ভালো জানেন সেই 'মূল্যটা' আসলে কী!

দীর্ঘ ও গভীর চিন্তাভাবনার পর আমি এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছি যে, পাকিস্তান হিন্দুদের বসবাসের যোগ্য স্থান নয় এবং ধর্মান্তরকরণ অথবা নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার এক অশুভ ছায়ায় তাদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার হয়ে গেছে। উচ্চবর্ণের বেশিরভাগ হিন্দু এবং রাজনৈতিকভাবে সচেতন তফসিলি জাতি ইতিপূর্বে পূর্ববঙ্গ ত্যাগ করেছেন। যেসব হিন্দু এই অভিশপ্ত পাকিস্তানে থেকে যাবেন, আমার আশঙ্কা—সুপরিকল্পিতভাবে ধাপে ধাপে তাঁদের হয় ইসলামে ধর্মান্তরিত করা হবে, না হয় পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হবে। আপনার মতো একজন শিক্ষিত, সংস্কৃতিবান ও অভিজ্ঞ মানুষ কীভাবে এমন একটি আদর্শের সমর্থক হতে পারেন, যা মানবজাতির জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর এবং সমতা ও সুবিচারের সমস্ত নীতিকে ধ্বংস করে দেয়—তা ভেবে আমি সত্যিই স্তব্ধ! আমি আপনাকে এবং আপনার সহকর্মীদের বলে দিতে চাই যে, হুমকি বা প্রলোভন যাই আসুক না কেন, হিন্দুরা তাঁদের জন্মভূমিতে নিজেদের 'জিম্মি' হিসেবে মেনে নেবে না। আজ হয়তো তাঁরা দুঃখে কিন্তু আতঙ্কে নিজেদের ঘরবাড়ি ছেড়ে চলে যাচ্ছেন; কাল তাঁরা জীবনের তাগিদেই নিজেদের ন্যায্য অধিকারের জন্য লড়াই করবেন। ভবিষ্যতের গর্ভে কী লুকিয়ে আছে তা কে জানে?

আমি যখন নিশ্চিত যে পাকিস্তান কেন্দ্রীয় সরকারের মন্ত্রী হিসেবে আমার থাকাটা হিন্দুদের কোনো উপকারে আসছে না, তখন আমার বিবেক আমাকে অনুমতি দেয় না পদে বহাল থেকে পাকিস্তানের হিন্দু ও বিদেশের মানুষের মনে এই ভুল ধারণা তৈরি করতে যে—হিন্দুরা সেখানে জীবন, সম্পত্তি, সম্মান ও ধর্মের নিরাপত্তা নিয়ে মর্যাদার সাথে বাস করতে পারে। হিন্দুদের বিষয়ে বক্তব্য এই পর্যন্তই।

আমজনতা মুসলিমদেরও বেসামরিক স্বাধীনতা নেই
৩৫। আর যেসব মুসলিম লীগের ক্ষমতার বলয়ের বাইরে এবং তাঁদের দুর্নীতিগ্রস্ত ও অদক্ষ আমলাতন্ত্রের শিকার, সেই সাধারণ মুসলিমদের কী অবস্থা? পাকিস্তানে 'নাগরিক স্বাধীনতা' (Civil Liberty) বলে কোনো কিছুর অস্তিত্ব নেই। উদাহরণস্বরূপ খান আবদুল গাফফার খানের পরিণতি দেখুন—যাঁর চেয়ে ধার্মিক ও খাঁটি মুসলিম এই ভূখণ্ডে বহু বছর ধরে জন্ম নেননি; কিংবা তাঁর বীর ও দেশপ্রেমিক ভাই ড. খান সাহেবের অবস্থা দেখুন। উত্তর-পশ্চিম ও পূর্ব পাকিস্তানের বহু সাবেক লীগ নেতাকে বিনা বিচারে আটকে রাখা হয়েছে। জনাব সোহরাওয়ার্দী—বাংলায় মুসলিম লীগের বিজয়ের পেছনে যাঁর অবদান ছিল সবচেয়ে বেশি—তিনি এখন কার্যত একজন পাকিস্তানি বন্দী, যাকে পারমিট নিয়ে চলাফেরা করতে হয় এবং হুকুম পেলে মুখ খুলতে হয়। বাংলার সর্বজনশ্রদ্ধেয় প্রবীণ নেতা জনাব এ. কে. ফজলুল হক—যিনি সেই ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাবের উত্থাপক ছিলেন—তিনি আজ ঢাকা হাইকোর্টের আঙিনায় একাকী দিন কাটাচ্ছেন। তথাকথিত এই 'ইসলামিক পরিকল্পনা' যতটা নির্মম, ততটাই নির্মমভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে।

আর সাধারণ পূর্ব বঙ্গীয় মুসলিমদের কথা যত কম বলা যায়, ততই ভালো। তাঁদের স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বায়ত্তশাসিত ও সার্বভৌম অঞ্চলের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। তার বদলে তারা কী পেল? পূর্ববঙ্গকে পশ্চিম পাকিস্তানের এক 'উপনিবেশে' (Colony) পরিণত করা হয়েছে, যদিও পূর্ববঙ্গের জনসংখ্যা ছিল পশ্চিমের সকল অংশের মোট জনসংখ্যার চেয়েও বেশি। পূর্ববঙ্গ এখন করাচির এক ফ্যাকাশে ও পঙ্গু আজ্ঞাবহ অনুগত অঞ্চল মাত্র, যা কেবল করাচির হুকুম পালন করে। পূর্ববঙ্গের মুসলিমরা তাঁদের আবেগ ও উৎসাহ নিয়ে চেয়েছিল রুটি-রুজি; কিন্তু ইসলামিক রাষ্ট্র ও শরিয়তের রহস্যময় চালচক্রে তারা সিন্ধু ও পাঞ্জাবের শুষ্ক মরুভূমি থেকে পেল কেবল পাথর!

আমার নিজের দুঃখজনক ও তিক্ত অভিজ্ঞতা
৩৬। পাকিস্তানের এই সামগ্রিক চিত্র এবং অন্যদের ওপর হওয়া নির্মম অবিচারের কথা বাদ দিলেও, আমার নিজের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা কোনো অংশে কম দুঃখের, তেতো ও চোখ খুলে দেওয়ার মতো নয়। প্রধানমন্ত্রী এবং সংসদীয় দলের নেতা হিসেবে আপনি আপনার পদের প্রভাব খাটিয়ে আমাকে একটি বিবৃতি দিতে বাধ্য করেছিলেন, যা আমি গত ৮ই সেপ্টেম্বর দিয়েছিলাম। আপনি ভালো করেই জানেন যে, আমি অসত্য ও অর্ধ-সত্যে ভরা কোনো বিবৃতি দিতে ইচ্ছুক ছিলাম না—যা ছিল অসত্যের চেয়েও ভয়ানক। কিন্তু যত দিন আমি আপনার অধীনে মন্ত্রী হিসেবে কাজ করছিলাম, তত দিন আপনার অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করা আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না। কিন্তু আমি আর এই মিথ্যা ভণ্ডামি ও অসত্যের বোঝা আমার বিবেকের ওপর বয়ে বেড়াতে পারছি না। তাই আমি আপনার মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি এবং আমার পদত্যাগপত্র আপনার কাছে পেশ করছি। আশা করি আপনি কোনো বিলম্ব ছাড়াই তা গ্রহণ করবেন। অবশ্যই আপনার ইসলামিক রাষ্ট্রের উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য এই দপ্তরটি বিলুপ্ত করা বা আপনার সুবিধামতো যেভাবে ইচ্ছা ব্যবহার করার পূর্ণ স্বাধীনতা আপনার রয়েছে।

আপনার বিশ্বস্ত,
(স্বাক্ষরিত-)
জে. এন. মণ্ডল
৮ই অক্টোবর, ১৯৫০

মতামত ও আলোচনা

আপনার মতামত দিন

মন্তব্য (0)

NDB Logo